জাতীয়

দেশের প্রথম প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর হচ্ছে

নিউজ ডেস্ক২৬ নভেম্বর ২০১৬৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

মানুষের মন ও জ্ঞানের তৃষ্ণা মেটানোর পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বাড়াতে দেশে প্রথমবারের মতো একটি প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর নির্মাণ করতে যাচ্ছে সরকার। প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের মিশেলের এ জাদুঘরটি প্রাণী, উদ্ভিদ, পাহাড়, সাগর, নদী, হাওর, অরণ্য, ভূ-তত্ত্ব ও জলবায়ুবিদ্যার অতীত ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থার তথ্যচিত্রে ভরপুর থাকবে। এরই মধ্যে জাদুঘর নির্মাণের জন্য রাজধানীর সেগুনবাগিচায় চার একর জমি বরাদ্দ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনেকটা লন্ডনের প্রাকৃতিক জাদুঘরের আদলে তৈরি করা হবে জাদুঘরটি। এখন এর নকশা তৈরি ও সমীক্ষার কাজ চলছে বলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

 

সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রচলিত জাদুঘরের সঙ্গে প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরের বেশ পার্থক্য রয়েছে। প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর একটি দেশের জন্য শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত মানদণ্ডের ধারক ও বাহক। অন্য সব জাদুঘরের সঙ্গে তুলনা করলে এ  জাদুঘরে পরিবেশগত তথ্যচিত্র থাকে বেশি। পরিবেশ-প্রতিবেশ আগে কেমন ছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে, জাদুঘরে সে ইতিহাস সংরক্ষিত থাকবে। তিন-চার দশক আগেও দেশে যেসব উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিচরণ ছিল, যেটা এখন নেই, সেগুলোও সংরক্ষিত থাকবে প্রাকৃতিক জাদুঘরে।

 

 

এ প্রসঙ্গে সংস্কৃতিসচিব আকতারী মমতাজ গতকাল শুক্রবার বলেন, ‘প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি অগ্রাধিকার প্রকল্প। এটি নিয়ে তাঁর নিজস্ব ভাবনাও আছে। এটি নির্মাণের জন্য তিনি নিজেই সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পাশে জমি বরাদ্দ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সেখানকার কোনো গাছ না কাটার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু জমিটি আমরা এখনো বুঝে পাইনি। জমির কিছু অংশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ব্যবহার করছে। আমরা তাদের জায়গাটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছি। জমিটি বুঝে পেলে আমরা চূড়ান্ত ডিজাইন তৈরির কাজ শুরু করব। ডিজাইনের জন্য আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা হবে। তারপর ডিপিপি তৈরি করা হবে।’

 

 

একই মন্ত্রণালয়ের উপসচিব অসীম কুমার দে বলেন, প্রস্তাবিত জাদুঘরটি হবে একটি বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান; যেখানে দেশের উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতের অতীত ও বর্তমান ইতিহাস দেখতে ও জানতে পারবে দর্শনার্থীরা। এখন প্রকল্প প্রণয়নের কাজ চলছে। অতি দ্রুত প্রকল্প প্রণয়নের কাজ শেষ করে সেটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে অনুমোদনের প্রক্রিয়ার জন্য।

 

 

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১৫ এপ্রিল জাতীয় জাদুঘরের একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি দেশে একটি প্রাকৃতিক জাদুঘর নির্মাণের ঘোষণা দেন। একই বছরের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে জাদুঘরটির নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু করতে বলেন। এর পর থেকেই শুরু হয় প্রক্রিয়া। এরপর দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। তবে প্রাকৃতিক জাদুঘরের সঙ্গে যেহেতু পরিবেশের সম্পৃক্ততা বেশি, তাই নতুন এ প্রতিষ্ঠানটি কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে, তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। সম্প্রতি পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরসহ দুই মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে বসেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, প্রস্তাবিত এ জাদুঘর নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থাকবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ওপর। মন্ত্রণালয় মতামত সংগ্রহের জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়েও ইতিমধ্যে বৈঠক করেছে। এসব বৈঠকে নিসর্গবিদ অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মাও উপস্থিত ছিলেন।

 

 

জানতে চাইলে অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা বলেন, ‘এটি একটি বিশাল ব্যাপার হবে। এটি হবে মূলত জীব-ইতিহাস জাদুঘর। যত রকমের জীব ও উদ্ভিদ রয়েছে তাদের বৃত্তান্ত-ইতিহাস, পরিচিতি থাকবে। দৃশ্যমান করে তোলা হবে সুন্দরবনকে। সুন্দরবনে কী কী গাছপালা, প্রাণী, জীববৈচিত্র্য রয়েছে, তা তুলে ধরা হবে। বিলুপ্ত প্রাণী ডাইনোসরকে দেখা যাবে। মাছ, সাপ, ব্যাঙ, গাছপালা—সব প্রজাতির পরিচিতি তুলে ধরা হবে। পরিবেশ-প্রতিবেশকে জানার ও দেখার এক আধার হবে এটি। উন্নত দেশগুলোতে এ রকম জাদুঘর থাকলেও আমাদের এখানে এখনো এই রকম জাদুঘর গড়ে ওঠেনি। এ ধরনের জাদুঘর সম্পর্কে অনেকের ধারণাও নেই। এটি একটি চমৎকার উদ্যোগ। প্রকল্পটি দ্রুত সম্পন্ন করা উচিত।’

 

মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রাকৃতিক জাদুঘর নির্মাণের কোনো অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের না থাকায় বিশ্বে যেসব দেশে প্রাকৃতিক জাদুঘর আছে, সেগুলো কিভাবে নির্মাণ হয়েছে এবং কিভাবে চলছে, সে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাবে সরকার। এর মধ্যে বিশ্বে সফল কয়েকটি জাদুঘরকে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে বিশ্বে অন্যতম সফল একটি জাদুঘর হলো লন্ডনের প্রাকৃতিক জাদুঘর; যেখানে উদ্ভিদবিদ্যা, কীটতত্ত্ব, খনিজবিদ্যা, ফসিলবিদ্যা ও প্রাণিবিদ্যা—এই পাঁচ বিষয়ে অন্তত ৮০ মিলিয়ন তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। অনেকটা লন্ডন প্রাকৃতিক জাদুঘরের আদলেই দেশের প্রথম প্রাকৃতিক জাদুঘর নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান এক কর্মকর্তা।

 

 

জাদুঘর নির্মাণ নিয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পরিবেশ ও বন সচিব কামাল উদ্দিন আহমেদ তুরস্কের এমটিএ ন্যাচারাল হিস্টরি মিউজিয়ামের কথা তুলে ধরেন। সচিব বলেন, তুরস্ক সরকার সুদক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ইউরোপের অনেক উন্নত দেশকে পেছনে ফেলে ১৯৯৭ সালে শ্রেষ্ঠ জাদুঘর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। দেশে নতুন জাদুঘর গড়ে উঠলে সেটি স্বতন্ত্র ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তুরস্ক ও লন্ডন প্রাকৃতিক জাদুঘরও ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

 

 

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, তুরস্কসহ অনেক দেশ এরই মধ্যে কয়েকটি করে প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর নির্মাণ করেছে এবং নতুন করে আরো নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। সূত্র বলছে, লন্ডনের প্রাকৃতিক জাদুঘরে বছরে ৫৪ লাখ দর্শনার্থী ঘুরতে যায়। বাংলাদেশেও সে ধরনের একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর জাদুঘর গড়ে তুলতে পারলে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাবে।

সূত্র: কালের কন্ঠ