রাজশাহী

টিকটকার বিবাহিত অছাত্র শিবির ছাত্রলীগও ছাত্রদলের কমিটিতে

নিউজ ডেস্ক২১ জুন ২০২৬৫ মিনিট পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) ছাত্রলীগের উপ-সমাজসেবা সম্পাদক ছিলেন মিজানুর রহমান। হোস্টেলের কক্ষে গাঁজা সেবনের সময় ধরা পড়েছিলেন। তখন তাকে হোস্টেল কক্ষ থেকে বহিষ্কার করা হয়। ইন্টার্নশিপ স্থগিত রাখা হয় ছয়মাস। এছাড়া গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদের বিপক্ষে অবস্থানের কারণে পরে এক বছরের জন্য তার ইন্টার্নশিপ স্থগিত করা হয়। সেই ছাত্রলীগ নেতা এবার রামেক ছাত্রদলের সহসভাপতি হিসেবে পদ পেয়েছেন।City & Local Guides

গত বুধবার ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ রামেক ছাত্রদলের এই কমিটি ঘোষণা করেছে। একই দিন রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজ, রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভে ইনস্টিটিউট শাখা ছাত্রদলের কমিটিও ঘোষণা করা হয়েছে। সব কমিটিতেই রয়েছেন বিতর্কিত ব্যক্তিরা। এ নিয়ে রাজশাহীতে বিক্ষোভ-সমাবেশ ও সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করছেন ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। তারা অবিলম্বে ঘোষিত কমিটি স্থগিতের দাবি জানাচ্ছেন।

রামেক ছাত্রদলের সভাপতি হয়েছেন আমরি মীম, সাধারণ সম্পাদক রিমন আলী। কমিটির সহসভাপতি মিজানুর রহমান নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা। সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে মনোনীত আবু হানিফা হানিফও ছাত্রলীগ করতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় ভাঙচুরের প্রসঙ্গে একটি গ্রুপ চ্যাটে তিনি ‘আমাদের সব পার্টি অফিস শেষ করে দিছে’ মন্তব্য করেন।

এদিকে সরকারি সিটি কলেজ ছাত্রদলের আংশিক কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে আবু সাঈদ হাসানকে। আর সদস্য সচিব করা হয়েছে শামানুল হক হৃদয়কে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবু সাঈদ হাসান বিবাহিত। তিনি থাই-অ্যালুমিনিয়ামের ব্যবসায়ী। তার একটি ছেলেও আছে। আবু সাঈদের স্ত্রী লিপি নূর নিয়মিতই স্বামীর সঙ্গে ফেসবুকে ছবি প্রকাশ করেন।সরকারী প্রকল্প

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আহ্বায়ক আবু সাঈদ হাসান বলেন, ‘আমি বিবাহিত ঠিক আছে, আরও অনেকেই বিবাহিত আছে। বড় ইউনিটে যদি বিবাহিত থেকেও দায়িত্বে থাকতে পারে, আমি তো একটা ছোট ইউনিটের দায়িত্ব পেয়েছি। দায়িত্ব পালনে এটা কোনো বিষয় না।’

আবু সাঈদের সদস্য সচিব শামানুল হক হৃদয় টিকটকার। তিনি মদের বোতলের ছবি পোস্ট করে লেখেন ‘খেলা চলছে’। শামানুল তার ভিডিওতে অত্যন্ত অশ্লীল ও আপত্তিকর কথাবার্তা বলেন। এ জন্য সম্প্রতি নগরের বিনোদপুর এলাকায় তাকে কান ধরানো হয়। সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিকমাধ্যমে। এছাড়া এক তরুণীকে নিয়ে অশ্লীল ও আপত্তিকর মন্তব্য করার জেরে তার বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়। এ মামলায় সেদিনই নগরের চন্দ্রিমা থানা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার, কান ধরানো হলেও তিনি এখনও নারীদের নিয়ে অত্যন্ত অশ্লীল ও আপত্তিকর মন্তব্য করেন ফেসবুকে।

সিটি কলেজ ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রায়হান সুইট মাদক ব্যবসা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ২০১৯ সালের ২১ ডিসেম্বর এ নিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে তার বিরুদ্ধে বোয়ালিয়া থানায় মামলা হয়। সেই মামলায় তার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। এছাড়া ছিনতাইয়ের অভিযোগে ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। প্রতারণার অভিযোগে গত বছরের ১৩ অক্টোবর চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর থানায় তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা হয়। এই মামলাতেও গ্রেপ্তার হয়ে জেল খাটেন রায়হান। সিটি কলেজেই ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়কের পদ পাওয়া আব্দুর রহমান ওমর ফারুক অছাত্র। অনেক আগেই তার পড়াশোনা শেষ হয়ে গেছে। তবু তিনি কলেজ ছাত্রদলে পদ পেয়েছেন।

এদের বিতর্ক নিয়ে আহ্বায় আবু সাঈদ বলেন, ‘এগুলো তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। তবে ওমর ফারুকের ছাত্রত্ব আছে। অন্য দুজনের মামলা-মোকদ্দমার বিষয়টি আমি এখন জানতে পারছি।’

এদিকে রাজশাহী নিউ ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া মাহমুদ হাসান লিমনও বিবাহিত। তিনি এই কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সদস্য সচিব। নিউ ডিগ্রি কলেজে ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতির পদ পাওয়া রাইনুদ্দিন রানা সরকারি সিটি কলেজ ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে ছাত্রলীগের মিছিলে তিনি অংশ নিয়েছেন এমন ছবি পাওয়া গেছে।City & Local Guides

নিউ ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হওয়া রাতুল চৌধুরী ঐক্য নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী। নিউ ডিগ্রি কলেজ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইমনের শ্যালক তিনি। ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পাওয়া সাব্বির মাহমুদ খানও ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে রাজপাড়া থানায় তার বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির দুটি অভিযোগ হয়েছিল।

রাজশাহী কলেজ ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে শেখ নূর মোহাম্মদ ইমনকে। ছাত্রদলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, তিনি আসলে ছাত্রশিবির করতেন। তবে আওয়ামী আমলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ওঠাবসা করতেন। ছাত্রলীগকর্মীর জন্মদিনে কেক কেটে নিজের ফেসবুকে ছবিও দিতেন। মহানগর ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমেদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ তিনি। এই ‘প্রিয় ভাইয়ের’ সঙ্গেও ফেসবুকে নিয়মিত ছবি দেন।

রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রদলের নতুন সভাপতি শাকিল মণ্ডলও শিবিরঘনিষ্ঠ। তার ফেসবুকে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের ছবি। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান ছাত্রদলকে ‘ক্রস’ চিহ্ন দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে ছাত্রজীবন শেষ করবেন বলে ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন। রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভে ইনস্টিটিউটে ছাত্রদলে পদ পাওয়া নেতাদের কাউকেই চেনেন না মহানগরের নেতারা। তাদের নিয়েও রয়েছে বিতর্ক।

এসব কমিটি ঘোষণার পর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন ছাত্রদলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তারা শুক্রবার রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ ও সরকারি সিটি কলেজের সামনে সড়ক অবরোধ ও টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। সিটি কলেজে দুই গ্রুপের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।

জানতে চাইলে মহানগর ছাত্রদলের সদস্যসচিব এমদাদুল হক লিমন বলেন, ‘কলেজ ইউনিটের এসব কমিটি কীভাবে হয়েছে তা আমরা জানি না। আমাদের সঙ্গে কেন্দ্র কোনো আলোচনা করেনি। হঠাৎ দেখছি কমিটি দিয়েছে। এখানে ত্যাগি ও নির্যাতিত নেতাকর্মীরা বাদ পড়েছে। সেই জায়গা থেকে তারা বিক্ষোভ করছে। বিষয়টি কেন্দ্রকে জানানো হয়েছে।’