সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
মানুষের জীবন ধারাবাহিক পরীক্ষা। তাই আল্লাহ তাআলা প্রতিটি মানুষকে সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ, হালাল-হারাম ও কল্যাণ-অকল্যাণের মধ্যে নির্বাচন করার স্বাধীনতা দিয়েছেন। এই ধারাবাহিক পরীক্ষারই এক বিস্ময়কর ও শিক্ষণীয় অধ্যায় হলো বাবিল নগরীতে হারুত-মারুত ফেরেশতাদ্বয়ের মাধ্যমে সংঘটিত ঘটনা, যা পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারায় আল্লাহ তাআলা চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন।
বাবিল (ব্যবিলন) ছিল ইরাকের একটি প্রসিদ্ধ নগরী।

খৃস্টপূর্ব ৩০০০ সালে এটা ছিল তৎকালীন পৃথিবীর অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। একসময় সেখানে জাদুবিদ্যার খুব চর্চা হত। আর ইহুদিরা এ নাজায়েজ কাজে ন্যাক্কারজনকভাবে লিপ্ত হয়ে পড়ে। নবী-রাসুলরা তাদের বারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা কোনো কথা শোনেনি।
এমনকি তারা জাদুকরদের ভেলকি-বাজিকে মুজিজা মনে করে তাদের নিজেদের ধর্মগুরু বানিয়ে নিয়েছিল। তখন আল্লাহ তাআলা ‘হারুত-মারুত’ নামক দুজন ফেরেশতাকে মানব আকৃতিতে পৃথিবীতে পাঠান। উদ্দেশ্য ছিল তারা যেন মানুষকে জাদু এবং মুজিজার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেন। কেননা জাদু হল মানুষের সৃষ্টি আর মুজিজা সয়ং আল্লাহ তাআলার ইশারা।
যা কোনো বাহ্যিক কারণ দ্বারা পরিচালিত হয় না। তারপর তারা যখন কোনো মানুষকে জাদু ও মুজিজার মধ্যে পার্থক্য বুঝানোর জন্য জাদু শিক্ষা দিতেন তখন তারা সতর্ক করে বলে দিতেন যে, আমরা এই উদ্দেশ্যে জাদুবিদ্যা বর্ণনা করছি, যাতে জাদু ও মুজিজার পার্থক্য তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় এবং তোমরা জাদু থেকে বেঁচে থাকতে পার। সুতরাং তোমরা জাদুর মাধ্যমে কারো কোনো ক্ষতি করবে না। এবং তোমরা কুফরিতে লিপ্ত হবে না।
আর জাদু ও মুজিজার মধ্যে পার্থক্যকরণের এ কাজ নবীদের পরিবর্তে ফেরেশতাদের দ্বারা যে নেয়ার কারণ হল, জাদুর ফর্মুলা শিক্ষা দেওয়া নবীদের জন্য শোভনীয় নয়।
আর ফেরেশতাদের উপর যেহেতু শরয়ী কোনও বিধি-বিধান বর্তায় না, তাই তাদের মাধ্যমে রহস্যজনক এসব কাজ-কর্ম নিতে অসুবিধা নেই। কিন্তু ইহুদিরা ফেরেশতাদের কথা না শোনে এমন সব ঘৃণ্য কাজে জাদু ব্যবহার করতে শুরু করে যা এমনিতেও হারাম ছিল, যেমন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে তালাকের পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া। (তাফসিরে তাওজিহুল কোরআন)
আল্লাহ তাআলা প্রথমই ইহুদিদের একটি ভুল বিশ্বাষের খন্ডন করেন। ইহুদিরা বিশ্বাস করত করত যে, নবী সুলাইমান (আ.) তাঁর রাজত্ব পরিচালনা করতেন জাদুর মাধ্যমে। এটি ছিল সুলাইমান (আ.)-এর প্রতি মারাত্মক অপবাদ। আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, ‘সুলাইমান (আ.) কখনো কুফরি করেননি; বরং শয়তানরাই কুফরি করেছিল এবং তারাই মানুষকে জাদু শিক্ষা দিত।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০২)
এখানে বোঝা যায়, সত্যকে বিকৃত করা এবং নবীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া শয়তানের একটি পুরনো কৌশল। সে চায় মানুষ যেন বিভ্রান্ত হয় এবং সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। এরপর আল্লাহ তাআলা বাবিল নগরীতে ‘হারুত ও মারুত’ নামের দুই ফেরেশতা প্রেরণের ঘটনা বলেন। যারা মানুষকে জ্ঞান-বিদ্যা শিক্ষা দিত। তবে এই জ্ঞান ছিল একটি পরীক্ষা—সরাসরি কল্যাণের জন্য নয়। তাই তারা কাউকে কিছু শেখানোর আগে স্পষ্টভাবে বলে দিতেন, ‘আমরা তো শুধুমাত্র পরীক্ষা, সুতরাং তোমরা কুফরি কোরো না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০২)
ফেরেশতারা নিজেরা কোনো পাপ বা অন্যায়ে লিপ্ত হন না। তারা আল্লাহর আদেশের পূর্ণ অনুসারী। তাই তারা জাদু শেখানোর আগে মানুষকে সাবধান করতেন, এটি একটি পরীক্ষা, তবুও অনেক মানুষ সেই সতর্কতা অগ্রাহ্য করে জাদু শিখতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এমনকি তারা এমন সব বিষয় শিখত, যার মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি করা যায়। কোরআনের ভাষায়, ‘তারা এমন জাদু শিখত যার মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো সম্ভব হতো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০২)
এই অংশটি আমাদের সামনে জাদুর একটি বাস্তব দিক তুলে ধরে। জাদুর কিছু প্রভাব থাকলেও তা সম্পূর্ণ স্বাধীন শক্তি নয়। আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দেন, ‘তারা কারো কোনো ক্ষতি করতে পারে না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০২)
অর্থাৎ, সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ একমাত্র আল্লাহর হাতে। কোনো জাদু, কোনো শক্তি, কোনো ব্যক্তি আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কিছু করতে পারে না। এই বিশ্বাস একজন মুমিনের হৃদয়ে দৃঢ় থাকলে সে কখনো ভয় বা বিভ্রান্তির শিকার হবে না। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘তারা এমন কিছু শিখত যা তাদের কোনো উপকারে আসত না, বরং ক্ষতিই করত। এবং তারা জেনে গিয়েছিল যে, যে ব্যক্তি এসব কাজে লিপ্ত হবে, তার জন্য আখিরাতে কোনো অংশ থাকবে না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০২)
অতএব, জাদু শেখা, চর্চা করা বা এর প্রতি আকৃষ্ট হওয়া—এসবই মানুষের ঈমানের জন্য ভয়াবহ হুমকি। এটি শুধু পার্থিব জীবনে অশান্তি সৃষ্টি করে না, বরং পরকালের চিরস্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমত, সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দেওয়া শয়তানের একটি বড় অস্ত্র। তাই সচেতন থাকা জরুরি। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন, কিন্তু সেই পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য আগেই পথনির্দেশনা দিয়ে দেন। তৃতীয়ত, ক্ষতিকর জ্ঞান বা শক্তির প্রতি আকর্ষণ মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। এবং সর্বোপরি, আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা ও ঈমানই মানুষকে সব ধরনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারে। সুতরাং জীবন একটি পরীক্ষা, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। তাই আমাদের উচিত সত্যকে আঁকড়ে ধরা, মিথ্যা ও ক্ষতিকর বিষয় থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। তাহলেই আমরা দুনিয়ার সফলতা ও আখিরাতের চিরস্থায়ী মুক্তি লাভ করতে পারব। ইনশাআল্লাহ ।









