প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা খরচ করে রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তা পরামর্শক নিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকার। রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পারমানবিক নিরাপত্তা এবং বিকিরণ সুরক্ষা নিশ্চিতকরনের লক্ষ্যযে বাংলাদেশ পরমানু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এক উৎস হিসেবে রাশান ফেডারেশনের ‘রোস্টকনাডজোর’ থেকে পরামর্শক সেবা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ব্যয় হবে একহাজার ৩৫৪ কোটি টাকা। এ প্রকল্পটিসহ মোট দুইহাজার ২০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০ ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটি এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে ক্রয় প্রস্তাবগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে কমিটির সদস্য, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সচিব, সংশ্লিষ্ঠ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে অনুমোদিত প্রস্তাব গুলোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোস্তাফিজুর রহমান।

জানা গেছে, এগার বছর (২০১৬-২০২৬) মেয়াদে পরামর্শক ফি প্রদান বাবদ এ খাতে সরকারের ব্যয় হবে ১২ কোটি ৪৩ হাজার ডলার । ভ্যাট ও ট্যাক্সসহ এতে মোট ব্যয় হবে ১ হাজার ৩৫৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে রাশিয়ান ফেডারেশনের ভিভিইআর ১২০০ জেন-৩ রি-অ্যাক্টর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এ প্রেক্ষিতে পরমাণু শক্তি ব্যবহারকালে পারমাণবিক নিরাপত্তা ও বিকিরণ সুরক্ষায় সহযোগিতার লক্ষ্যে যে ২০১২ সালের রাশিয়ান ফেডারেশনের ‘দি ফেডারেল এনভায়রনমেন্টাল, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড নিউক্লিয়ার সুপারবিশন সার্ভিস’-এর সঙ্গে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে প্রথমে একটি ‘জেনারেল ফ্রেমওয়ার্ক কন্ট্রাক্ট’ (জিএফসি) এবং পরে এ-সংক্রান্ত একটি প্রটোকল সই করা হয়।
প্রসঙ্গত: ইন্টারন্যাশনাল অটোমিক এনার্জি এজেন্সি’র গাইডলাইন অনুযায়ী, নতুন কোন দেশে পারমানবিক বিদ্যুৎ চালুর ক্ষেত্রে ভেন্ডর কান্ট্রি থেকে রেগুলেটরি কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট সহায়তা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
জানা যায়, পরামর্শক সেবা গ্রহণে ফি নির্ধারণের ক্ষেত্রে দর কষাকষিতে ব্যয় কমিয়ে আনতে সফল না হলেও একই ব্যয়সীমার মধ্যে কাজের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। এদিকে চলমান প্রকল্পের কাজে জরুরি বিবেচনায় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে ফি বাবদ দুই ধাপে ৩০ লাখ ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। ট্যাক্স ও ভ্যাটসহ বাংলাদেশি টাকায় মোট পরিশোধ করা হয়েছে ৩৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা। বৈঠকে এর ভূতাপেক্ষ অনুমোদন দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানায়।
বৈঠক শেষে অনুমোদন পাওয়া অন্যান্য প্রস্তাব সম্পর্কে অতিরিক্ত সচিব মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চট্রগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনটিসি) ৪ও ৫ নম্বর বার্থ পরিচালনার জন্য সম্পাদিত চুক্তিমূল্য শেষে চুক্তিমূল্যের অতিরিক্ত ভেরিয়েশন অর্ডার ভূতাপেক্ষ অনুমোদনের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে কমিটি। প্রকল্পের প্রাক্কলিত দর ছিল ৪৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অতিরিক্ত ৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকার বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
তিনি বলেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ‘কন্সটাকশন অব ইন্টারন্যাশনাল প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল বিল্ডিং অ্যাট কক্সবাজার এয়ারপোর্ট’ শীর্ষক কাজ সম্পাদনের জন্য ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে কমিটি। প্রকল্পে ব্যয় হবে ২৭৫ কোটি টাকা। সিআরইডি অ্যান্ড এনডিই নামের দুটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
এছাড়া একই মন্ত্রণালয়ের ‘এক্সটেনশন অব অ্যাপ্রন টুয়ার্ডস নর্থ অব দ্য এক্সিস্টিং এক্সপোর্ট কার্গো অ্যাপ্রন অ্যাট হযরত শাহজালাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (ফেইজ-২)’ শীর্ষক কাজ সম্পাদনের জন্য ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে কমিটি। এ প্রকল্পে ব্যয় হবে ১৫৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা। মেসার্স ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন-২০১০’এর আওতায় রূপকল্প-৩ শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে কসবা-১ অনুসন্ধান কূপ খননের কাজ বিজয়-১২ রিগ দ্বারা সুষ্ঠু ও নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে পরিচালনা করার জন্য একজন বিশেষজ্ঞ প্রোগ্রামার এর সেবা গ্রহনের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে কমিটি। চীনের একটি প্রতিষ্ঠান এ সেবা প্রদান করবে। এ জন্য ব্যয় হবে ৬৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা।
একই মন্ত্রণালয়ের ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন-২০১০’এর আওতায় রূপকল্প-৩ শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে কসবা-১ অনুসন্ধান কূপ খননের কাজ বিজয়-১২ রিগ দ্বারা সুষ্ঠু ও নিরবিছিন্ন ভাবে পরিচালনা করার জন্য একজন বিশেষজ্ঞ টপ ড্রাইভ সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার এর সেবা গ্রহনের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে কমিটি।
এ জন্য ব্যয় হবে ৮৯ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। তিনি বলেন, বৈঠকে কনসোর্টিয়াম অব ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেড গুয়াইয়ামা পিআর হোল্ডিং বিভি অ্যান্ড স্ট্র্যাটিজিক ফাইন্যান্স লিমিটেড কর্তৃক নরায়নগঞ্জ জেলার মেঘনাঘাটে ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার (নেট ৫৮৪ মেগাওয়াট) গ্যাস /আরএলএনজি ভিত্তিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ¯’স্থাপনের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ২২ বছর পর্যন্ত সরকার প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় করবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ব্যবহার হলে প্রতি কিলোওয়াট ঘন্টা বিদ্যুতের দাম পড়বে ৩ টাকা ৯৫ পয়সা আর এলএনজি ব্যবহার হলে দাম পড়বে ৫ টাকা ৪৪ পয়সা।
অতিরিক্ত সচিব বলেন, বৈঠকে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ‘পল্লী বিদ্যুতায়ন সম্প্রসারনের মাধ্যমে ১৫ লাখ গ্রাহক সংযোগ’ শীর্ষক প্রকল্পের একটি সাব-প্যাকেজ আওতায় ৮৪,৮৬৪টি খুঁটি ক্রয়ের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দুটি লটে এসব খুঁটি সরবরাহ করা হবে। এরমধ্যে একটি লটে ৪২ হাজার ৩২টি খুঁটির দাম পড়বে ৮৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। বাকি ৪২ হাজার ৩২টি খুঁটির দাম পড়বে ৮৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ‘পল্লী বিদ্যুতায়ন সম্প্রসারনের মাধ্যমে ১৫ লাখ গ্রাহক সংযোগ’ শীর্ষক প্রকল্পের একটি সাব-প্যাকেজ আওতায় টার্ণ-কি ভিত্তিতে ৪টি সাব ষ্টেশন নির্মানের ক্রয়ের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ২৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
এছাড়াও একই বিভাগের ‘পল্লী বিদ্যুতায়ন সম্প্রসারনের মাধ্যমে ১৫ লাখ গ্রাহক সংযোগ’ শীর্ষক প্রকল্পের একটি সাব-প্যাকেজ আওতায় টার্ণ-কি ভিত্তিতে ৪টি সাব ষ্টেশন নির্মানের ক্রয়ের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ২৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এদুটি প্রকল্পই মেসার্স সানরাইজ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করবে।
এরআগে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘এস্টাব্লিসিং ডিজিটাল কানেক্টিভিটি (ইডিসি)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় জি২জি ভিত্তিতে পণ্য, ভৌত কাজ এবং সেবা ক্রয় সংক্রান্ত পদ্ধতি পরিবর্তনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। এছাড়াও বৈঠকে কাতার থেকে সরকারি পর্যায়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার টন ইউরিয়া সার আমদানির একটি প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।









