নিজস্ব প্রতিবেদক:
সর্বশেষ গত ৬ মে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন এক শিশুর মৃত্যু হয়। ওইদিন হাসপাতাল থেকে দেওয়া তথ্য ছিল এরকম, ২৪ ঘন্টায় সাসপেক্টেড (উপসর্গ) হামের নতুন রোগী ভর্তি ১৩ জন, ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে ১৩ জন, সাসপেক্টেড হামে মৃত্যু একজন, সাসপেক্টেড হামে চিকিৎসাধীন ভর্তি রোগী ১১১, সাসপেক্টেড হামের মোট ভর্তি রোগী ৯৩৯ এবং মোট উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ৫৫ জন এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু ১ জন।
সর্বশেষ গতকাল শনিবার পর্যন্ত এ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত মোট শিশু চিকিৎসা নিয়েছে ১ হাজার ২৬৬ জন। কিন্তু গত ৬ মে’র পরে আর কোনো শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে এ হাসপাতালে মারা যায়নি বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে রাজশাহী হাসপাতালে গত দেড় মাস ধরে হামে মৃত্যু শিশুর সংখ্যা শূন্যতে নেমে এসেছে। হাসপাতালের দেওয়া প্রতিদিন হামের তথ্য বিশ্লেষণ করেও গত ৬ মে’র পরে আর কোনো শিশু মৃত্যুর তথ্য নাই। এতে করে এখন পর্যন্ত রাজশাহীতে হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৫৫ জন শিশু মারা গেছে। হামে শিশু মৃত্যুর খবর এই রাজশাহী দিয়েই শুরু হয়। এরপর দেশজুড়ে ক্রমেই বাড়তে থাকে একের পর শিশু মৃত্যুর ঘটনা।

রাজশাহী হাসপাতালে গত ১০ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত আইসিইউতে অপেক্ষামান শিশু মারা যায় ৪৯ জন। এর মধ্যে অধিকাংশই ছিল হামে আক্রান্ত শিশু। এ নিয়ে কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হলে দেশজুড়ে হৈচৈ শুরু হয়। এর পর বাড়ানো হয় শিশুদের জন্য আইসিইউ শয্যা সংখ্যা। তাতেই হামে আক্রান্ত হয়ে জটিল পর্যায়ে যাওয়া শিশুদের মৃত্যুহার কমতে থাকে। এরই মধ্যে রাজশাহীজুড়ে ব্যাপক হারে হামের টিকা প্রদানও শুরু করে স্বাস্থ্য বিভাগ। ফলে আস্তে ধিরে ধিরে মৃত্যুর সংখ্যা আরও কমতে থাকে। প্রথমদিকে প্রায় প্রতিদিনই যেখানে অন্তত একজন শিশু হাম উপসর্গে মারা যেত, এখন সেখানে গত দেড় মাসে একজন শিশুও মারা যায়নি। এটি স্বাস্থ্য বিভাগের বড় সফলতা বলেও দাবি করেছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, রাজশাহী সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হামের টিকা প্রদান সংক্রান্ত সর্বশেষ ২১ মে পর্যন্ত যে তথ্য দেওয়া হয়, তাতে দেখা গেছে ওইদিন পর্যন্ত রাজশাহী জেলাতেই ২ লাখ ৫ হাজার ১৩০ জন শিশুকে হাম রুবেলার টিকা প্রদান করা হয়েছে। যদিও হামে আক্রান্ত একটি বড় অংশ ছিল প্রতিবেশি জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা এবং কুষ্টিয়া থেকে রাজশাহী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুরা।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে এসব জেলাতেও ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সি সব শিশুকে হামের টিকার আওয়তায় আনা হয়। ফলে রাজশাহী হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে এখনো গড়ে প্রতিদিন ৮-১০ জন শিশু রাজশাহী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ভর্তি হচ্ছে। গতকাল পর্যন্ত ৪৬ জন শিশু চিকিৎসাধীন ছিল। তবে গত দেড় মাসে নতুন করে আর কোনো শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে বা উপসর্গ নিয়ে মারা যায়নি।
জানতে চাইলে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইন্টেসিভ কেয়ার ইউনিটের (আইসিইউ) দায়িত্বরত একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রথম দিকে আমরা হামে আক্রান্ত জটিল রোগীদের চাহিদামত আইসিইউ সাপোর্টও দিতে পারিনি। ফলে প্রতিদিনই অন্তত একজন শিশু মারা গেছে শুধু আইসিইউ’র অভাবে। তবে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর শিশুদের জন্য আইসিইউ সংখ্যা ১২টা থেকে বাড়িয়ে ১৮টিতে উন্নিত করা হয়। এরপর জটিল রোগীদের মৃত্যুহার কমতে শুরু করে। এখন হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা অনেক কমে যাওয়ায় শিশুদের আইসিইউ শয্যা সংখ্যা আবারও ১২টি করা হয়েছে।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র শঙ্কর কে বিশ্বাস বলেন, গত ৭ মে থেকে রাজশাহী হাসপাতালে আর কোনো শিশু হামে মারা যায়নি। এটি বড় সফলতা। আমরা হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। বিশেষ সুযোগ দিয়ে তাদের চিকিৎসা করানো হয়েছে। সে ক্ষেত্রেও মৃত্যুহার শূন্যতে নামানো গেছে।’
রাজশাহী সিভিল সার্জন এস,আই,এম রাজিউল করিম বলেন, ‘হাম উপসর্গে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা রাজশাহীতে শূন্যের কোটায় আমরা নামিয়ে আনতে পেরেছি। এর জন্য জেলাজুড়ে ব্যাপক হারে হাম রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি আমরা সম্পন্ন করেছি। সেই টিকার কার্যকরিতায় হাম উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা শূন্যে নেমে এসেছে। পাশ^বর্তি জেলাগুলোতেও একই কার্যক্রম চালিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ যার বড় সুফল এখন আমরা পাচ্ছি।’









