জাতীয়

জমে উঠছে বাগুড়ী বেলতলা আমের বাজার

নিউজ ডেস্ক১১ মে ২০২৬৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

জমতে শুরু করেছে যশোরের শার্শা উপজেলার বাগুড়ী বেলতলা আমের বাজার। দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম বড় এই পাইকারি আমের বাজারে মৌসুমের শুরুতেই যশোর ও সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আম আসতে শুরু করেছে।

বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, বাগুড়ী বেলতলা আমের বাজার থেকে আম কিনতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা আসছেন। প্রতিদিন হাজার হাজার মণ আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে এখান থেকে।

তারা জানান, বর্তমানে প্রতিদিন আট থেকে ১০ হাজার মণ আম দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। মৌসুম পুরোদমে শুরু হলে বেচাকেনা আরো বাড়বে বলে জানান তারা।
সোমবার (১১ মে) সরেজমিনে বাগুড়ী বেলতলা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সাতক্ষীরা-নাভারণ সড়কের দুই পাশে সারি সারি বসেছে আমের আড়ৎ। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে আম কেনাবেচা।

ছোট ট্রাক, পিকআপ ভ্যান, করিমন ও নছিমনে করে চাষিরা আম নিয়ে আসছেন। অন্যদিকে পাইকাররা দরদাম করে আম কিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠাচ্ছেন। ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাকে পুরো এলাকা মুখর হয়ে উঠেছে।
জানা যায়, উপজেলা প্রশাসন গত ৫ মে থেকে গোবিন্দভোগ আম গাছ থেকে পেড়ে বাজারজাত করার অনুমতি দেয়।

এরপর থেকেই জমে উঠতে শুরু করে বেলতলা বাজার। বর্তমানে বাজারে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে গোবিন্দভোগ আম। এছাড়া গোপালভোগ, ক্ষীরসাপাতি, গোলাপখাস, বৈশাখী ও স্থানীয় বিভিন্ন জাতের আম বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, আগামী ২১ মে থেকে হিমসাগর, ২৮ মে থেকে ল্যাংড়া এবং ৬ জুন থেকে আম্রপালি ও মল্লিকা বাজারে আসবে। তারা জানান, বর্তমানে প্রতিমণ গোবিন্দভোগ আম এক হাজার থেকে তিন হাজার টাকা, বোম্বাই আম এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকা, শরিখাস আম এক হাজার ৪০০ টাকা থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা এবং গোলাপখাস আম এক হাজার ২০০ টাকা থেকে এক হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

আমের আকার, মান ও জাতভেদে দামের তারতম্য রয়েছে।
আম চাষি সজিব শাহারিয়ার জানান, এবার এক মণ আম উৎপাদন করতে খরচ পড়ছে প্রায় এক হাজার টাকা থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। সার, কীটনাশক, শ্রমিক ও সেচ খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। তবে বাজারে ভালো দাম থাকায় পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে প্রতিমণে ৫০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত লাভ করছেন চাষিরা। কিছু উন্নত মানের আমে লাভ হচ্ছে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত।

কেশবপুরের পাঁজিয়া গ্রামের আম চাষি শাহীন আলম বলেন, মুকুলের সময় অতিরিক্ত গরম পড়ায় কিছু ক্ষতি হয়েছে। তার পরও এবার আমের মান ভালো। খরচ বেশি হলেও বাজারে দাম ভালো থাকায় লাভের আশা করছি।

ব্যবসায়ীরা জানান, গত ৫ মের আগে বাজারে আসা গুটি আম ও আঁটি আম মূলত আচারের জন্য বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে বাজারে আসছে পরিপক্ব ও খাওয়ার উপযোগী আম। প্রশাসনের নজরদারির কারণে অপরিপক্ব আম বাজারে তেমন আসতে পারছে না।

বেলতলা আম ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. কামরুজ্জামান বলেন, বাজারে ফরমালিনযুক্ত বা অপরিপক্ব আম বিক্রির সুযোগ নেই। কেউ কাঁচা অপরিপক্ক আম নিয়ে এলে তা আচারের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা চাই মানুষ নিরাপদ ও পরিপক্ব আম পাক।

এই ব্যবসায়ী নেতা আরো বলেন, আগে গাড়িপ্রতি ৮০০ টাকা থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হতো। গত দুই বছর ধরে চাঁদাবাজি বন্ধ রয়েছে। ফলে ব্যবসায়ীরা স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা করতে পারছেন। তিনি বলেন, এই বাজারে আম আনলে প্রতিমণে চাষিদের তিন থেকে পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত খাজনা দিতে হয়। এ ছাড়া আড়তদারদের প্রায় তিন শতাংশ কমিশন দিতে হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল রবিবার বাজারে প্রায় ২৫০ ক্যারেট আম বেচাকেনা হয়েছে। প্রতিটি ক্যারেটে গড়ে ২৫ কেজি করে আম থাকে। সে হিসেবে ওইদিন প্রায় ছয় হাজার ২৫০ কেজি বা ১৫৬ মণ আম বিক্রি হয়েছে। মৌসুমের মূল সময় শুরু হলে প্রতিদিন কয়েক হাজার ক্যারেট আম ওঠে বাজারে।

বেলতলা বাজারে বর্তমানে ৮৬টি আমের আড়ত রয়েছে। বাজার কমিটির তথ্যমতে, ‘এ’ গ্রেডের একজন আড়তদার প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার আম বিক্রি করেন। ‘বি’ গ্রেডের আড়তদারদের বিক্রি ছয় লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং ‘সি’ গ্রেডের আড়তদারদের বিক্রি তিন লাখ থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকার আম বেচাকেনা হচ্ছে এই বাজারে।

বেলতলা আম ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি লোকমান হোসেন বলেন, বেলতলা দেশের অন্যতম বড় আমের বাজার। দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও বিদেশে রপ্তানির জন্য এখান থেকে আম নেওয়া হয়। মৌসুম পুরোদমে শুরু হলে প্রতিদিন ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার মণ আম বিক্রি হবে।

শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফজলে ওয়াহিদ বলেন, শার্শার বেলতলা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি বড় আম বাজার। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন জেলার আমের চাহিদা পূরণ হয়। এ ছাড়া বিদেশেও আম রপ্তানি করা হচ্ছে। প্রশাসন নিরাপদ ও পরিপক্ব আম বাজারজাত নিশ্চিত করতে কাজ করছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, জেলায় এবার প্রায় চার হাজার দুই হেক্টর জমিতে আম উৎপাদন হচ্ছে। যশোরের মানসম্মত আম বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার মুকুলের সময় অতিরিক্ত গরম পড়ায় উৎপাদন কিছুটা কম হতে পারে।