
দেশের সোনালি আঁশখ্যাত পাটপণ্য বহুমুখী করা হবে এবং এটি অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখবে—এমন সম্ভাবনা থেকে পাটকে প্রধানমন্ত্রী বর্ষপণ্য ঘোষণা করেন। এ ছাড়া প্রণোদনা এবং বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদন ও এর ব্যবহার বৃদ্ধিতে সহায়তার জন্য বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০০২ সালে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) করা হয়।
কিন্তু বিশ্ববাজারে ভারতসহ অন্য দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা না থাকায় পাট ও পাটজাত পণ্যে নেতিবাচক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে চলতি অর্থবছরের গত আট মাসে। সদ্যঃপ্রকাশিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুসারে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গত বছরের একই সময়ের চেয়ে রপ্তানি কম হয়েছে ৭.৩৪ শতাংশ।

রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এমন নিম্নমুখী নিয়ে উদ্যোক্তারা বলেন, প্রচলিত ছালা ও কাঁচা পাটনির্ভর হওয়া এবং একই সঙ্গে বহুমুখীকরণে সক্ষমতার অভাবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা যাচ্ছে না বিপুল সম্ভাবনাময় এই খাতে। সরকারের নীতিসহায়তার অভাবে পণ্য বহুমুখীকরণের অভিভাবক প্রতিষ্ঠান জেডিপিসি এখনো আইনি কাঠামোতে আসতে পারেনি। আর্থিক সংকট, নকশা, গবেষণা এবং পণ্য বাজারজাতকরণে প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে পারছে না।
তাই তারা আগামী ১০ বছরের জন্য সমন্বিত একটি নীতিমালা করার পরামর্শ দিয়ে বলেছে, রপ্তানি প্রক্রিয়া অঞ্চল ইপিজেডের মতো কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া, ইউটিলিটি ভ্যাট ছাড় এবং রপ্তানিতে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের সমিতির আহ্বায়ক রাশেদুল করিম মুন্না কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশের পাটপণ্য বহুমুখীকরণে একমাত্র অভিভাবক প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় জনবল এবং আইনি কাঠামোর অভাবে কার্যকর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। ইউরোপসহ বিশ্ববাজারে বহুমুখী পণ্যের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও দেশি-বিদেশি বাজার থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না।
তিনি মনে বলেন, পাটশিল্পের উন্নয়নে পাটপণ্যের বহুমুখীকরণে বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুসারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে জরুরি ভিত্তিতে ‘মার্কেট অ্যানালিসিস’ করা যেতে পারে, যাতে উদ্যোক্তারা বাজার চাহিদাকে সামনে রেখে সঠিক পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নিতে পারেন। এ জন্য একটি সহায়ক রিসার্চ ইনস্টিটিউট স্থাপন করা যেতে পারে, যেখানে বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী পাটভিত্তিক নতুন নতুন বাণিজ্যিক পণ্য উদ্ভাবন করা হবে।
এ ছাড়া শিল্পের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
এদিকে জেডিপিসি সূত্রে জানা যায়, ২০০২ সালে জেডিপিসি গত দুই দশকে ৮০০ উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ এবং নিবন্ধিত করেছে। এর তিন শর বেশি উদ্যোক্তা সক্রিয়। ১৩৫ জন উদ্যোক্তা নিয়মিত জেডিপিসির বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে নিয়মিত পণ্য বিক্রি করেন। ২০২১ সালে এই কেন্দ্রের মাধ্যমে এক কোটি টাকার বেশি পণ্য বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৫ শতাংশের বেশি রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে জানিয়েছেন এর কর্মকর্তারা। তবে বহুমুখী পণ্য রপ্তানির এইচএস কোড না থাকায় প্রকৃত পরিসংখ্যান নেই প্রতিষ্ঠানটির কাছে।
জেডিপিসির নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম এনডিসি কালের কণ্ঠকে বলেন, জেডিপিসির সক্ষমতা বাড়াতে এর খসড়া আইন শেষের দিকে। আইন চূড়ান্ত করতে চলতি মাসেই কেবিনেটে পাঠানো হবে। এ ছাড়া দক্ষতা উন্নয়নে নেদারল্যান্ডস সরকারের পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিবিআইয়ের সঙ্গে মার্চ ও এপ্রিলের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হবে। তবে দ্রুত আইন পাস না হলে জেডিপিসির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে সংকট তৈরির আশঙ্কা করছেন তিনি। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে আইনি সরকারি সহযোগিতা দরকার।
এদিকে আজ জাতীয় পাট দিবস উপলক্ষে পাট ও পাটজাত পণ্যের উৎপাদন এবং রপ্তানি বৃদ্ধিতে অবদানের জন্য ১১ ব্যক্তি/সংগঠনকে সম্মাননা দেবে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় জানায়, ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে পাট দিবসের মূল অনুষ্ঠান এবং জেডিপিসি চত্বরে ছয় থেকে আট মার্চ পর্যন্ত বহুমুখী পাটপণ্য প্রদর্শনী ও মেলার আয়োজন করা হয়েছে। কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক প্রধান অতিথি হিসেবে এর উদ্বোধন করবেন।
২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী ৬ মার্চকে জাতীয় পাট দিবস ঘোষণা করেন। এই প্রেক্ষাপটে ‘সোনালি আঁশের সোনার দেশ, পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ’ স্লোগানে ৬ মার্চ পঞ্চমবারের মতো জাতীয় পাট দিবস উদযাপিত হচ্ছে। নতুন প্রজন্মকে পাটের সোনালি ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে অবহিতকরণ, পাট-পাটবীজ ও বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে উদ্বুদ্ধকরণ এবং পাটপণ্য ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে পাটের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে এ দিবসের তাৎপর্য অপরিসীম।
সূত্রঃ কালের কণ্ঠ








