লাইফ স্টাইল

বন্ধ্যত্ব অভিশাপ নয়

নিউজ ডেস্ক২০ ডিসেম্বর ২০২৫৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

বন্ধ্যত্ব অভিশাপ নয়

সন্তান লালন-পালন মানবজীবনের বড় অংশ। বিয়ের কিছু সময় পর প্রায় প্রতিটি দম্পতি সন্তান নিতে চান। সবার জন্য এটি সহজ নয়, অনেক চেষ্টার পরও কাঙ্ক্ষিত সন্তানের দেখা মেলে না। একসময় তাঁরা হতোদ্যম হয়ে পড়েন।

ধরে নেন তাঁদের ভাগ্যে সন্তান নেই। এক পর্যায়ে এটি গভীর মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শুরু হয় দাম্পত্য কলহ। অনেক ক্ষেত্রে এটি বিচ্ছেদের কারণও।

সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে বন্ধ্যত্ব দূর করা সম্ভব। আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে বন্ধ্যত্বের জটিল সমস্যাও সমাধান করা যায়। এই বিষয়টি নিয়ে রয়েছে সচেতনতার অভাব। প্রতিটি দম্পতির প্রয়োজন বিয়ের আগেই বন্ধ্যত্বের সম্ভাব্য কারণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে জেনে নেওয়া।

এতে ভুল-বোঝাবুঝির আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে।

বন্ধ্যত্ব কাকে বলে

চিকিৎসার ভাষায়, যেসব দম্পতির অন্তত এক বছর অরক্ষিত সহবাসের পরও স্ত্রী গর্ভধারণ করতে না পারেন, তাঁদের বলা হয় ইনফার্টাইল বা বন্ধ্যত্ব। আমাদের সমাজের একটি প্রচলিত ধারণা, বন্ধ্যত্ব শুধু নারীদের হয়। সন্তান জন্মদানে অক্ষমতার জন্য স্ত্রীকেই দোষী করেন অনেকে। বাস্তবতা হচ্ছে, বন্ধ্যত্বের জন্য স্ত্রী অথবা স্বামী উভয়েই দায়ী হতে পারেন।

বন্ধ্যত্বের জন্য প্রায় ৪০ শতাংশ দম্পতির ক্ষেত্রে স্বামী দায়ী, ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে স্ত্রী দায়ী এবং বাদবাকি ২০ শতাংশ বন্ধ্যত্বের ক্ষেত্রে অন্যান্য কারণ দায়ী।
সন্তান নেওয়ার চেষ্টা শুরু করার পর প্রায় ৮০ শতাংশ যুগল এক বছরের মধ্যে গর্ভধারণে সক্ষম হন। বাকি ১০ শতাংশ যুগল দ্বিতীয় বছরের মধ্যে গর্ভধারণ করেন। বাকি ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে বন্ধ্যত্ব লাঘবের জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়।

 

কখন পরীক্ষা করাবেন

সময়মতো বিয়ে করা অত্যন্ত জরুরি। গর্ভধারণের ক্ষেত্রে বয়স অনেক বড় বিষয়। নারীদের জন্য গর্ভধারণের উপযুক্ত বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছর। পুরুষদের ক্ষেত্রে বয়স ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে মনে রাখতে হবে, পুরুষদের বয়স ৪৫ বছর পার হলে ফার্টিলিটি কমতে শুরু করে। স্ত্রীর বয়স যদি ৩৫ এবং স্বামীর বয়স যদি ৪৫ বছরের বেশি হয়, আর অন্তত এক বছর চেষ্টার পরও যদি স্ত্রী গর্ভধারণ করতে না পারেন, সে ক্ষেত্রে দেরি না করে ইনফার্টিলিটির সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। এতে ইনফার্টিলিটির কারণ নির্ণয় করা যায় এবং সে অনুযায়ী স্বামী-স্ত্রী, এমনকি দুজনকেই চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়।

 

পরীক্ষার ধরন

বহু কারণেই হতে পারে বন্ধ্যত্ব। অনেকে বন্ধ্যত্ব নিয়েই জন্মগ্রহণ করেন, কেউ কেউ অল্প বয়সেও বন্ধ্য হয়ে যেতে পারেন। এটিকে অভিশাপ মনে করার কিছু নেই। একে অপরকে দায়ী করা থেকে বিরত থাকুন। এ কারণেই ফার্টিলিটি চিকিৎসার প্রথম ধাপ হিসেবে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই কাউন্সেলিং করা হয়। মেডিক্যাল চিকিৎসা শুরুর আগেই কাউন্সেলিং করা
গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় চিকিৎসক স্বামী ও স্ত্রীর কাছে জানতে চাইবেন তাঁদের পরিস্থিতি, সে অনুযায়ী বুঝিয়ে বলবেন তাঁদের বন্ধ্যত্বের সম্ভাব্য কারণ কী হতে পারে। সে অনুযায়ী সন্তানধারণের সম্ভাবনার বিষয়ে বাস্তব ধারণা দেবেন চিকিৎসক। পাশাপাশি দুজনের ইতিহাস ও বয়স অনুযায়ী তিনি নির্ধারণ করবেন কী পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রায় প্রতিটি নারীর ক্ষেত্রেই করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অ্যান্ট্রাল ফলিকল কাউন্ট (এএফসি)। এটি করার নিয়ম মাসিকের দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় দিনে। এ জন্য ব্যবহৃত হয় টিভিএস আলট্রাসাউন্ড পদ্ধতি। এ ছাড়া যেসব পরীক্ষা করা হয়—

 

► অ্যান্টিমুলেরিয়ান হরমোনের (এএমএইচ) মাত্রা। এ জন্য রোগীর রক্ত পরীক্ষা করা হয়।

► টিভিএস আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ফলিকুলোমেট্রি পরীক্ষা।

 

দুটি পরীক্ষাই করা হয় মাসিকের ১২তম দিনে। তাই আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখা জরুরি, নইলে পরীক্ষার জন্য আবার এক মাস অপেক্ষা করতে হবে।

পুরুষদের ক্ষেত্রে মূল ইনফার্টিলিটি পরীক্ষা হচ্ছে বীর্য বা সিমেন অ্যানালিসিস। শুক্রাণুর উপস্থিতি, পরিমাণ, নড়াচড়া, আকৃতি এবং স্বাস্থ্যের মাধ্যমে জানা যায়। এই পরীক্ষার ক্ষেত্রেও কিছু ধরাবাঁধা নিয়ম রয়েছে। সেসব মেনে তবেই পরীক্ষা করতে হবে, নইলে ফলাফলে ভুল হতে পারে। এ ছাড়া রয়েছে রক্ত পরীক্ষা করে পুরুষ হরমোনের মাত্রা বের করা। কিছু ক্ষেত্রে আলট্রাসাউন্ডেরও প্রয়োজন হতে পারে। কী পরীক্ষা প্রয়োজন, সেটি রোগীর ইতিহাস অনুযায়ী চিকিৎসক ঠিক করে দেবেন।

 

চিকিৎসা

বন্ধ্যত্বের কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। অনেক দম্পতির ক্ষেত্রে হরমোন চিকিৎসার মাধ্যমেই বন্ধ্যত্ব লাঘব হয়। তবে অনেক সময় ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশনের (আইভিএফ) প্রয়োজন হতে পারে। প্রতিটি চিকিৎসাই এখন দেশে রয়েছে, এমনকি আইভিএফও। তাই ইনফার্টিলিটিকে অভিশাপ ভেবে বসে থাকা উচিত নয়। বন্ধ্যত্ব অন্যান্য রোগের মতোই। অভিজ্ঞ ইনফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের কাছে চিকিৎসা নিলে সমাধান পাওয়া যাবে। লজ্জা বা ভয়ের কোনো কারণ নেই।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক

স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগ

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

কনসালট্যান্ট

ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল