ধর্ম

চিকিৎসকদের প্রতি ইসলামের নির্দেশনা

নিউজ ডেস্ক৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

মানুষ যাতে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকে সে ব্যাপারে ইসলাম জোর তাগিদ দিয়েছে। অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) উৎসাহিত করেছেন। তিনি নিজে অসুস্থ হলেও চিকিৎসা গ্রহণ করতেন। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো, কেননা আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার প্রতিষেধক তিনি সৃষ্টি করেননি। শুধু বার্ধক্যরোগ ছাড়া।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৮৫৫)

 

অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসার নির্দেশ

অভিজ্ঞ ব্যক্তির দিকনির্দেশনায় চিকিৎসা করা হলো ইসলামের নির্দেশ। হাদিস শরিফে এসেছে, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) হৃদরোগে আক্রান্ত হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে তখনকার প্রসিদ্ধ ডাক্তার হারেস ইবনে কালদাহের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৮৭৫)

মুসনাদে আহমাদের অপর একটি বর্ণনায়ও এসেছে যে জনৈক রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে রাসুল (সা.) গোত্রের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। (হাদিস : ২৩১৫৬)

 

চিকিৎসকের জন্য চিকিৎসাবিদ্যায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করা জরুরি

ইসলামী শরিয়ত যেভাবে রোগীকে নির্দেশ দেয় অভিজ্ঞ ডাক্তারের মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণের, তদ্রূপ ডাক্তারকে নির্দেশ দেয় পরিপূর্ণ জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের। না জেনে চিকিৎসা করা বৈধ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি ডাক্তারি না শিখে কারো চিকিৎসা করে, আর এতে অজ্ঞতার কারণে রোগীর কোনো ক্ষতি করে ফেলে, তাহলে চিকিৎসক দায়ী হবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৫৮৭)

চিকিৎসা যেহেতু অভিজ্ঞ ডাক্তার ছাড়া সম্ভব নয়, তাই প্রত্যেক এলাকায় প্রয়োজন মোতাবেক কিছু লোকের সাধারণ চিকিৎসাবিদ্যা অর্জন করা ফরজে কেফায়া। তাই প্রত্যেক দেশে প্রয়োজন মোতাবেক চিকিৎসাবিদ্যায় পরিপূর্ণ ব্যুৎপত্তি অর্জন করাও ফরজে কেফায়া। (আল মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যা আলকুয়েতিয়া : ১২/১৩৫)

 

চিকিৎসকের নৈতিক দায়িত্ব

চিকিৎসকের দায়িত্ব হলো পরিপূর্ণ মনোযোগ সহকারে রোগীর রোগ শনাক্ত করার চেষ্টা করবেন এবং সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করবেন। অনেক ডাক্তারকে দেখা যায় যে তাঁরা রোগীর কথাই ঠিকমতো শোনেন না, রোগীর কথা শোনার আগেই ওষুধ লিখে ফেলেন, এমনকি রোগী কথা বললে বিরক্তি বোধ করেন—এটি চরম অবহেলার নামান্তর। তাঁর দায়িত্বের স্পর্শকাতরতা স্মরণ করে মনোযোগসহ চিকিৎসা প্রদান হলো ইসলামের নির্দেশ। প্রয়োজনে তাঁকে অন্য কারো সহযোগিতা গ্রহণের প্রয়োজন হলে তা-ও করতে হবে। নির্দিষ্ট রোগের ব্যাপারে তাঁর অভিজ্ঞতা না থাকলে আমানতদারির সঙ্গে অন্য ডাক্তারের কাছে পাঠিয়ে  দেবেন। এ ক্ষেত্রে অনধিকারচর্চা করবেন না। কেননা রোগী ডাক্তারের কাছে রোগবিষয়ক পরামর্শের জন্য আসে। আর হাদিসে এসেছে, ‘যার কাছে পরামর্শ চাওয়া হয়, সে আমানতদার।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৮২২)

আমানতদারি মানুষের আদর্শ গুণাবলির অন্যতম। আমানতের খেয়ানত করা মারাত্মক গুনাহ ও দোষণীয় স্বভাব। রাসুলুল্লাহ (সা.) আমানতের খেয়ানত করাকে মুনাফিকির লক্ষণ বলে অভিহিত করেছেন।

 

ডাক্তারের পরিপূর্ণ সতর্কতা সত্ত্বেও রোগীর ক্ষতি হলে

যদি দক্ষ ও অভিজ্ঞ ডাক্তার পরিপূর্ণ সতর্কতার সঙ্গে চিকিৎসা করা সত্ত্বেও রোগীর কোনো ক্ষতি হয়ে যায়, তাহলে ডাক্তার দায়ী হবেন না। আর যদি ডাক্তার অযোগ্য ও অনভিজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও চিকিৎসা করেন, অথবা দক্ষ হলেও তাঁর অবহেলায় রোগীর ক্ষতি হয়, তাহলে ডাক্তার দায়ী হবেন এবং তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। (ফাতাওয়ায়ে বাজজাজিয়া : ৫/৮৯, জাদিদ ফিকহি মাসায়েল : ৫/২২)

 

বিভিন্ন কম্পানি থেকে ডাক্তারদের কমিশন

অনেক চিকিৎসক বিভিন্ন ক্লিনিক বা হাসপাতালে রোগী পাঠিয়ে সেখান থেকে নির্ধারিত পরিমাণে কমিশন নিয়ে থাকেন। অনুরূপ নির্দিষ্ট কম্পানির ওষুধ লিখে কম্পানি থেকে বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণ করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে ইসলামের পরামর্শ হলো—রোগীর দায়িত্ব হলো সার্বিক অবস্থাদি ডাক্তারকে জানানো এবং নির্ধারিত ভিজিট প্রদান করা। রোগী থেকে চিকিৎসা ফি নেওয়া ডাক্তারের জন্য বৈধ। আর ডাক্তারের দায়িত্ব হলো রোগীর জন্য প্রযোজ্য চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র প্রদান করা। রোগ শনাক্তের জন্য ডাক্তাররা রোগীকে যথাযথ মেডিক্যাল টেস্ট দিতে পারবেন। কোত্থেকে পরীক্ষাগুলো করালে ভালো হবে, তা বলে দেওয়াও ডাক্তারের পেশাগত দায়িত্ব। তিনি নির্ধারিত ভিজিটের বিনিময়ে এ কাজগুলো পূর্ণাঙ্গরূপে করবেন। তাই মেডিক্যাল টেস্টে রোগী প্রেরণকারী ডাক্তারের জন্য কমিশন গ্রহণের সুযোগ নেই। কারণ ডাক্তার আগেই প্রয়োজনীয় কাজের জন্য রোগী থেকে অর্থ গ্রহণ করেছেন। অতএব, ল্যাব বা হাসপাতাল কর্তৃক ডাক্তারদের প্রদত্ত কমিশন শরিয়তে নিষিদ্ধ, এটি উৎকাচের নামান্তর। (ফাতাওয়া রশিদিয়া, পৃষ্ঠা : ৫৫৮, ইমদাদুল ফাতাওয়া : ৩/৪১০)

এ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে বিভিন্ন কম্পানি থেকে ডাক্তাররা বিভিন্ন উপঢৌকনও পেয়ে থাকেন। এর বিধান হলো, রোগীর সঠিক অবস্থা বিবেচনায় এনে রোগীর জন্য ফলপ্রসূ ওষুধটিই প্রেসক্রিপশনে লেখা ডাক্তারের নৈতিক দায়িত্ব। এ দায়িত্ব আদায়ে কোনো রকম ত্রুটি না হওয়ার শর্তে ডাক্তারের জন্য ওষুধ কম্পানির স্বেচ্ছাপ্রদত্ত উপঢৌকন গ্রহণ করা বৈধ হবে। তবে যদি এর কারণে দায়িত্বে ত্রুটি তথা উপঢৌকন নিয়ে নিম্নমানের বা অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ইত্যাদি দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা-ও ঘুষের অন্তর্ভুক্ত হয়ে অবৈধ হবে। (আল বাহরুর রায়েক ৬/২৬২, রদ্দুল মুহতার ৫/৩৬২, ফাতাওয়া রশিদিয়া, পৃষ্ঠা ৫২৭)

কম্পানির উপঢৌকন গ্রহণ করে নিম্নমানের বা অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেওয়া আমানতের খেয়ানত।

 

মুমূর্ষু রোগীকে কৃত্রিমভাবে কত দিন বাঁচিয়ে রাখতে হবে

রোগ ভালো হওয়ার আশাবাদী হলে সাধ্যানুপাতে রোগীর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া জরুরি। তবে যদি কোনো রোগী এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে তার ব্রেন ও হার্টের কার্যক্ষমতা লোপ পাওয়ার পরও শুধু মেশিনের মাধ্যমে হার্ট চালু রেখে নামেমাত্র বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে, মেশিন খুললে মুহূর্তেই মারা যাবে, এমতাবস্থায় শ্বাস-প্রশ্বাস জারি রাখার জন্য মেশিনের ব্যবহার জরুরি নয়। বিশেষত, যখন মেশিন ছাড়া জীবিত থাকার আশঙ্কা না থাকে এবং মেশিনের ব্যয়ভার বহন করাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে, তখন এটি জরুরি নয়। (ফাতাওয়ায়ে সিরাজিয়া, পৃষ্ঠা ৭১, ফাতাওয়ায়ে উসমানি : ৪/২২৩)

 

নারীদের চিকিৎসা ও সতরের ব্যাপারে সাবধানতা

চিকিৎসা করা বা শিক্ষার প্রয়োজনে কারো সতর-লজ্জাস্থান খোলার প্রয়োজন হলে শুধু প্রয়োজন পরিমাণ খোলার অনুমতি আছে, এর বেশি অনুমতি নেই। এ ক্ষেত্রে ডাক্তারদের জন্য জরুরি হলো যথাসম্ভব তাঁর দৃষ্টিকে প্রয়োজন পরিমাণ সীমাবদ্ধ রাখবে। (বাদায়েউস সানায়ে : ৫/১২৪)

নারী রোগীর রোগের চিকিৎসা মহিলা ডাক্তারকেই করতে হবে। যথাসম্ভব পুরুষ ডাক্তারের চিকিৎসা করা বৈধ নয়। তবে রোগের বিশেষজ্ঞ নারী ডাক্তার পাওয়া না গেলে প্রয়োজনে পুরুষ ডাক্তারও চিকিৎসা করতে পারবেন। তবে সেখানে নারীর কোনো অভিভাবক তার সঙ্গে থাকবে। (আল বাহরুর রায়েক : ৮/১৯২)

লেখক : ফতোয়া গবেষক