সব খবর

পড়ো বই, গড়ো মন, আলোকিত করো জীবন

নিউজ ডেস্ক৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

মানুষের সভ্যতার বিকাশে জ্ঞানচর্চা এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। জ্ঞানই মানুষকে আলোকিত করে, চিন্তার দ্বার খুলে দেয় এবং একটি জাতিকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। আর এই জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হলো গ্রন্থাগার। তাই যথার্থই বলা হয়—গ্রন্থাগার শুধু বই রাখার স্থান নয়, এটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের উন্মুক্ত অঙ্গন।

প্রতিবছর ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস আমাদের সেই আলোকিত পথের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ‘গ্রন্থাগারে বই পড়ি, আলোকিত দেশ গড়ি’, ‘পড়ি বই আলোকিত হই, না পড়ি বই অন্ধকারে রই’—এই স্লোগানগুলো শুধু একেকটি বাক্য নয়; এটি একটি সচেতনতা, প্রতিজ্ঞা এবং জাতীয় দায়িত্ববোধের প্রতিফলন।
প্রাচীনকাল থেকেই গ্রন্থাগার মানবসভ্যতার জ্ঞানের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত গ্রন্থাগার ছিল পৃথিবীর প্রথম দিকের জ্ঞানকেন্দ্রগুলোর একটি।

সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগৃহীত পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ করা হতো। যেসব জাতি জ্ঞানকে গুরুত্ব দিয়েছে, তারা সভ্যতার শীর্ষে পৌঁছেছে। গ্রন্থাগার সেই জ্ঞানের বাতিঘর হিসেবে কাজ করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন বলেছিলেন, ও পধহহড়ঃ ষরাব রিঃযড়ঁঃ নড়ড়শং. অর্থাৎ বই ছাড়া জীবন কল্পনা করা যায় না।

এই উক্তির মধ্যেই বইয়ের গুরুত্ব ও গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গ্রন্থাগার মানুষের মানসিক বিকাশের অন্যতম মাধ্যম। বই পড়ার মাধ্যমে মানুষ নতুন জ্ঞান অর্জন করে, চিন্তাশক্তি প্রসারিত হয় এবং সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে। বিখ্যাত চিন্তাবিদ ফ্রান্সিস বেকন বলেছেন, জবধফরহম সধশবঃয ধ ভঁষষ সধহ. অর্থাৎ পাঠ মানুষকে পূর্ণতা দেয়। গ্রন্থাগারে বসে বই পড়া শুধু জ্ঞান অর্জনের বিষয় নয়, এটি আত্মগঠন ও ব্যক্তিত্ব বিকাশেরও একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

একটি জাতির উন্নয়ন নির্ভর করে সেই জাতির শিক্ষার ওপর। আর শিক্ষা বিস্তারের অন্যতম মাধ্যম হলো গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগার মানুষের কাছে জ্ঞানের সমান সুযোগ সৃষ্টি করে। ধনী-গরিব, ছোট-বড় সবাই গ্রন্থাগারের মাধ্যমে জ্ঞানের আলো গ্রহণ করতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রন্থাগার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘গ্রন্থাগার হচ্ছে জ্ঞানের সাগর, যেখানে মানুষ নিজের ইচ্ছামতো মুক্তো আহরণ করতে পারে।’

জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে বই পড়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান যুগ তথ্য-প্রযুক্তির যুগ হলেও বইয়ের গুরুত্ব কখনো কমে যায়নি। বরং প্রযুক্তির সহায়তায় গ্রন্থাগারের পরিধি আরো বিস্তৃত হয়েছে। ডিজিটাল লাইব্রেরি এখন জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবে মুদ্রিত বইয়ের আবেদন আজও অম্লান। বিখ্যাত সাহিত্যিক জর্জ আর আর মার্টিন বলেছেন, অ ত্বধফবৎ ষরাবং ধ ঃযড়ঁংধহফ ষরাবং নবভড়ত্ব যব ফরবং. অর্থাৎ একজন পাঠক তার জীবনে হাজারো জীবন অনুভব করতে পারে। বই মানুষকে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত করে এবং চিন্তাজগেক সমৃদ্ধ করে।

গ্রন্থাগার একটি সমাজের সাংস্কৃতিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি শুধু শিক্ষা নয়; সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘পড়ো বই, গড়ো মন, আলোকিত করো জীবন।’

বাংলাদেশে গ্রন্থাগার আন্দোলনের ইতিহাসও অত্যন্ত গৌরবময়। স্বাধীনতার পর থেকে সরকার ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং গ্রন্থাগার ব্যবহারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। একজন বিখ্যাত মনীষী শিক্ষার প্রসার সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘শিক্ষিত জাতি ছাড়া উন্নত দেশ গড়া সম্ভব নয়।’

শিশু ও তরুণ প্রজন্মকে বই পড়ায় উৎসাহিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ তারাই ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দেবে। শিশুরা যখন গ্রন্থাগারে গিয়ে বই পড়ে, তখন তাদের কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতা বিকশিত হয়।

বর্তমান সময়ে অনেক তরুণ বই পড়ার বদলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশি সময় ব্যয় করছে। ফলে তাদের জ্ঞানচর্চা সীমিত হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। নিয়মিত গ্রন্থাগারে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘ঊফঁপধঃরড়হ রং ঃযব শরহফষরহম ড়ভ ধ ভষধসব, হড়ঃ ঃযব ভরষষরহম ড়ভ ধ াবংংবষ.’ অর্থাৎ গ্রন্থাগার সেই আগুন জ্বালিয়ে দেয়, যা মানুষের চিন্তাকে আলোকিত করে।

জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস আমাদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা। এই দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জ্ঞানই জাতির প্রকৃত শক্তি। বই পড়ার মাধ্যমে আমরা নিজেদের আলোকিত করতে পারি এবং একটি সমৃদ্ধ জাতি গড়ে তুলতে পারি। মহান মনীষী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, ‘যে জাতি বই পড়ে না, সে জাতি উন্নতি করতে পারে না।’

পরিশেষে বলা যায়, গ্রন্থাগার মানবসভ্যতার জ্ঞানের ভাণ্ডার এবং জাতির উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং গ্রন্থাগারকে জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করতে হবে। তাহলেই আমরা একটি শিক্ষিত, সচেতন ও আলোকিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।