সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
পাঁচ বছরের ছোট্ট টুসিকে নিয়ে প্রায়ই বিপদে পড়তে হয় ওর মা-বাবার। শপিং মলে গেলে কোনো কিছু কেনা তার চাই-ই চাই। আর সেটা না কিনে দিলে সবার সামনেই চিৎকার, কান্নাকাটি—এক হুলুস্থুল অবস্থা। চাকরির সুবাদে মাঝেমধ্যেই দেশের বাইরে থাকতে হয় তার মা আইভিকে। সন্তানকে সময় দিতে না পারার একটা অপরাধবোধ থেকে তার সব জেদ আর অন্যায় আবদারগুলোও মেনে নেন মুখ বুজে।
অন্যদিকে, আট বছরের আরাফেরও বড্ড জেদ। কোনো কিছু একবার ‘না’ বললে সেটা আর ‘হ্যাঁ’ বলানো যায় না। তার কর্মজীবী মা আফরোজা সারা দিন কাজে ব্যস্ত থাকেন। ছেলের এমন একরোখা স্বভাবের জন্য অনেক শাসনও করেন তিনি। কিন্তু দিন দিন যেন বেড়েই চলেছে। এ এমন স্বভাবের জন্য বাসায় অন্য কোনো বাচ্চা বেড়াতে এলে বা বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলার সময় ঝগড়াঝাঁটি বা মারামারি লেগে যাচ্ছে। একই কারণে স্কুল থেকেও অভিযোগ আসছে।

এমন জেদ ও অবাধ্যতা অনেক শিশুর মধ্যেই লক্ষ করা যায়। কর্মজীবী অনেক মা-ই এর জন্য নিজেদের পেশাকে দায়ী বলে মনে করেন। এ অপরাধবোধের জন্য অনেকে সন্তানের অন্যায় আবদার বা যেকোনো কিছু নিয়ে জেদ করা—এসব মেনে নেন। কেউবা আবার নিজের পেশাকে জলাঞ্জলি দিতেও পিছপা হন না।
মায়ের পেশা কি দায়ী?
সন্তানের এমন আচরণের জন্য কখনোই মায়ের পেশা দায়ী হতে পারে না বলে মনে করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ইভা রহমান। বিভিন্ন কাজে মাঝেমধ্যেই তাঁকে দেশের বাইরে যেতে হয়। তাঁর পঞ্চম শ্রেণিপড়ুয়া মেয়ে তিথি মোটেও অকারণ জেদি নয়। বরং বয়সের তুলনায় একটু বেশিই দায়িত্ববান। সে নিজের সব কাজ নিজেই গুছিয়ে করে। কাজে থাকলেও ফোন করে তিথির খবর নেন। সে স্কুল থেকে এসে খেয়েছে কি না, গানের টিচার কখন আসবেন ইত্যাদি। বাসায় এসে সারা দিনের স্কুলের গল্প শোনেন আর দেশের বাইরে গেলে বিজ্ঞান প্রোজেক্টের জন্য জিনিসপত্র আনা, প্রতিদিন স্কাইপিতে কথা বলা হয়। তিনি বলেন, মা-মেয়ের সম্পর্কে পেশা কখনোই বাধা হয়নি।
কেন এ জেদ?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাহসিনা আক্তারের মতে, দুটি কারণে এমন হতে পারে—একটি জিনগত ও অন্যটি পরিবেশগত কারণ। ২০ শতাংশ বাচ্চা জিনগত কারণে ও বাকি ৮০ শতাংশই পরিবেশগত কারণে জেদি হয়।
মনোবিজ্ঞানের একটা নিয়ম হলো, সন্তানের যেসব আচরণে মা-বাবা মনোযোগ দেবেন, সেসব আচরণ সে বারবার করবে।
অনেক সময় কর্মজীবী মায়েরা শিশুদের মনোযোগের চাহিদা সঠিকভাবে পূরণ করেন না। মায়ের পেশা হয়ে যায় তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী। এর ফলে বাচ্চাদের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। আর তা থেকেই জেদের উৎপত্তি। এদিকে মা হয়তো একটা দামি জিনিস কিনে দিয়ে সেই ক্ষোভ সংবরণ করতে চান বা অন্যায় আবদার মেনে নেন। এতে জেদকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়।
অনেক মা আবার অতিরিক্ত শাসন করেন, এতে ক্ষোভ আরও বেড়ে গিয়ে জেদ ক্ষতির আকার ধারণ করে।
কী করণীয়?
কর্মজীবী মায়ের প্রথমেই নিজের মধ্যকার অপরাধবোধ থেকে মুক্ত হতে হবে। যেন সন্তান এ অপরাধবোধের সুযোগ নিয়ে অন্যায় আবদার বা জেদ করতে না পারে।
মা যেমন সকাল থেকে কাজে ব্যস্ত থাকেন, তেমনি সন্তানকেও স্কুল, নাচ, গান বা ড্রয়িং শেখা, খেলাধুলায় ব্যস্ত রাখতে হবে। এতে মা-ও তাঁর মতোই ব্যস্ত, এমন মনোভাব গড়ে ওঠে।
অতিরিক্ত আদর বা অতিরিক্ত শাসন করা থেকে বিরত থাকুন।
শিশুদের সঙ্গে তাদের মতো করেই কিছুক্ষণ খেলুন কিংবা মজার মজার গল্প বলুন। তাদের প্রতি শতভাগ মনোযোগ নিশ্চিত করুন। তারা যেন মায়ের পেশাকে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না নেয়।
সারা সপ্তাহে ছুটির দিনটি পরিবারের জন্য রাখুন।
জেদকে কখনোই প্রশ্রয় দেবেন না। জেদ করে কোনো কিছু চাইলে সেই দাবি পূরণ করবেন না। স্বাভাবিকভাবে চাইলে তখন দেবেন।
সূত্র : প্রথম অলো









