ধর্ম

কোরআনের ‘মুহকাম’ ও ‘মুতাশাবিহ’ আয়াতের পরিচয়

নিউজ ডেস্ক৩১ ডিসেম্বর ২০২৫৩ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :

পবিত্র কোরআনের আয়াতগুলো দুই ধরনের। ১. মুহকাম বা সুস্পষ্ট অর্থবোধক আয়াত। ২. মুতাশাবিহ বা অস্পষ্ট অর্ধবোধক আয়াত (যার অর্থ মানুষ বোঝে না)। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘‘তিনিই তোমার ওপর কিতাব নাজিল করেছেন, তার মধ্যে আছে ‘মুহকাম’ আয়াত।

সেগুলো কিতাবের মূল, আর অন্যগুলো ‘মুতাশাবিহ’। ফলে যাদের অন্তরে আছে সত্যবিমুখ প্রবণতা, তারা ফিতনার উদ্দেশ্যে এবং ভুল ব্যাখ্যার অনুসন্ধানে ‘মুতাশাবিহ’ আয়াতগুলোর পেছনে লেগে থাকে। অথচ আল্লাহ ছাড়া কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা জ্ঞানে পরিপক্ব, তারা বলে, আমরা এগুলোর প্রতি ঈমান আনলাম, সব আমাদের রবের পক্ষ থেকে।

আর বিবেকসম্পন্নরাই উপদেশ গ্রহণ করে।”
(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৭)

প্রশ্ন হলো, কোন আয়াতগুলো ‘মুহকাম’ আর কোন আয়াতগুলো ‘মুতাশাবিহ’? এ বিষয়ে ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘মুহকাম’ হচ্ছে ওই সব আয়াত, যা নাসেখ বা রহিতকারী, যাতে আছে হালাল-হারামের বর্ণনা, ইসলামী শরিয়তের সীমারেখা, ফরজ-ওয়াজিব, ঈমান ও আমলের বিষয়াদির বর্ণনা। পক্ষান্তরে ‘মুতাশাবিহ’ আয়াতগুলো হচ্ছে, যা মানসুখ বা রহিত, যাতে উদাহরণ এবং এজাতীয় বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে। (আত-তাফসিরুস সহিহ)

তাফসিরে আহসানুল বায়ানে এসেছে, ‘মুহকাম’ হলো সেই আয়াতগুলো, যাতে সব আদেশ-নিষেধ, বিধি-বিধান, মাসায়েল এবং ইতিহাস ও শিক্ষণীয় ঘটনা আলোচিত হয়েছে; যার অর্থ স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন এবং যেগুলো বুঝতে কোনো ধরনের অসুবিধা হয় না।

আর ‘মুতাশাবিহ’ আয়াতগুলো এর বিপরীত। যেমন আল্লাহর সত্তা, ভাগ্য সম্পর্কীয় বিষয়, জান্নাত ও জাহান্নাম, ফিরিশতা ইত্যাদির ব্যাপার। অর্থাৎ এমন বাস্তব জিনিস, যার বাস্তবতা উপলব্ধি করতে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি অপারগ, অথবা যে ব্যাপারে এমন ব্যাখ্যা করার অবকাশ আছে বা তাতে এমন অস্পষ্ট-দ্ব্যর্থতা থাকে যে তার দ্বারা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতায় ফেলা সম্ভব হয় (তাফসির আহসানুল বায়ান, সুরা আলে ইমরানের ৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা)।
কারো কারো মতে, ‘মুহকাম’ বলতে হুরুফে মুকাত্বায়াত (কর্তিত বিচ্ছিন্ন হরফ) ছাড়া কোরআনের সব আয়াতকে বোঝানো হয়েছে। আর ‘মুতাশাবিহ’ হলো ‘হুরুফে মোকাত্বয়াত’।

(তাফসির জাদ আল-মাসির, ইবনু আল-জাওজি : ১/২৫৮)
‘মুহকাম’ আয়াতকে আল্লাহ তাআলা ‘উম্মুল কিতাব’ আখ্যা দিয়েছেন। এর অর্থ এই যে এসব আয়াতই সমগ্র শিক্ষার মূল ভিত্তি। এসব আয়াতের অর্থ সব অস্পষ্টতা ও জটিলতামুক্ত।

‘মুতাশাবিহ’ আয়াতে বক্তার উদ্দেশ্য অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট হওয়ার কারণে এগুলো সম্পর্কে বিশুদ্ধ পন্থা হলো, এসব আয়াতকে প্রথম প্রকার আয়াতের আলোকে দেখা। যে আয়াতের অর্থ প্রথম প্রকার আয়াতের বিপক্ষে যায়, তাকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করে বক্তার এমন উদ্দেশ্য বুঝতে হবে, যা প্রথম প্রকার আয়াতের বিপক্ষে নয়।

(আল-তাফসির আল-ওয়াসিত, মোহাম্মদ তানতাভি : ২/২৮)

যারা সুস্থ স্বভাবসম্পন্ন, তারা অস্পষ্ট আয়াত নিয়ে তথ্যানুসন্ধান ও বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করে না, বরং তারা সংক্ষেপে বিশ্বাস করে যে এ আয়াতটিও আল্লাহর সত্য কালাম। তবে তিনি কোনো বিশেষ হেকমতের কারণে এর অর্থ সম্পর্কে আমাদের অবহিত করেননি। প্রকৃত পক্ষে এ পন্থাই বিপদমুক্ত ও সতর্কতাযুক্ত। এর বিপরীতে কিছুসংখ্যক লোক আছে, যাদের অন্তর বক্র। তারা সুস্পষ্ট আয়াত থেকে চক্ষু বন্ধ করে অস্পষ্ট আয়াত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটিতে লিপ্ত থাকে এবং তা থেকে নিজ মতলবের অনুকূলে অর্থ বের করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার প্রয়াস পায়। এরূপ লোকদের সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন এ আয়াত তিলাওয়াত করেন, তিনি বলেন, ‘যখন তোমরা তাদের দেখবে, যারা এসব (মুতাশাবিহ) আয়াতের পেছনে দৌড়াচ্ছে, তখন বুঝে নেবে যে আল্লাহ এসব লোকের কথাই পবিত্র কোরআনে উল্লেখ করেছেন। তখন তাদের থেকে সাবধান থাকবে।’

(বুখারি, হাদিস : ৪৫৪৭)