সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
শিল্প খাতের কাঁচামাল আমদানি ও উৎপাদিত পণ্য রফতানির ওপর ভর করে চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিবছরই বেড়ে চলেছে কনটেইনার পরিবহন। সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরেই (২০১৭-১৮) বন্দরে কনটেইনার পরিবহনের হার হামবুর্গ পোর্ট কনসাল্টের (এইচপিসি) ২০১৯ সালের পূর্বাভাস ছাড়িয়ে গেছে। পণ্য ওঠানামায় প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামো উন্নয়ন করা না হলে ২০১৮ সালের পর চট্টগ্রাম বন্দর প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার সক্ষমতা হারাবে বলে সতর্ক করা হয়েছে এইচপিসির মহাপরিকল্পনায়। তবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন ও এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে বলে দাবি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের।
চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য এইচপিসির করা ৩০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনাটিতে বলা হয়েছে, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও জেনারেল কনটেইনার বার্থ (জিসিবি) মিলিয়ে ২০১৯ সালে বন্দরে ২৬ লাখ ৪৬ হাজার টিইইউ কনটেইনার ওঠানো-নামানো হবে। অথচ ২০১৭-১৮ অর্থবছরেই চট্টগ্রাম বন্দরে এরচেয়ে অনেক বেশি পণ্য ওঠানামা করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ২৮ লাখ ৮ হাজার ৫৫৪ টিইইউ কনটেইনার পরিবহন হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পণ্যভর্তি ও খালি মিলিয়ে কনটেইনার পরিবহন হয়েছিল ২৫ লাখ ৩ হাজার ৪৭১ টিইইউ। এ হিসাবে কনটেইনার পরিবহন বেড়েছে ৩ লাখ ৫ হাজার টিইইউ বা ১২ শতাংশ।
এইচপিসির মহাপরিকল্পনায় আরো বলা হয়েছে, পণ্য ওঠানামায় প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে চট্টগ্রাম বন্দরের হ্যান্ডলিং সক্ষমতা চলতি বছরেই পূর্ণ হবে। এ সময়ের মধ্যে নতুন টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু না হলে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত জাহাজগুলো বন্দরে ভিড়তে পারবে না।
তবে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বিধায় সংকটে পড়তে হবে না বলে মনে করছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। আগামী অর্থবছরসহ ভবিষ্যতে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়ন-সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বর্তমানে বন্দরের ইয়ার্ডে ৫০ হাজারের বেশি কনটেইনার রাখা সম্ভব হচ্ছে। নতুন নতুন ইয়ার্ড তৈরির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রায় ৩৩ একর জায়গায় নতুন করে ওভার ফ্লো ইয়ার্ডের নির্মাণকাজও চলছে।
ইয়ার্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরে অত্যাধুনিক কি-গ্যান্ট্রি ক্রেন সংযোজনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বরে ছয়টি কি-গ্যান্টি ক্রেন এসে পৌঁছবে চট্টগ্রাম বন্দরে। এগুলো মোট ছয় লাখ টিইইউ কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সক্ষমতা বাড়াবে। আগামী বছরের এপ্রিলে আরো চারটি কি-গ্যান্ট্রি ক্রেন যুক্ত হবে। এর পরের ধাপে এ ধরনের আরো পাঁচটি ক্রেন কেনার পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। ২০২০ সালের শেষের দিকে একটি জাহাজে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজে তিনটি করে কি-গ্যান্ট্রি ক্রেন যুক্ত করার পরিকল্পনাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনটিতে।
এদিকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর নাগাদ পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের (পিসিটি) চারটি জেটি প্রস্তুত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। এ কাজ শেষ হলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়বে তিন লাখের বেশি। আবার চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বে-টার্মিনালের জন্য শিগগিরই ব্যক্তি মালিকানাধীন ৬৮ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এ টার্মিনালে ইয়ার্ড যুক্ত হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে পরিকল্পনা প্রতিবেদনে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমোডর জুলফিকার আজিজ এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে ব্যবহারকারীদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেয়ার জন্য আমরা এখন শুধু পরিকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবায়নে নেমে পড়েছি। পাঁচ বছরে এখানে কনটেইনার পরিবহন দ্বিগুণ হয়েছে। এ চাপ সামাল দেয়া সম্ভব হয়েছে কারণ আমরা প্রচুর পরিমাণে ইয়ার্ড তৈরি করেছি। তবে শুধু ইয়ার্ড নির্মাণের মধ্যেই আমরা সীমাবদ্ধ থাকছি না। আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজনের মাধ্যমে উন্নত ও আধুনিক বন্দরের আদলে পণ্য দ্রুত ওঠানামার ব্যবস্থা করছি আমরা। এজন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করছি। আগামী অর্থবছরে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলে কনটেইনার হ্যান্ডলিং বাড়বে চার লাখ। সেক্ষেত্রেও আমরা আমাদের হিসাব অনুযায়ী সক্ষমতায় এগিয়ে থাকব।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে কনটেইনার পরিবহনের হার বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির একটি সামগ্রিক ধারণা পাওয়া যায়। কারণ দেশের শিল্প খাতের কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কনটেইনারে করেই আমদানি-রফতানি করা হয়। আর সমুদ্রপথে দেশে কনটেইনার পরিবহনের ৯৭ শতাংশই সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে। বাকি ৩ শতাংশ কনটেইনার পরিবহন হয় মোংলা বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে।
চট্টগ্রাম বন্দরের মূল স্থাপনায় বর্তমানে জেটি রয়েছে ১৯টি। এর মধ্যে বন্দরে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর জন্য জেটি রয়েছে ১৩টি। বাকি ছয়টি কনটেইনারবিহীন (খোলা পণ্যবাহী) জাহাজের জন্য বরাদ্দ। ২০০৭ সালে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল চালুর পর এখন পর্যন্ত বন্দরে নতুন করে আর কোনো টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়নি। অথচ বন্দরের হিসাব অনুযায়ীই, দুই থেকে তিন বছর পরপর একটি করে জেটি নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, বাংলাদেশের ব্যবসা যে গতিতে বাড়ছে, তার সঙ্গে ভারসাম্য রেখেই বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সরকার ২০২১ সালে ৬ হাজার কোটি ডলার রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে। গত ৪০ বছরে জেটি নির্মাণের দরকার ছিল ৬০টি। হয়েছে সাতটি। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আগে থেকে কাজ করা হয়নি বলেই আজ ব্যবসায়ীদের মাশুল দিতে হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভোক্তা শ্রেণী। তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের বে-টার্মিনালের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিতে হবে। বন্দর কর্তৃপক্ষের বর্তমান চেয়ারম্যানের সে আন্তরিকতা রয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করি।









