নওগাঁর আবাদপুকুরহাট

কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হলেও জরাজীর্ণ হাট-বাজারের অবস্থা

নওগাঁ প্রতিনিধি:

সরকারের রাজস্ব আদায়ের বড় একটি খাত হচ্ছে হাট-বাজার। যে হাট থেকে প্রতিবছর কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয় অথচ সেই হাটের জরাজীর্ণ অবস্থা। এমনই জীর্ণশীর্ণ অবস্থার হাট হচ্ছে নওগাঁর রাণীনগরের আবাদপুকুর হাট। জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম এই হাট থেকে কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হলেও বর্তমানে সংস্কারের অভাবে অবস্থা খুবই বেহাল।

বছরের পর বছর বরাদ্দকৃত নির্ধারিত অর্থের সঠিক ব্যবহার না করায় আবাদপুকুর হাটের এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে প্রতিনিয়ত চরম দুর্ভোগের মধ্যে কেনা-বেচা করতে হচ্ছে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের। তাই দ্রæত এই জনগুরুত্বপূর্ণ ধান ও পশুর হাটটিকে আধুনিকায়ন করতে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয়রা বলছেন, কোটি টাকা রাজস্ব পেলেও হাটটির উন্নয়নের কোনো সদিচ্ছা নেই হাট-বাজার কমিটির সভাপতির। বিগত দিনের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারাও হাটের উন্নয়নের বিষয়ে ছিলেন উদাসীন। বছরের পর বছর তারই ধারাবাহিকতা চলে আসছে বলে অভিযোগ হাট সংশ্লিষ্টদের।

সূত্রে জানা গেছে যে, জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম ধান ও পশুর হাট হচ্ছে উপজেলার আবাদপুকুর হাট। মাছ-মাংস ও সবজি বিক্রেতাদের জন্য কয়েকটি শেড নির্মাণ করে দেওয়া হলেও বর্তমানে এই হাটের মাছপট্টির শেডগুলোর টিন মরিচায় নষ্ট হয়ে গেছে। বছরের পর বছর মেরামত না করায় বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। কোনটির টিন ঝড়ে উড়ে গেছে। হাট-বাজারে ঢুকলেই ক্রেতা-বিক্রেতার ভোগান্তির শেষ থাকে না। হাটের শেডগুলোর অবস্থা জরাজীর্ণ, কোথাও টিনের চালা ভেঙে পড়ে আছে। আবার কোথাও টিনের চালা নেই, ফাঁকা পড়ে আছে। তাই কোনো কোনো ব্যবসায়ী তাম্বু টাঙিয়ে ব্যবসা করছে।

সপ্তাহের রবিবার ও বুধবার হাটের দিনে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লাখ লাখ ক্রেতা-বিক্রেতাদের সমাগম ঘঠে এই হাটে। আর সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে বসে বাজার। কিন্তু বর্তমানে হাটের শেডগুলোর জরাজীর্ন অবস্থার কারণে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিতে ভিজে আর শুষ্ক মৌসুমে রোদে পুড়ে বেচা-কেনা করতে হয় হাটে আসা মানুষদের। এছাড়া হাটে একটি ব্যবহারযোগ্য গণশৌচাগার না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় সবাইকে। হাটের মধ্যে চলাচলের জন্য রাস্তা ও পানি নিষ্কাশনের জন্য খারাপ ড্রেনেজ ব্যবস্থা দুর্ভোগের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। অথচ গত ২০২২সালে এই হাটটির ইজারা মূল্য ছিলো ৮২লাখ টাকা, যা ভ্যাট ও অন্যান্য খাত মিলে সরকার এই হাট থেকে সরকার রাজস্ব হিসেবে কোটি টাকা আয় করে আসছে। সরকারি নিয়ম অনুসারে প্রতিবছর সরকারি ইজারা মূল্যের শতকরা ১৫শতাংশ অর্থ হাটের সংস্কার, মেরামত ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজে ব্যয়ের নিয়ম থাকলেও উপজেলা প্রশাসন তা মানছে না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তাই হাটের সার্বিক অবকাঠামোগত কাজে বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিক ভাবে লাগানোর দাবী হাটমুখি মানুষ ও ব্যবসায়ীদের।

অপরদিকে হাট ইজারার অর্থ থেকে বছরের পর বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ বরাদ্দকৃত অর্থ জমছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিজম্ব এ্যাকাউন্টে। সেই এ্যাকাউন্টে জমে থাকা হাট ও বাজার সংস্কারের কোটি কোটি টাকার লভাংশ কোথায় যাচ্ছে, এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ লভাংশ প্রাপ্তির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতেই হাটগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় না বলে মনে করছেন অনেকেই।

এদিকে হাটের দিন সরেজমিনে গিয়ে ছবি তুলতে লাগলেই মাংস ব্যবসায়ী কসাই রশিদুল শেখ বলতে লাগলেন, ভাই শেডটা করার ব্যবস্থা করে দেন। আপনারা চেষ্টা করলেই হবে ভাই। রশিদুল বলেন, এই কসাইয়ের ব্যবসা তার পারিবারিক ভাবে। আমার দাদা মোশাররফ কসাই ও বাবা সোলেমান কসাই ব্যবসা করেছেন। আমি আমার বাবার সাথে ভাগা দিয়ে মাংস বিক্রি করেছি। এখানে আমরা সাতজন কসাই ব্যবসা করি। তবে সামনে বর্ষাকাল, তাই দু:শ্চিন্তা এখন থেকেই। কারণ বৃষ্টি শুরু হলে মাংস ভিজে যাবে। অথচ আমরা ঠিকমতো হাটের টোল দিয়ে থাকি। তার মতো হাটে আসা কবুতর ব্যবসায়ী ও অন্যান ব্যবসায়ীরাও একইভাবে বললেন।

হাটের ইজারাদার হেলাল উদ্দিন হেলু মেম্বার বলেন, বর্তমানে হাটের প্রতিটি অংশের শেডের চরম বেহাল দশা। অনেকে আবার নিজেদের অর্থদিয়েই ভেঙ্গে যাওয়া শেডগুলো মেরামত করার চেস্টা করছেন। উপজেলা প্রশাসনের নিকট বিগত কয়েক বছরের হাটের ইজারা থেকে বরাদ্দকৃত যে পরিমাণ অর্থ জমে আছে সেই অর্থদিয়েও যদি হাটের আধুনিকায়নের কাজ করা হয় সেটাই আমাদের জন্য অনেক। উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা ইচ্ছে করলেই হাটের এমন বেহাল দশা থেকে আমাদেরকে মুক্ত করতে পারেন। তাই এমন জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতি দ্রæত সুদৃষ্টি দেবার অনুরোধ করছি।

উপজেলা প্রকৌশলী ইসমাইল হোসেন মুঠোফোনে জানান, গতবছর তৎকালীন ইউএনও শাহাদাত হুসেইন স্যারের নির্দেশক্রমে উপজেলার সকল হাট ও বাজারের আধুনিকায়নের কাজের জরিপ সম্পন্ন করে জমা দেয়া হয়েছে। এরপর ওনি বদলী হওয়ার কারণে পরবর্তিতে আর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এই বাবদ অর্থ ইউএনও স্যারের নিজস্ব এ্যাকাউন্টে জমা থাকে এবং সেই অর্থ খরচের বিষয়ে একমাত্র তিনিই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। তাই এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যে কোনো সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আমাকে জানালেই দরপত্রের মাধ্যমে কাজ শুরু করা যেতে পারে।

এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে তাবাসসুম বলেন, আমি গতবছরের অক্টোবরে এই উপজেলায় যোগদান করেছি। তাই এই বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে দ্রæতই পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।