সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
দেশীয় স্পিনিং শিল্প রক্ষার যুক্তিতে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতির প্রতিবাদে আজ সোমবার বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ও বিকেএমইএ যৌথভাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছে। প্রয়োজনে পোশাকশিল্পের এই দুই শীর্ষ সংগঠন আইনি আশ্রয়ে যাওয়ার কথাও ভাবছে বলে জানা গেছে।

পোশাক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, হঠাৎ করে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করলে কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা তৈরি হবে, উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি আয়ও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত নিম্ন কাউন্টের সুতায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ড সুবিধা থাকায় শুল্কমুক্ত বা স্বল্প শুল্কে আমদানি অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এর ফলে আমদানিকৃত সুতা স্থানীয় বাজারে কম দামে বিক্রি হচ্ছে এবং দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।
বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এইচএস হেডিং ৫২.০৫, ৫২.০৬ ও ৫২.০৭-এর আওতায় ১০-৩০ কাউন্টের সুতা আমদানি ছিল প্রায় ৩৬ হাজার মেট্রিক টন, যার মূল্য প্রায় এক হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪১ হাজার মেট্রিক টনে, আর মূল্য ছাড়িয়ে যায় দুই হাজার ২০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরেও এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, বন্ড সুবিধার কারণে আমদানিকৃত নিম্ন কাউন্টের সুতার চাপে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো বর্তমানে মাত্র ৬০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাচ্ছে। এরই মধ্যে প্রায় ৫০টি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে, আরো অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখে পড়েছে। এতে শিল্পে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান উভয়ই হুমকির মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে, পোশাকশিল্পের নেতারা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প তাৎক্ষণিক কাঁচামাল সংকটে পড়তে পারে। বিশেষ করে নিট ও ওভেন দুই খাতেই উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে আজকের সংবাদ সম্মেলনে সরকারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হবে। একই সঙ্গে নীতিগত সমন্বয় না হলে আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতও দিতে পারে সংগঠনগুলো।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মতো বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা অনেকাংশে কমে যাবে। তখন ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজন ও ডাবল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে দেশীয় স্পিনিং শিল্প শক্তিশালী করা জরুরি। সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বিল অব এন্ট্রিতে সুতার কাউন্ট স্পষ্টভাবে উল্লেখ এবং এইচএস কোডের অপব্যবহার রোধে কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতি ফজলে এহসান শামীম কালের কণ্ঠকে বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্ত দেশের তৈরি পোশাক শিল্প এবং শীর্ষ রপ্তানি আয়ের খাতকে বড় ধরনের সংকটের মধ্যে ফেলেছে। এর ফলে রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের বাধা তৈরি করবে। একই সঙ্গে লিড টাইম (পণ্য জাহাজীকরণে সময়) বাড়বে। এ ছাড়া সরকারের এই সিদ্ধান্ত স্পিনিং শিল্প ও তৈরি পোশাক শিল্পের স্বার্থের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।









