অর্থ ও বাণিজ্য

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন: ব্যাংক ঋণে উচ্চ সুদসহ ২১ বাধা বিনিয়োগে

নিউজ ডেস্ক২৯ ডিসেম্বর ২০১৯৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদসহ ২১টি বাধা শনাক্ত করেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। দেশের চারটি বিভাগের তরুণ উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়-বিভাগের সঙ্গে বৈঠক ও কর্মশালার মাধ্যমে এসব বাধা চিহ্নিত করা হয়।

বিনিয়োগে অন্য বাধাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- সহজ শর্তে হয়রানিমুক্ত ঋণ, ভর্তুকির বাইরে হালকা প্রকৌশলী পণ্য, শিল্প খাতে অতিরিক্ত শুল্ক-ভ্যাট ও বন্ডের সমস্যা, এলসি খোলার জটিলতা, ব্যাংকের লেট পেমেন্ট এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালার অভাব। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার উৎপাদনশীল খাতের ব্যাংক ঋণে এক অঙ্কের (সিঙ্গেল ডিজিট) সুদহার অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শিল্প খাতের মেয়াদি এবং তলবি ঋণের গ্রাহকরা এই সুবিধা পাবেন। আগামী বুধবার থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার কথা।

বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বলেন, চারটি বিভাগে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ নিয়ে কর্মশালা থেকে বেশ কিছু বাধা শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে এক নম্বরে এসেছে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ। এত বেশি সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগের পর মুনাফা করা কঠিন। এটিই বিনিয়োগ সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান বাধা মনে করা হচ্ছে। এছাড়া বেশি মাত্রায় কর ও কাস্টমস ডিউটিও আছে। এক্ষেত্রে সংস্কার প্রয়োজন। আমরা বলেছি, এসব বাধা দূর হলে নতুন অনেক শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। সেখান থেকে কম কর ও কাস্টমস ডিউটি পেলেও বছর শেষে রাজস্ব আহরণ আরও বাড়বে। এসব বিষয়ের ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে আমরা লিখেছি।

সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব অগ্রাধিকার ও অন্যতম ১০টি উদ্যোগের মধ্যে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি হচ্ছে একটি। এ লক্ষ্যে বিডা বিনিয়োগ বাড়াতে ১৭টি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা ও ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদের সমন্বয়ে চারটি বিভাগে (রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল) তরুণদের নিয়ে ধারাবাহিক সভা ও কর্মশালার আয়োজন করেছে। নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে পৃথক সভা করা হয়। এসব কর্মশালা থেকে উঠে আসে বিনিয়োগের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনার নানা দিক।

বিডার প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিষয়সহ বিনিয়োগে আরও যেসব বাধার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে- কৃষি ও আইসিটি খাতে ‘ইকিউটি অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ ফান্ডের (ইইএফ) মতো তহবিলের অভাব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৃষিভিত্তিক শিল্প তালিকায় কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারক শিল্প অন্তর্ভুক্ত না হওয়া, এক্সেসরিজ ও প্যাকেজিং খাতে ব্যাক টু ব্যাক এলসি পলিসি বন্ধ, ওভেন গার্মেন্টসের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাব, ব্যাংক সেবার ঘাটতি, তুলা খাতে বিনিয়োগের জন্য স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ ও মূলধনের অভাব। এছাড়া আরও আছে- কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়া শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের শিল্প স্থাপনের গুরুত্ব না থাকা, এন্টারপ্রেনারশিপ সাপোর্ট ফান্ড (ইএসএফ) লোন পদ্ধতি কঠিন, এপিআই ও ল্যাবরেটরির উৎপাদনকারীদের বিদেশি তহবিল থেকে ঋণ গ্রহণের বিধিনিষেধ, এপিআই খাতে খুচরা যন্ত্রাংশ কেনার ক্ষেত্রে ক্রেডিট রিপোর্টের বাধ্যতামূলক সীমা ১০ হাজার মার্কিন ডলারে রাখা, মূলধন সরবরাহে সরল সুদে ব্যাংক ঋণের অভাব, বীমার অতিরিক্ত প্রিমিয়ার সমস্যা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি গবেষণার তহবিল সংকট, বায়োটেকনোলজি পণ্য পরিবহনের জন্য তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণযুক্ত যানবাহনের অভাব, পরিবহন খাতে বেশি মাত্রায় ঋণের উচ্চ সুদ, কেমিক্যাল ও বেসিক কেমিক্যাল খাতে অতিরিক্ত শুল্ক ও ভ্যাট এবং বন্ডের সমস্যা, ফার্নিচার খাতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস না থাকা, নারী উদ্যোক্তাদের স্বল্প সুদে জামানত ও জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা না থাকা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বিনিয়োগের সমস্যাগুলো নতুন নয়। এসব সমস্যার কথা সব সময় বলা হচ্ছে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের সূচক কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এখানে বলা হচ্ছে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুদহার বেশি। তবে খেলাপি ঋণের হার কমাতে না পারলে সুদহার কমানো কঠিন হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, বিডার চিহ্নিত সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব। তবে এ জন্য দরকার সরকারের সদিচ্ছা।

বিনিয়োগ সম্প্রসারণের জন্য বিডার প্রতিবেদনে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তৈরি পোশাক খাতকে। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে এক্সেসরিজ ও প্যাকেজিং খাতে ‘ব্যাক টু ব্যাক’ এলসি পলিসি চালু, ওভেন গার্মেন্টসের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন সরবরাহের সুপারিশ করা হয়। বিজিএপিএমইএর হিসাবে গত অর্থবছরেই ২৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি হয়। এর মধ্যে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের স্থানীয় এক্সেসরিজ ব্যবহার করা হয়েছে। এর বাইরে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের এক্সেসরিজ সরাসরি রফতানি করা হয়।

এছাড়া তুলা খাতে বিনিয়োগের জন্য স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ ও মূলধন সংস্থান করাসহ এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করতে বলা হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়কে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ওষুধ খাত এপিআই ও ল্যাবরেটরির উৎপাদনকারীদের বিদেশি তহবিল থেকে ঋণ গ্রহণের অনুমতি, এপিআই খাতে খুচরা যন্ত্রাংশ কেনার ক্ষেত্রে ক্রেডিট রিপোর্টের বাধ্যতামূলক সীমা ১০ হাজার ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার মার্কিন ডলারে উন্নীতকরণ, মূলধন সরবরাহে সরল সুদে ব্যাংক ঋণ, বীমার অতিরিক্ত প্রিমিয়ার হার হ্রাস করার সুপারিশ করা হয়।