অর্থ ও বাণিজ্য

এনন টেক্সের জালিয়াতির ঋণ পুনঃতফসিল: জনতার এমডির ব্যাখ্যা চেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

নিউজ ডেস্ক১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

জালিয়াতির মাধ্যমে নেয়া এনন টেক্স গ্রুপের ঋণ তথ্য গোপন করে পুনঃতফসিল করায় জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুছ ছালাম আজাদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘অফসাইট সুপারভিশন’ থেকে পাঠানো চিঠিতে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। সে হিসেবে চলতি ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে হবে। এ বিষয়ে যোগাযোগ করেও জনতা ব্যাংকের এমডির কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জামাল উদ্দিন রোববার মুঠোফোনে যুগান্তরকে বলেন, এনন টেক্স টাকা জমা (পুনঃতফসিলের ডাউন পেমেন্ট) দিয়েছিল কিনা, তা দেখতে হবে। বিস্তারিত দেখার পর মন্তব্য করা যাবে। তবে এ ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম সমালোচিত ঘটনা এনন টেক্সের ঋণ জালিয়াতিতে জনতা ব্যাংকের এমডির সম্পৃক্ততার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউ’র (অর্থ পাচার সংক্রান্ত গোয়েন্দা ইউনিট) সাম্প্রতিক তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে। এরপর এমডির অপসারণের সুপারিশ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণের নামে জালিয়াতির মাধ্যমে জনতা ব্যাংক থেকে ৫ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা নিয়েছে এনন টেক্সের মালিক ইউনূছ বাদল। এর বড় অংশই বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি যুগান্তরে সংবাদ প্রকাশের পরই নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, আর্থিক খাতে বড় সমস্যা সুশাসনের অভাব। আর সুশাসনের স্বার্থে এ ধরনের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জরুরি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সরকারের সবগুলো সংস্থাকে কাজ করতে হবে। না হলে এ ধরনের অপরাধ বাড়তে থাকবে।

জনতা ব্যাংকের এমডির কাছে পাঠানো বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠিতে বলা হয়, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৫৯১তম সভায় এনন টেক্স গ্রুপের ৭টি প্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ৭৪৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকার ঋণ ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের অনুমোদন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হল- গ্যালাক্সি সোয়েটারস অ্যান্ড ইয়ার্ন ডায়িং, জ্যাকার্ড নিট টেক্স, সুপ্রভ কম্পোজিট, এম নূর সোয়েটার, সিমরান কম্পোজিট, সুপ্রভ স্পিনিং এবং শব মেহের স্পিনিং। ওই মিটিংয়ে অন্য একটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ড্রাগন সোয়েটারের ২২৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকার ঋণ পুনঃতফসিলের অনুমোদন করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত রিপোর্টে এনন টেক্স গ্রুপের ২২টি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে জাল-জালিয়াতি ও মানি লন্ডারিংয়ে সম্পৃক্ততার তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। অন্যদিকে জনতা ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ ও অডিট অ্যান্ড ডিপার্টমেন্টও এনন টেক্সের ৪টি প্রতিষ্ঠান গ্যালাক্সি সোয়েটার, জ্যাকার্ড নিট টেক্স, সুপ্রভ কম্পোজিট ও সিমরান কম্পোজিটের ঋণের ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়ম পেয়েছে। এ সংক্রান্ত রিপোর্ট ২০১৮ সালে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৫২২তম সভায় উপস্থাপন করা হয়। এতে প্রমাণিত হয়, জাল-জালিয়াতির কারণে এনন টেক্সের ঋণ কুঋণে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চিঠিতে আরও বলা হয়, এ ধরনের কাজ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনের লঙ্ঘন। এছাড়া এটি ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত জনতা ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সমঝোতা স্মারকেরও লঙ্ঘন। এ চিঠি পাওয়ার ৭ কার্যদিবসের মধ্যে এর ব্যাখ্যা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হল।

এর আগে এনন টেক্সের ঋণ জালিয়াতির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, এনন টেক্সের ২২টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে জনতা ব্যাংক থেকে ৫ হাজার ৭৬৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। ২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জনতা ভবন কর্পোরেট শাখায় এ ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে নিজের স্ত্রী ও কোম্পানির নামে তিনটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে এলসির অর্থ হাতিয়ে নেন ইউনূছ বাদল। এ প্রক্রিয়ায় তিনি ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৪শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এর মধ্যে বৈদেশিক যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ১ কোটি ৪৮ লাখ ডলারের ঋণপত্র খোলার অনুমোদন দেন তৎকালীন শাখা ম্যানেজার আবদুছ ছালাম আজাদ (বর্তমান এমডি)। এক্ষেত্রে মেশিনারিজ সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির তিনটি প্রতিষ্ঠান- ওয়াইসুক ওভারসিজ, ইউনিভার্সেল টেকনোলজিক্যাল লিমিটেড ও ইউনি এশিয়া অ্যাসোসিয়েটস। কিন্তু প্রাইম ব্যাংক ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউনূছ বাদলের অ্যাকাউন্ট) থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ইউনূস বাদল ও তার পরিবার প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক। প্রাইম ব্যাংক ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব রয়েছে। অর্থাৎ ইউনূছ বাদল নিজেই পণ্যের আমদানিকারক আবার রফতানিকারকও। অর্থাৎ এই প্রক্রিয়ায় বিদেশে অর্থ পাচার করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ও জার্মানির সঙ্গে কোম্পানিগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। পণ্য বাংলাদেশে আসার কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে এসব কাজ বড় ধরনের অপরাধ। ঋণ বিতরণের কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ঋণ শৃঙ্খলাপরিপন্থী তথা আমানতকারীদের স্বার্থবিরোধী কাজে জড়িত ছিলেন আবদুছ ছালাম আজাদ। এ কারণে এই ঘটনায় তাকে দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারা অনুযায়ী জনতা ব্যাংকের এমডি আবদুছ ছালামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। ওই ধারা অনুসারে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডিকে অপসারণের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এনন টেক্স নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২২টি প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণের জামানত ৫৬ একর জমি। ব্যাংকে এর নির্ধারিত মূল্য ৬৭৭ কোটি টাকা। এছাড়া স্থাপিত যন্ত্রপাতিসহ মোট সহায়ক জামানতের মূল্য দেখানো হয়েছে ৪ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। কিন্তু জমির স্পষ্ট সীমানা না থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত কমিটি এর দাম জানতে পারেনি। ভৌত অবকাঠামোতে ওভারল্যাপিং থাকায় জামানত বিক্রি করে টাকা আদায় সম্ভব নয়। পরিদর্শক দল মনে করছে, এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যবসাবহির্ভূত লেনদেন হয়েছে।