জাতীয়

প্ল্যাটফরমে নির্বাচনী ট্রেন, আগামী সপ্তাহে তফসিল

নিউজ ডেস্ক১১ নভেম্বর ২০২৩৬ মিনিট পড়া

সিল্কসিটি নিউজ ডেস্ক

সরকার পতনের একদফা দাবিতে এখনো রাজপথে চলছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর আন্দোলন। এদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে পুরোদমে চলছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি, গঠন করা হয়ে গেছে নির্বাচন পরিচালনা কমিটিও। দুই প্রতিপক্ষের পরস্পরবিরোধী এমন অবস্থানের মধ্যেই ভোটগ্রহণের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে প্ল্যাটফর্মে এসে গেছে ইসির নির্বাচনী ট্রেন। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতিকেও নির্বাচনের পূর্ণ প্রস্তুতির বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে ইসির পক্ষ থেকে।

আগামী সপ্তাহে ঘোষণা হবে তফসিল। নির্বাচনী প্রস্তুতির ধারাবাহিকতায় শুক্রবার ছুটির দিনেও চলেছে ইসির কর্মশালা; ৩২ জেলার প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) দেওয়া হয়েছে একগুচ্ছ নির্দেশনা। এখন হুইসেল বাজলেই অর্থাৎ তফসিল ঘোষণা হলেই যাত্রা শুরু হবে ইসির সেই ট্রেনের।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে পুরো দেশ মাতোয়ারা হয়ে আছে। পক্ষে-বিপক্ষে প্রতিদিন বক্তব্য হচ্ছে। একটা ডাইমেনশনও পেয়ে গেছে। নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের একটা কাজ হচ্ছে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে যতদূর সম্ভব দৃশ্যমান করে তোলা, স্বচ্ছতা সৃষ্টি করা। স্বচ্ছতা সৃষ্টি করলে সম্ভাব্য অপপ্রচার ঢাকা পড়ে যাবে। স্বচ্ছতা মানে সত্যের স্বচ্ছতা, মিথ্যার স্বচ্ছতা। যদি অনাচার হয়, তাও তুলে ধরতে হবে।

আগামী সপ্তাহেই তফসিল ঘোষণা হবে জানিয়ে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, এখনও কমিশন সভা ডাকা হয়নি। যেদিন কমিশন সভা হবে সেদিনই তফসিল ঘোষণা হবে। টেলিভিশন ও রেডিওতে ভাষণের মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার তফসিল ঘোষণা করবেন।

ডিসি-এসপিদের উদ্দেশে কর্মশালায় সিইসি বলেন, ‘সমন্বয় করে সুন্দরভাবে নির্বাচন তুলে আনার চেষ্টা করবেন। ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের স্বাধীনতা যেন ব্যাহত না হয়। ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন। ভেতরে যদি সিল মারা হতে থাকে, কেউ না কেউ হয়তো তুলে (ছবি-ভিডিও) ফেলবে। সেটা যখন প্রচারিত হবে, তখন আমাদের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। কেন এটা হলো? আমাদের ব্যর্থতা অথবা অদক্ষতার বিষয়টি আসতে পারে।’

শুক্রবার সকালে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই) ভবনে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত দ্বিতীয় দফা প্রশিক্ষণে বিভাগীয় কমিশনার ও পুলিশ কমিশনার, উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি), জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সিইসি বলেন, আপনারা এমনভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, যাতে নির্বাচন সত্যিকার অর্থে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হয়। এ চেষ্টা কীভাবে করবেন, সেটা জানি না। কারণ, ওই জ্ঞান আমার নেই, আপনাদের আছে। আমাদের বার্তা হচ্ছে, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ আর সুশৃঙ্খল করবেন। গতকাল মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে বলেছি। উনিও চেয়েছেন, নির্বাচন যেন সুশৃঙ্খল হয়। সুশৃঙ্খল আমি করাতে পারব না, আপনাদেরই করাতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের গুরুত্ব অনুধাবন করবেন প্রথমে দায়িত্ববোধ দিয়ে, ক্ষমতা বা শক্তি দিয়ে নয়। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি ক্ষমতা প্রয়োগের প্রয়োজন হয়, তখন ক্ষমতা বা শক্তি দেখাবেন। গণতন্ত্রকে আক্ষরিক ও চেতনাগত অর্থে যদি বাস্তবায়ন করতে না পারি, তা হলে জাতির সামনে আমাদের জন্য এটা ব্যর্থতার নজির হয়ে থাকবে।

ডিসি-এসপিদের উদ্দেশে সিইসি বলেন, আপনাদের সহায়তা নিয়েই কিন্তু আমাদের কাজ করতে হবে। প্রত্যাশিত সহযোগিতা আগের নির্বাচনে পুরোপুরি পেয়েছি। সেদিন থেকে আশ্বস্তবোধ করছি। যদিও জাতীয় নির্বাচনের ডাইমেনশন অনেক বেশি। তিনি বলেন, নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্রের বাহন ও প্রাণ। সে জন্য গুরুত্ব অনুধাবন করে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমাদের মূল চাওয়াটা হচ্ছে ভোটাধিকার যেন ব্যাহত না হয়। ভোটাররা যেন ভোট দিতে পারেন। এটা আমরা দেখতে চাই।

কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ইসির দায়িত্বের একটি বিষয় হচ্ছে নির্বাচনী প্রক্রিয়া দৃশ্যমান করে স্বচ্ছতা সৃষ্টি করা। স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে অপপ্রচার ঢাকা পড়ে যায়। স্বচ্ছতা বলতে অনাচার হলেও স্বচ্ছতা এবং সদাচার হলেও স্বচ্ছতা সৃষ্টি করতে হবে।

সুশৃঙ্খল নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনে ক্ষমতা ও শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দিয়ে ডিসি-এসপিদের উদ্দেশে সিইসি বলেন, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের উদ্দেশে বলি- দায়িত্ববোধ থেকে নির্বাচনের গুরুত্ব অনুধাবন করবেন। একই সঙ্গে সুশৃঙ্খল নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনে ক্ষমতা ও শক্তি প্রয়োগ করবেন। আমরা দেখতে চাই প্রজ্ঞা, শক্তি, অভিজ্ঞতা, জ্ঞান দিয়ে এমনভাবে দায়িত্ব পালন করবেন যেন নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়। আমাদের বার্তা হচ্ছে, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল হতে হবে। সুশৃঙ্খল আমি করাতে পারব না। আপনারা পারবেন।

তিনি বলেন, ডিসি-এসপিরা কিন্তু ভোটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন। তাদের কাজের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। দায়িত্ববোধ থেকে ক্ষমতা ও শক্তি প্রয়োগ নয়, ক্ষমতা ও শক্তি প্রয়োগ করবেন যদি প্রয়োজন হয়। তবে প্রথমে দায়িত্বটা অনুধাবন করার চেষ্টা করবেন, যদি গণতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র বুঝে থাকেন। সেটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আক্ষরিক অর্থে যদি দায়িত্ব বাস্তবায়ন করতে না পারি, তা হলে জাতি হিসেবে আমরা ব্যর্থ হব।

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আহসান হাবিব খান বলেন, নির্বাচন একটি টিমওয়ার্ক। নির্বাচন কমিশন একা সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবে না। এখন সবকিছুই দৃশ্যমান, আগের দিন নেই। প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। মিডিয়ার ভাইয়েরা আমার চোখের কাজ করে। যাদের হাতে মোবাইল আছে, তারাও কিন্তু এ ধরনের অ্যাকটিভিটিস (তৎপরতা) করছে। তিনি আরও বলেন, প্রায়ই একটা প্রশ্ন আসে- অতীত, অতীত, অতীত। আমি কিন্তু অতীতকে বিশ্বাস করি না। কারণ, অতীতকে আমরা পরিবর্তন করতে পারব না। অতীত থেকে আমরা শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে একটি সুন্দর, অবাধ, সুষ্ঠু, উৎসবমুখর- এমন একটা নির্বাচন উপহার দেব, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।

ডিসি, এসপিসহ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষ থাকার আহ্বান জানিয়ে নির্বাচন কমিশনার রাশেদা সুলতানা বলেন, যখনই আমরা নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলি, তখনই একটা প্রশ্নের জন্ম হয়। জনগণের মধ্য থেকে শুরু করে প্রার্থী যারা থাকেন, প্রত্যেকের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। এই ক্ষোভের যেন সৃষ্টি না হয়, সেটা যেন কোথাও আমরা না দেখি। আপনারা আন্তরিকতার সঙ্গে সবাইকে সমান চোখে দেখে কাজটা করবেন।’

নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর বলেন, আপনারা জানেন নির্বাচন কীভাবে করতে হয়। আমরাও জানি কীভাবে নির্বাচন করাতে হয়। এর মধ্যে যদি কোনো পার্থক্য বা গ্যাপ থাকে, সে বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

দুই দিনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে যেসব আলাপ-আলোচনা হবে, তা নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী শীর্ষ কর্মকর্তাদের মনোযোগ দিয়ে শোনার আহ্বান জানান নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান। বলেন, আগামী এক সপ্তাহেই হয়তো তফসিল ঘোষণা হয়ে যাবে, সে জন্য সবাই যেন মনোযোগ দিয়ে শোনেন, সে আহ্বান জানাচ্ছি।

ইসি সচিব মো. জাহাংগীর আলম বলেন, নির্বাচনে কর্মকর্তাদের যে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা যথাযথভাবে পালন করতে হবে। যাতে ভোটাররা নিজের ভোট নিজে দিতে পারেন, যাকে খুশি তাকে দিতে পারেন, এটা নিশ্চিত করতে হবে।

কর্মশালায় আরও বক্তব্য দেন ইটিআইয়ের মহাপরিচালক এসএম আসাদুজ্জামান। ৩২ জেলার ডিসি, এসপি, পুলিশ কমিশনার, বিভাগীয় কমিশনারসহ মাঠ প্রশাসনের ১১৪ জন কর্মকর্তা দুদিনের এ আবাসিক প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। এর আগে প্রথম ধাপের কর্মসূচিতে গত ১৪ ও ১৫ অক্টোবর অন্যান্য জেলার ডিসি, এসপি ও সংশ্লিষ্ট বিভাগেলিশ কমিশনার ও বিভাগীয় কমিশনারদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়।

 

 

ট্যাগ: