জাতীয়

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নয়ন করা হবে

নিউজ ডেস্ক৩ মে ২০২৬৮ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ও রেললাইনের উন্নয়নকাজ দ্রুত শুরু হবে। গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই প্রথম সিলেট সফরকালে এক সুধী সমাবেশে তারেক রহমান এ কথা বলেন। সকাল ১১টার দিকে সিলেট সিটি করপোরেশেনের নগর ভবন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী সিলেট নিয়ে একগুচ্ছ উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন এবং এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন।

সিলেটে প্রধানমন্ত্রীর দিনব্যাপী এই কর্মসূচিতে তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন সহধর্মিণী সিলেটের মেয়ে ডা. জুবাইদা রহমান।

সকালে প্রধানমন্ত্রী আকাশপথে সিলেট পৌঁছেন। এ সময় অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছিল। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই তিনি সফর শুরু করেন।
বিমানবন্দর থেকে তারেক রহমান হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতে যান।

এরপর নগরের সুরমা নদীর তীরে উদ্বোধন করেন শহর রক্ষা বাঁধ ও রিভার ড্রাইভ প্রকল্প। পরে নগর ভবন প্রাঙ্গণে সুধী সমাবেশে যোগ দেন।
সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক ও ঢাকা-সিলেট রেললাইনকে ডবল করার কাজ দ্রুত শেষ করার আশ্বাস দেন। এ ছাড়া তিনি নির্মাণের পর অব্যবহৃত পড়ে থাকা ২৫০ শয্যার হাসপাতাল চালু এবং পরবর্তী সময়ে সেটিকে এক হাজার ২০০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথা বলেন।

সিলেটের আইসিটি পার্ককে সচল করে সেটিতে কর্মসংস্থান তৈরিও খুব শিগগির হবে বলে জানান।
পাশাপাশি চিকিৎসা খাতকে আরো উন্নত করা এবং এ জন্য আরো এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা, বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা দ্রুত চালুর মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানান।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে সুধী সমাবেশে সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর, সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও শ্রম, কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গৌছ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। ডা. জুবাইদা রহমান তখন দর্শক সারিতে ছিলেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর নির্বাচনকালীন সিলেট সফর শেষে সড়কপথে ঢাকা ফেরার অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘তখন আমি বলেছিলাম, সিলেট থেকে লন্ডন যেতে ৯ থেকে সাড়ে ৯ ঘণ্টা সময় লাগে।

কিন্তু ঢাকা-সিলেট সড়কপথের এমন খারাপ অবস্থা মনে হয় ১০ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। সেদিন বলেছিলাম, আমরা সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে এই কাজটিতে হাত দেব, যাতে এটি দ্রুত হয়। সরকার গঠনের পর এর দায়িত্বে যে মন্ত্রণালয়, আমি তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। যতটুকু জেনেছি, কাজ শুরুর পর জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত ১১টি জায়গায় সমস্যা রয়ে গেছে।’
মহাসড়কের কাজ দ্রুত শুরু করার বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, ‘এখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে ইনশাআল্লাহ এই রাস্তার কাজটি আমরা শুরু করতে পারব। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এটা শেষ করতে পারব। এতে ঢাকা টু সিলেট, সিলেট টু ঢাকা যাতায়াতে মানুষকে এত কষ্ট ভোগ করতে হবে না।’

সড়কের পাশাপাশি রেলপথের উন্নয়ন করতে চান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের সরকার উদ্যোগ নিয়েছে কিভাবে সারা দেশে রেল যোগাযোগ বাড়ানো যায়। বেশির ভাগ মানুষ এতে যাতায়াত করবে। এতে যাতায়াত খরচ কম হবে, ব্যাবসায়িক খরচ কম হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা রাস্তা যত বড় করব, তত বেশি গাড়ি নামবে রাস্তায়। ট্রাফিক বাড়বে। তাই রেল যোগাযোগকে আমরা উন্নত করতে চাই।’

বন্ধ কলকারখানাগুলো দ্রুত চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে অনেকের বক্তব্যে উঠে এসেছে, সিলেটে সেই পরিমাণ ইন্ডাস্ট্রি বা শিল্প-কারখানা নেই। স্বাভাবিকভাবে এখানকার তরুণসমাজের অনেকে বেকার।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক কলকারখানা বন্ধ পড়ে আছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এই কলকারখানাগুলো বন্ধের কারণ বের করে যত দ্রুত সম্ভব চালু করা। দরকার হলে যারা এগুলো চালাতে আগ্রহী, তাদের কাছে হ্যান্ডওভার করব।’

স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘সেখানে চিকিৎসা ব্যয়বহুল। সে দেশের নাগরিক বা যারা বৈধভাবে বসবাস করে, তাদের যেকোনো ধরনের অসুস্থতা থেকে সুস্থ করার দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের। তাই সরকারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ থাকে। আমরাও চাই, আমাদের দেশের জনগণকে সুস্থ রাখতে, স্বাস্থ্যসেবা তাদের কাছে পৌঁছে দিতে।’

এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের ৮০ শতাংশই হবে নারী। তারা গ্রামে গ্রামে, ঘরে ঘরে যাবে। পরিবারের নারী সদস্যদের কাছে গিয়ে সচেতন করবে কোন খাবার খেলে ডায়াবেটিস হবে না, কোন খাবার খেলে হৃদরোগ হবে না, কোন খাবারটি খেলে কিডনির রোগ হবে বা হবে না। আমরা চাচ্ছি, ধীরে ধীরে যাতে দেশে সুস্থ মানুষের সংখ্যা বাড়ে।’

সিলেটবাসীর উদ্দেশে এ সময় তিনি বলেন, ‘সিলেট মেডিক্যাল কলেজের অধীনে সিলেটে ২৫০ শয্যার একটি হাসপাতাল রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি এই হাসপাতাল যাতে দ্রুত চালু করা যায়। এরপর এটিকে এক হাজার ২০০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘সিলেটে একটি আইটি পার্ক আছে। সেটি সেভাবে চালু হয়নি। এ নিয়ে এরই মধ্যে আমাদের আলোচনা হয়েছে। এটি যে মন্ত্রণালয়ের অধীনে আছে, তারা কাজ করছে। আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা আইটি পার্ক চালু করতে সক্ষম হব। তরুণসমাজের অনেকে যারা ফ্রিল্যান্সিং করে, আইটির কাজ করে, তাদের ওখানে আমরা সুযোগ তৈরি করে দেব।’

সুধী সমাবেশ শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিলেট সদর উপজেলার কান্দিরগাঁও ইউনিয়নে যান বাসিয়া খাল খননে। ১৯৭৭ সালে একই স্থানে খাল খনন করেছিলেন তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এবার সেটি পুনঃখনন করেন তাঁর ছেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ গ্রামে বাস করে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গ্রামের মানুষকে স্বাবলম্বী করাই আমাদের সরকারের মূল লক্ষ্য।’

প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে উঠতেই ‘দুলাভাই দুলাভাই’ স্লোগান : সিলেট সদর উপজেলায় বাসিয়া খাল খনন উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সমাবেশ মঞ্চে উঠতেই ‘দুলাভাই, দুলাভাই’ স্লোগান শুরু হয়। ক্রমে তা বাড়তে থাকে। প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেবেন বলে মাইক্রোফোন হাতে নিতেই সেটি আরো বেড়ে গেল।

প্রধানমন্ত্রীও খুনসুটিতে মেতে উঠলেন। মাইক্রোফোনে বললেন, ‘দুলাভাইকে কথা বলতে না দিলে দুলাভাই যাবে গিয়া, যাই আমি। যাব?’ বলেই ক্ষান্ত দিলেন না, যাওয়ার ভঙ্গিও করে দেখালেন। এতে মঞ্চের অতিথি থেকে শুরু করে জনতার মধ্যে হাসির ঝড় উঠল।

গতকাল সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নে বাসিয়া খাল খনন পরবর্তী জনসভায় এমন হাস্যরসের ঘটনা ঘটে। দুপুরে এই খাল খনন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর নদীর তীরে জনসভায় বক্তৃতা দেন।

এ সময় তারেক রহমান বলেন, ‘কথা বলতে হলে চুপ করতে হবে। আমি কথা বলি, শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে শুনতে হবে কথা।’

‘সাড়ে চার বছর আগে লন্ডনে রেস্টুরেন্টে বসে নতুন কুঁড়ির পরিকল্পনা’ : প্রায় সাড়ে চার বছর আগে লন্ডনের একটি রেস্টুরেন্টে বসে পুনরায় নতুন কুঁড়ি শুরুর পরিকল্পনা করেছিলেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল সিলেট জেলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে নতুন কুঁড়ি ২০২৬-এর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি নতুন কুঁড়ি শুরুর গল্পও শোনান উপস্থিত হাজারো শিশু শিক্ষার্থীকে।

প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় না গিয়ে সরাসরি শিশুদের সঙ্গে আলাপচারিতায় অংশ নেন। এ সময় তিনি নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস শুরু করার নেপথ্য পটভূমি তুলে ধরে বলেন, ‘প্রায় সাড়ে চার বছর আগে লন্ডনে এক বৈঠকে এই উদ্যোগের পরিকল্পনা করা হয়। তখন আমিনুল হকের (বর্তমান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী) সঙ্গে লন্ডনের একটি রেস্টুরেন্টে বসে আমরা নতুন কুঁড়ি পুনরায় শুরুর সিদ্ধান্ত নিই। সারা দেশের শিশু-কিশোরদের সম্পৃক্ত করে একটি নতুন ক্রীড়া কার্যক্রম চালু করার পরিকল্পনা করা হয়। আজ এটি বাস্তবায়ন করা হলো।’

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিশুদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের অ্যাম্বাসাডর। তোমাদের ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনের বাংলাদেশ। এ জন্য তোমাদের পড়ালেখা যেমন করতে হবে, তেমনি খেলাধুলাও করতে হবে। নিজেকে গড়ে তুলতে হবে।’

শিশু-কিশোরদের দেশের ভবিষ্যৎ উল্লেখ করে তাদেরই অনুষ্ঠানের ‘চিফ গেস্ট’ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আজকের এই অনুষ্ঠানের চিফ গেস্ট তোমরাই। তোমাদের মধ্য থেকেই ভবিষ্যতে এই দেশ নেতৃত্ব পাবে, তোমরাই বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে।’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।

কথা বললেই পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে, এটি চলবে না : কথা বললেই পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে—এমনটি আর চলবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তি‌নি বলেছেন, ‘মানুষ যদি কোনো সমস্যায় পড়ে তবে যেন তার সমস্যার কথা বলতে পারে। একটা কথা বলল, আর পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেল, নো, মানুষ এটা চায় না। কেউ যদি কোনো অপরাধ করে, তবে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেটা অন্য ব্যাপার।’

গতকাল সন্ধ্যায় সিলেট জেলা শিল্পকলা একডেমিতে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়সভায় তিনি এসব কথা ব‌লেন।

সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদীর সভাপতিত্বে এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরীর সঞ্চালনায় সভায় আ‌রো বক্তব্য দেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী।

কর্মিসভা শেষে প্রধানমন্ত্রী ওসমানী বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হন। রাতেই তিনি ঢাকায় পৌঁছেন। বাসস জানায়, সিলেট সফর শেষে গত রাত ৮টা ১৫ মিনিটে ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেন প্রধানমন্ত্রী।