সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এগিয়ে আসছে। সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই এ নিয়ে নড়াচড়া শুরু হয়েছে। জোট গঠিত হচ্ছে, জোট ভাঙছে। দল ভাঙছে, দল পুনর্গঠিত হচ্ছে। কেউ কেউ আছেন সুযোগের সন্ধানে। দুই দিকেই তাদের যাতায়াত।
শাসক দল নির্বাচনী প্রচারণায় বেশ এগিয়ে। তারা জনসভা করে চলেছে। জোটবদ্ধভাবে বিরোধীরাও পিছিয়ে নেই। তারাও সভা-মিটিং করছে। মোটামুটি বলা চলে নির্বাচনী উত্তাপ তৈরি হচ্ছে। গেলবারের মতো নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত অন্তত তা-ই দেখা যাচ্ছে।

গ্রামাঞ্চল আবার জেগে উঠেছে। নির্বাচনী উৎসব সামনে। আর দেরি নেই। বড়জোর মাস দুয়েক। দলীয় লোকজন, দলের বাইরের লোকজন এবং মনোনয়নপ্রত্যাশীরা গ্রাম চষে বেড়াচ্ছেন। প্রস্তুতি সর্বাত্মক।
নির্বাচন যে খুবই কাছে তা বোঝা যায় পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকাণ্ডেও। গত ২৪ অক্টোবর যুগান্তরের সংবাদে দেখলাম নির্বাচন সামনে রেখে ‘একনেক’ ২১টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। বিশাল ঘটনা, প্রচুর টাকার কারবার। প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প।
এ টাকায় ড্রেন, ড্রেজিং, রাস্তাঘাট পুনর্নির্মাণ ইত্যাদি হবে। প্রশ্ন, এই টাকা কি নির্বাচনের কাজে লাগবে? মনে হয় না। প্রকল্প পাস মানেই প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়া নয়। তবে এর সঙ্গে ভোটের যোগ আছে। ভোটারদের ‘বুঝ’ দেয়া হবে যে, প্রকল্প হচ্ছে। রাস্তাঘাট ইত্যাদি হবে। কর্মীরা বুঝবে টাকা আসবে, আসছে।
তাদের ‘তরিক্কি’ হবে। তারা বিপুল উৎসাহ নিয়ে কাজ করবে। এটা হচ্ছে ভবিষ্যতের কথা। কিন্তু এই মুহূর্তেই বাজারে টাকা ঢুকছে। কত টাকা? নির্বাচন উপলক্ষে ব্যয়িত এই টাকা অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে- এসব এখন বড় প্রশ্ন। কোন কোন খাত এই খরচের কারণে উপকৃত হবে- এ ধরনের প্রশ্ন অর্থনীতিবিদদের মধ্যে।
প্রশ্ন, কারণ দুটো ঈদের পর ‘নির্বাচনী উৎসব’ই সবচেয়ে বড় উৎসব, যদিও তা পাঁচ বছর পরপর আসে। গতবার নির্বাচন জমেনি। টাকাও সেভাবে গ্রামাঞ্চলে যায়নি। কিন্তু এবার যাবে। কারণ ৩০০ আসনে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তারা আগের দিনের লোক নন। আগে নির্বাচনের জন্য লোক পাওয়া যেত না। জোর করে প্রার্থী করানো হতো। এখন অবস্থা বদলেছে। ঘরে ঘরে প্রার্থী। ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, রাজনৈতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, ডাক্তার-মোক্তার, ব্যারিস্টার সবই আছে এর মধ্যে। লক্ষণীয়, এবারের নির্বাচনে ব্যবসায়ীরাই থাকবেন সামনে। কাগজে দেখলাম ব্যাংক মালিক, গার্মেন্ট মালিক, বীমা ও লিজিং কোম্পানির মালিকদের অনেকেই মনোনয়নপ্রত্যাশী। অনেক প্রবাসী বাঙালিও প্রার্থী।
যদি এই দৃশ্য ঠিক থাকে, তাহলে ৩০০ আসনে কত টাকা খরচ হতে পারে? ৩০০ আসনের প্রতিটিতে কম করে পাঁচজন ভালো প্রার্থী থাকতে পারেন। অন্যান্য প্রার্থীসহ একেক আসনে জনাদশেক প্রার্থী থাকতে পারেন। এদের অনেকেই ধনাঢ্য ব্যক্তি। তারা কে কত খরচ করবেন এর হিসাব দেয়া কঠিন।
তবে সাধারণভাবে ধারণা, ২-৪ কোটির নিচে আজকাল নির্বাচন করা যায় না। তবে বহু প্রার্থী যে ৫-১০-২০ কোটি টাকা খরচ করবেন এটা সহজেই অনুমান করা যায়। বহু লোকের কাছে এই টাকা কোনো টাকাই নয়। অনেকের কাছে এত টাকা আছে যে তার হিসাব করা কঠিন।
বলাই বাহুল্য, এই টাকার বিশাল অংশ ‘কালো টাকা’- কর না দেয়া টাকা। এবারের নির্বাচনে ‘কালো টাকা’র খেলা হবে বলে অনেকের ধারণা। কারণ প্রার্থীদের ‘কর ফাইলে’ কর পরিশোধিত টাকার পরিমাণ খুব বেশি নয়। যতদূর মনে আছে, সোয়া দুই কোটি টাকা সম্পদের মালিক কাগজে-কলমে মাত্র হাজারদশেক লোকের।
অথচ লাখ লাখ লোক শতকোটি টাকার মালিক। তারা নির্বাচন করবেন। তাই প্রশ্ন, কত টাকা খরচ হবে? সর্বমোট প্রার্থী যদি হয় আনুমানিক ১৫০০-২০০০ জন, তাদের প্রত্যেকে যদি আনুমানিক দুই কোটি টাকা করে খরচ করেন, তাহলে ব্যক্তিগতভাবে খরচ দাঁড়াবে ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বহু প্রার্থীর খরচ ৫-১০ কোটি টাকাও হবে। যদি তাই হয়, তাহলে প্রার্থীদের খরচ হবে আনুমানিক ১০-১৫ হাজার কোটি টাকা।
আবার খরচ আছে দলের। খরচ করবেন বন্ধুরা। খরচ করবেন নির্বাচনে ‘বিনিয়োগকারীরা’, যারা পরে সুবিধা লুটবেন। আবার খরচ আছে নির্বাচন কমিশনের। টাকা আসবে ‘বাইরে’ থেকেও। সব মিলিয়ে ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকার মামলা। ভাবা যায়! এই টাকার সবটাই প্রায় খরচ হবে গ্রামে।
এর ‘বেনিফিশিয়ারি’ হবে চা স্টল, খাবারের দোকান, জামাকাপড় ও গেঞ্জির দোকান, মোটরসাইকেল বিক্রেতারা। কাগজ-কালি খাতেও হবে বিরাট খরচ। ভোটার লিস্ট ফটোকপি করতে হবে লাখ লাখ। পেট্রল, গ্যাস, ডিজেল খরচা আছে। শাড়ি-লুঙ্গির খরচা আছে। দান করতে হবে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায়।
গরিবদের করতে হবে সাহায্য। এক অর্থে ধর্মীয় উৎসব থেকে নির্বাচনী খরচের সুবিধাভোগী লোক মনে হয় বেশি। গ্রামাঞ্চল আগামী দুই মাস থাকবে ‘ক্যাশে ক্যাশে’ সয়লাব। দুই ঈদে গ্রামে প্রচুর টাকা যায়। নির্বাচন উপলক্ষেও প্রচুর ক্যাশ যাবে গ্রামে। আমার ধারণা, ডিসেম্বর-জানুয়ারি পর্যন্ত ‘বাজারে চালু নোটের’ সংখ্যা বাড়বে, ভালোভাবেই বাড়বে।
যারা বড় ব্যবসায়ী তারা যদি নির্বাচন করেন, তাহলে তাদের অনেকের টাকা বাইরে থেকে আসতে পারে। ওটা তাদেরই টাকা। এর পরিমাণ কম হবে না। রেমিটেন্স কিছুটা বাড়তে পারে। কারণ অনেক প্রার্থীর আত্মীয়রা বাইরে থাকেন। তারা টাকা পাঠাতে পারেন।
যারা প্রবাসী তারা নির্বাচন করলে দেশের টাকা যেমন খরচ করবেন, তেমনি বিদেশে সঞ্চিত টাকাও দেশে আনবেন। এসব অবশ্যই কালো টাকা। কিন্তু তা তো খরচ হবে দেশীয় মুদ্রায়। অতএব বাজার থাকবে গরম। চাল, ডাল, নুন, তেল, মাছ, তরিতরকারি, মাংস ইত্যাদির মূল্য কিছুটা বাড়ার কারণ আছে।
প্রার্থীরা ‘গণভোজের’ আয়োজন করে থাকেন। সভা-সমিতি হবে অনেক। মাইক ভাড়ায় অনেক ব্যয় হবে। শামিয়ানা, চেয়ার-টেবিলের ভাড়া বৃদ্ধি পাবে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার ছেলেমেয়েদের কদর বাড়বে। দিনমজুরদের কদর বাড়বে। মহিলা কর্মীদের কদর বাড়বে।
কারণ মিছিল-মিটিং করতে হবে। শোডাউন হবে। কিছু শোডাউন দলের, কিছু প্রার্থীর। মোটরসাইকেল বিক্রি বাড়বে। কারণ প্রচুর মোটরসাইকেল লাগবে। এসবে টাকা যাবে প্রচুর। বলা বাহুল্য, নির্বাচনী খরচ এখন আর রাজস্ব খরচ নয়। এসব খরচ এখন বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত।
পাস করলেই দামি গাড়ি, সরকারি প্লট-ফ্ল্যাট এবং নানা ধরনের ব্যবসা। অফুরন্ত সুযোগ। রাজনীতি এখন আর গরিব ও মধ্যবিত্তের হাতে নেই। একসময় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল ধর্মীয় গুরুদের হাতে। তারপর তা গেছে রাজা-বাদশাহ-সামন্ত প্রভুদের হাতে। অনেক ক্ষেত্রে তারা ধর্মীয় গুরুদের সঙ্গে মিল করে রাষ্ট্র চালিয়েছেন। অনেক দেশে ওদের হাত থেকে একসময় ক্ষমতা চলে যায় ‘মিলিটারির’ হাতে। চলে সামরিক শাসন-আধা সামরিক শাসন। তারপর ক্ষমতা চলে যায় গণতান্ত্রিক নেতাদের হাতে।
জাতীয়তাবাদী নেতাদের হাতে। তাদের বিপুল ব্যর্থতা, স্বার্থপরতা, ধনলোলুপতা, ক্ষমতালিপ্সার কারণে ক্ষমতা এখন চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ীদের হাতে। সারা বিশ্বেই এ অবস্থা। বাজার অর্থনীতি, উদারীকরণ, বিশ্বায়ন, বাণিজ্যিকীকরণ ইত্যাদির ফলে ব্যবসায়ীরা দেশে দেশে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
তারা এখন আর চাঁদা দিতে রাজি নন। তারা এখন ক্ষমতা চান সরাসরি। নির্বাচন তাদের কাছে একটা বাহন। নির্বাচনী খরচ তাদের কাছে একটা বিনিয়োগ। কর্মীরাও তা বুঝে ফেলেছে। তাই দলের পদও এখন বিক্রি হয়। মনোনয়ন বিক্রি হয়। সব মিলিয়ে রাজত্ব এখন টাকার। ধন-সম্পদের। বলা বাহুল্য, এরই একটা মহড়া হবে আগামী নির্বাচনে।
টাকার মহড়া আগেও হতো। তবে এর আকার-পরিমাণ ছিল সীমিত। এখন আর তা নেই। একসময় বাঙালির হাতে কোনো টাকা ছিল না। ১০-১৫ কোটি টাকা দিয়ে একটা বেসরকারি ব্যাংক চালাতে পারে এমন বাঙালির সংখ্যা ছিল নগণ্য। এখন শত শত কোটি টাকার মালিক লাখ লাখ বাঙালি।
দেশ-বিদেশে তাদের সম্পদ। তারাই এখন ক্ষমতার সন্ধানে। ঘটনাক্রমে বাজার অর্থনীতি ও ধর্ম তাদের এই কাজকে সহজ করে দিচ্ছে। আগামী নির্বাচনে তাই ধর্মীয় নেতাদের দাম বাড়বে। ধর্মীয় লোকজনদের দাম বাড়বে। ‘জয়’ই যেহেতু লক্ষ্য, তাই প্রশাসনের দামও বাড়বে। বিপুল পরিমাণ টাকার লেনদেন হবে খোলাবাজারে।
এই খরচে অর্থনীতি লাভবান হবে কতটুকু? ভোগ ব্যয় বাড়বে। এটা জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
সাময়িকভাবে গ্রামের গরিবরা কিছুটা উপকৃত হবে। গ্রামাঞ্চলে যেহেতু টাকার আদান-প্রদান বাড়বে, তাই বাজারও থাকবে চাঙ্গা। যুবক-যুবতীরা আগামী দুই মাস থাকবে আনন্দে। হাতে তাদের টাকা আসবে। এই টাকা যাতে মাদকের পেছনে না যায় তার প্রতি লক্ষ রাখতে হবে। কারণ সহজে পাওয়া টাকা বিপথে খরচ হয়।
তবে বড় অসুবিধা একটা আছে। টাকাই যদি জয়ী হয়, তাহলে টাকা যা করে তা-ই হবে ভবিষ্যতে। ব্যবসায়ীরা যদি সংখ্যায় বেশি পাস করেন, তাহলে ব্যবসার ‘দর’ বাড়বে। মুনাফাই হবে জাতির কর্মপ্রেরণা। বুদ্ধিবৃত্তি, মেধা ইত্যাদির কদর কমার আশঙ্কা থেকে যাবে। জানি না শেষ পর্যন্ত কপালে কী আছে। তবে আশায় বুক বাঁধতে বাধা কোথায়।









