সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
গেল বছর দেশবাসীকে রীতিমতো কাঁদিয়েছে পেঁয়াজ। মৌসুমি পেঁয়াজ বাজারে আসায় দামে কিছুটা স্বস্তি মিললেও স্বাভাবিক হয়নি এখনো। এর মধ্যেই গতকাল পেঁয়াজের দামে আবার ঝাঁজ বেড়েছে। পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ায় খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ খুচরায় বিক্রি হচ্ছে কেজি ১৪০ টাকা। আর পাইকারিতে ১১০ টাকা। যদিও চায়নাসহ পেঁয়াজ মিলছে ৬০ টাকায়।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, এক সপ্তাহ আগে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ মিলেছে ১১০ টাকায়। আমদানি করা চীন ও মিসরের পেঁয়াজ মিলেছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। তবে মিয়ানমার থেকে আনা পেঁয়াজ দেশি পেঁয়াজের কাছাকাছি দামে বিক্রি হচ্ছে।

টিসিবির তথ্যানুযায়ী, বাজারে নতুন দেশি পেঁয়াজ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়; যা গত সপ্তাহে ছিল ৯০ থেকে ১০০ টাকা। আমদানি করা বিদেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ১২০ টাকায়। গত সপ্তাহে এই পেঁয়াজের দাম ছিল ৫০ থেকে ১০০ টাকা।
শুধু পেঁয়াজই নয়, নতুন বছরে রাজধানীর খুচরা বাজারে উত্তাপ ছড়াচ্ছে কয়েকটি ভোগ্য পণ্য। বাজার ভরপুর থাকায় শীতকালীন সবজির দামে ভোক্তার স্বস্তি মিলেছে; যদিও কোনো কোনো বাজারে বাড়তি দামেও শীতকালীন সবজি বিক্রি করতে দেখা গেছে। ভোগ্য পণ্যের বাজারকে গরম করেছে ভোজ্য তেল। নতুন করে পেঁয়াজের ঊর্ধ্বমুখী দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভোজ্য তেলের বাজারও এখন বেশ গরম। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাতে দেশের বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে। দফায় দফায় দাম বাড়ানো হচ্ছে সয়াবিন তেল ও পাম অয়েলের।
ট্যারিফ কমিশন সূত্র বলছে, গত ডিসেম্বরে তেল ব্যবসায়ীরা ট্যারিফ কমিশনের কাছে দাম বাড়ানোর বিষয়ে আবেদন জানান। তবে সেই আবেদনের পর নিজেদের মতামত তুলে ধরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে ট্যারিফ কমিশন। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি তুলে ধরে চিঠির মতামত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হয়েছে।
গত ৩০ ডিসেম্বর তেল আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার বিষয় জানিয়ে ব্যবসায়ীরা তেলের দাম বাড়ানোর পক্ষে বললেও তাতে সায় দেয়নি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে মন্ত্রণালয়ের এ মতকে উপেক্ষা করেই তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। নতুন বছরে নতুন দামে বিক্রি হচ্ছে ভোজ্য তেল। গত এক মাসে ভোজ্য তেলের দাম দুই দফা বেড়েছে।
রাজধানীর পণ্যবাজার দেখভাল করা রাষ্টায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যানুযায়ী, বাজারে বিক্রি হওয়া সব ধরনের ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে। খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম বৃদ্ধির পর এবার বোতলজাত তেলের দাম বেড়ে গেছে।
টিসিবির তথ্যানুযায়ী, রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৯১ থেকে ৯৩ টাকায়। গত সপ্তাহে এই তেলের দাম ছিল ৮৬ থেকে ৮৮ টাকা আর এক মাস আগে ছিল ৮০ থেকে ৮৫ টাকা।
বোতলজাত তেলের দামও বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সপ্তাহের ব্যবধানে পাঁচ লিটার তেলের বোতলের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা। আর মাসের হিসাবে পাঁচ লিটার বোতলে তেলের দাম বেড়েছে ৪০ টাকা। সেই হিসাবে বোতালজাত তেলে মাস ব্যবধানে প্রতিলিটারে বেড়েছে আট টাকা। ২ ডিসেম্বর যেখানে পাঁচ লিটার তেলের বোতলের দাম ছিল ৪৩০ থেকে ৫০০ টাকা, ২ জানুয়ারি ওই বোতল বিক্রি হয় ৪৭০ থেকে ৫১৫ টাকা।
খোলা পাম অয়েলের দাম সপ্তাহ ব্যবধানে প্রতি লিটারে বেড়েছে ২০ শতাংশ। মাস ব্যবধানে দুই দফায় প্রতি লিটার পাম অয়েলে দাম বেড়েছে ১২ টাকা। এক লিটার খোলা পাম অয়েলের দাম ৮০ থেকে ৮২ টাকা। এক মাস আগে এই দাম ছিল ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। আর গত সপ্তাহে দাম ছিল ৭৪ থেকে ৭৬ টাকা। সুপার পাম অয়েলের দামও বেড়েছে। মাস ব্যবধানে প্রতি লিটারে এই পাম অয়েলের দাম বেড়েছে ১২ টাকা।
বিভিন্ন দেশের পণ্যের দাম বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ প্রতিষ্ঠান ইনডেক্স মুন্ডির তথ্যানুযায়ী, গত জুন থেকে পাম অয়েলের দাম বাড়ছে। নভেম্বর পর্যন্ত হিসাবে ছয় মাসে এই তেলের দাম বেড়েছে ১৩১ ডলার বা ২৩.৭৬ শতাংশ। গত অক্টোবরে প্রতি টন পাম অয়েলের দাম ছিল ৫৯১.৩৫ ডলার। নভেম্বরে এই তেলের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮৩ ডলার। আর ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ৬৯৮ ডলার। সেই হিসাবে গত দুই মাসে প্রতি মেট্রিক টন পাম অয়েলের দাম বেড়েছে ১০০ ডলারের বেশি।
ইনডেক্স মুন্ডির মতে, সয়াবিন তেলের দাম গত জুন থেকে বাড়তি। গত জুনে প্রতি মেট্রিক টন সয়াবিন তেলের দাম ছিল ৭৪২.৮৯ ডলার। আগস্টে সয়াবিন তেলের দাম টনপ্রতি ৮০০ ডলার ছুঁই ছুঁই হলেও চার মাস ধরে দাম কমছে। ডিসেম্বরে প্রতি টন সয়াবিন তেলের দাম দাঁড়ায় ৭৬০ ডলার।
বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্য তেল ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি মোহাম্মদ আলী ভুট্টো বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বেশি। দেশে তো তেল উৎপাদন হয় না। আমদানি করেই আনতে হয়। কয়েক মাস ধরেই তেলের দাম বাড়তি। কিন্তু এখন দাম না বাড়িয়ে উপায় নেই।’
এক কেজি এলাচ ৪০০০ টাকা : এলাচের দাম যেন আকাশ ছুঁয়েছে। মাসের হিসাবে এই পণ্যটির দাম বেড়েছে ৩০ শতাংশ। আর বছরের হিসাবে দাম বেড়েছে ১৩৯ শতাংশ। গত বছরের শুরুতে এলাচের দাম ছিল প্রতি কেজি এক হাজার ৫৫০ টাকা থেকে দুই হাজার টাকা। এ পণ্যটির ব্যবহার খুব কম হলেও মাস ব্যবধানে দুই দফা বেড়েছে এলাচের দাম। এক মাসে প্রতি কেজি এলাচে দাম বেড়েছে এক হাজার টাকা। গত ডিসেম্বরের শুরুতে প্রতি কেজি এলাচের দাম ছিল তিন হাজার থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকা। বর্তমানে প্রতি কেজি এলাচের দাম চার হাজার থেকে চার হাজার ৫০০ টাকা। গত সপ্তাহে এই দাম ছিল তিন হাজার ২০০ থেকে তিন হাজার ৬০০ টাকা।
এদিকে আমাদের সিরাজগঞ্জের তাড়াশ-রায়গঞ্জ প্রতিনিধি সনাতন দাশ জানান, সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন হাট-বাজারে হঠাৎ করে নতুন পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। গত মঙ্গলবার পেঁয়াজের দাম ছিল যেখানে ৮০ থেকে ৯০ টাকা, দুই দিনের ব্যবধানে বিভিন্ন বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজিতে।
গতকাল জেলা সদর থেকে শুরু করে তাড়াশ, রায়গঞ্জ, সলঙ্গা, উল্লাপাড়া উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাজারভর্তি আমদানি করা পেঁয়াজ। তার পরও দেশি পেঁয়াজের দাম ঊর্ধ্বমুখী।
এ প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি এম আতিকুল ইসলাম বুলবুল বলেন, বাজারে পেঁয়াজ পর্যাপ্ত থাকার পরও শুধু প্রশাসনের নজরদারির অভাবে দাম বেড়েই চলেছে। তিনি বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় এমন পরিস্থিতি হচ্ছে বলে মনে করেন।









