অন্যান্য

চার নভোচারীর মহাকাশ জয় করে ফেরা

নিউজ ডেস্ক১২ এপ্রিল ২০২৬৪ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম চন্দ্রজয়ের বহু আগেই বলে গিয়েছিলেন, ‘শুনব আমি ইঙ্গিত কোন মঙ্গল হতে আসছে উড়ে’। আর মার্কিন মহাকাশ সংস্থা মূলত মঙ্গলে মানব উপনিবেশ গড়ার সুস্থির লক্ষ্য নিয়েই চাঁদে আর্টেমিস মিশন পরিচালনা করছে। তারই ধারাবাহিকতায় প্রায় অর্ধশতাব্দী পর আবারও চাঁদের কক্ষপথ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরলেন নভোচারীরা। নাসার আর্টেমিস টু মিশনের ১০ দিনের ঐতিহাসিক অভিযান সফলভাবে শেষ করে গতকাল শনিবার ওরিয়ন ক্যাপসুলে চার নভোচারী নিরাপদে ফিরে এসেছেন।

বাংলাদেশ সময় শনিবার সকাল ৬টা ৭ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগোর উপকূলের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে ওরিয়ন। প্রায় ছয় লাখ ৯৪ হাজার মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে এই দীর্ঘ যাত্রা সম্পন্ন হয়, যার মোট সময় ছিল প্রায় ৯ দিন এক ঘণ্টা ৩২ মিনিট। নাসার কর্মকর্তারা জানান, নভোচারীদের শারীরিক অবস্থা ভালো রয়েছে এবং পুরো মিশন প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সফল হয়েছে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় ক্যাপসুলের প্যারাশুট খুলে গতি কমিয়ে নিরাপদ ‘স্প্ল্যাশডাউন’ নিশ্চিত করা হয়।

এই মিশনে নেতৃত্ব দেন রিড ওয়াইজম্যান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন। উল্লেখ্য, আগের রেকর্ডটি প্রায় ৫৬ বছর আগের। ১৯৭০ সালের এপ্রিলে নাসার অ্যাপোলো-১৩ অভিযানে অংশ নেওয়া নভোচারীরা পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী জায়গায় ভ্রমণ করেছিলেন।

ওই সময় তাঁরা পৃথিবী থেকে প্রায় চার লাখ ১৭১ কিলোমিটার বা প্রায় দুই লাখ ৪৮ হাজার ৬৫৫ মাইল দূরে গিয়েছিলেন।
আর্টেমিস কর্মসূচি সাধারণ দৃষ্টিতে নাসার চাঁদে মানুষ ফেরানোর নতুন পরিকল্পনা। এর প্রথম ধাপ ‘আর্টেমিস ওয়ান’ ছিল মানববিহীন, আর ‘আর্টেমিস টু’ হলো প্রথম মানববাহী মিশন, যেখানে নভোচারীরা চাঁদের চারপাশ ঘুরে এলেও অবতরণ করেননি। পরবর্তী ধাপ ‘আর্টেমিস থ্রি’-তে মানুষের চাঁদের মাটিতে ফের পা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই মিশনের অন্যতম অর্জন ছিল নতুন দূরত্বের রেকর্ড গড়া।

নভোচারীরা পৃথিবী থেকে প্রায় দুই লাখ ৫২ হাজার মাইল দূরত্বে পৌঁছে চাঁদের ‘ফার সাইড’ প্রদক্ষিণ করেন, করেন, যা মানব ইতিহাসে অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা। মহাকাশযাত্রার সময় নভোচারীরা বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পরীক্ষা চালান, যার মধ্যে ছিল লাইফ সাপোর্ট, নেভিগেশন ও প্রপালশন সিস্টেম যাচাই। এসব পরীক্ষার ফলাফল ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই মিশন শুধু প্রযুক্তিগত নয়, মানবিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত তৈরি করেছে। নভোচারীরা চাঁদের কিছু গহ্বরের নামকরণ করেছেন এবং মহাকাশ থেকে আবেগঘন বার্তা পাঠিয়েছেন। নাসার মতে, এই সাফল্য ভবিষ্যতে চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি গড়া এবং পরে মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর প্রস্তুতিকে আরো এগিয়ে নেবে।
২ এপ্রিল চারজন নভোচারী নাসার একটি বিশাল রকেটে চড়ে চাঁদের চারপাশে এক বহুপ্রতীক্ষিত যাত্রার উদ্দেশ্যে রওনা হন, যা ৫০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম মনুষ্যবাহী চন্দ্র পরিক্রমা। আর্টেমিস টু উৎক্ষেপণের জন্য চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে শেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় মহাকাশযানে থাকা কানাডীয় নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন বলেন, ‘আমরা পুরো মানবজাতির জন্য যাচ্ছি।’

নীল পাড়যুক্ত উজ্জ্বল কমলা রঙের স্যুট পরিহিত নভোচারীরা প্রায় ১০ দিনের যাত্রায় চাঁদে অবতরণ না করে এর চারপাশে তীব্র গতিতে প্রদক্ষিণ করার আগে মহাকাশযানটির নির্ভরযোগ্যতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। তাঁদের নিরাপদে পৃথিবীতে ফেরা প্রমাণ করে, মানুষ পৃথিবীর বাইরে দূরবর্তী মহাকাশে নিরাপদে ভ্রমণ করতে সক্ষম। মিশন চলাকালীন নভোচারীরা পৃথিবী এবং মানবজাতির উদ্দেশ্যে বেশ কিছু অনুপ্রেরণামূলক বার্তা পাঠিয়েছেন। চাঁদের উল্টো পিঠে যাওয়ার সময় যখন পৃথিবীর সঙ্গে রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়, তখন পাইলট ভিক্টর গ্লোভার পৃথিবীর মানুষের উদ্দেশে বলেন, ‘পৃথিবীতে এবং পৃথিবীর চারপাশে থাকা আপনাদের সবাইকে বলছি, চাঁদ থেকে আমরা আপনাদের ভালোবাসি। আমরা যোগাযোগহীন স্থানে আপনাদের ভালোবাসা অনুভবের অপেক্ষায় থাকব।’ মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে ভিক্টর গ্লোভার বলেছিলেন, ‘এখান থেকে দেখে মনে হয় আমরা সবাই এক। আপনি কোথা থেকে এসেছেন বা দেখতে কেমন, তা কোনো বিষয় নয়; আমরা সবাই এক ও অভিন্ন মানবজাতি।’ পৃথিবী থেকে রেকর্ড চার লাখ ছয় হাজার ৭৭১ কিলোমিটার দূরত্বে পৌঁছানোর পর নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন, যেন তাদের গড়া এই রেকর্ডটি খুব বেশি দিন স্থায়ী না হয় (অর্থাৎ মানুষ যেন শিগগিরই আরো দূরে যায়)।

নাসার নভোচারী ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কোচ হেলিকপ্টারে বসে এভাবেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। ছবি : রয়টার্সচন্দ্রাভিযানে অংশ নেওয়া চার নভোচারী মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ইউএসএস জন পি মুরথায় ওঠার পর জাহাজের ডেকে হাঁটাহাঁটি করেছেন এবং হাসিমুখে ছবিও তুলেছেন। পরে তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য জাহাজে থাকা চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।