ধর্ম

অন্তরে আল্লাহর অস্তিত্বের উপলব্ধি

নিউজ ডেস্ক২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০৬ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

মহান আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে মানুষের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব আল্লাহর পরিচয় লাভ করা এবং তাঁর আনুগত্য ও ইবাদতে মগ্ন হওয়া। আল্লাহর পরিচয় লাভের অন্যতম উপায় পবিত্র কোরআনে বর্ণিত তাঁর সুমহান নাম ও গুণাবলির মর্ম উপলব্ধি করা এবং ব্যাখ্যা জানা। তাঁর শক্তি ও সামর্থ্য, জ্ঞান ও পরিধি, দয়া ও অনুগ্রহ, দান ও উদারতা, গ্রহণ ও সাড়া, নৈকট্য ও সান্নিধ্যের বিশ্লেষণে জ্ঞানার্জন করা। যার ফল হিসেবে মানুষের দুর্বলতা ও অক্ষমতা, নিঃস্বতা ও অসহায়ত্বে প্রকাশ পায়। তার পরও মানুষের উচিত উচ্চাশা পোষণ করা এবং সাহস ধরে রাখা—যা আর কোনো সৃষ্টিকে দেওয়া হয়নি, পার্থিব ও আত্মিক উভয় ক্ষেত্রে তার অন্তহীন ক্ষুধা ও অনিবারণীয় তৃষ্ণার কথা মনে রাখা এবং তার প্রয়োজন, প্রত্যাশা, আশা ও আকাঙ্ক্ষার অফুরন্ত তালিকায় চোখ রাখা। গভীরভাবে চিন্তা করলে সে দেখবে অসংখ্য ও অগণন এই প্রত্যাশার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো শরিক নেই। এরপর সে যদি তার ভেতরের আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা, আকুতি, সন্তুষ্টি ও আনুগত্যের আকাঙ্ক্ষা বিশ্লেষণ করে, সেখানেও সে নিজেকে অংশীদারহীন দেখতে পাবে।

একত্ববাদের এই মর্ম ও পরম সত্য উপলব্ধি করার পর আল্লাহর অস্তিত্বের অনুভবের জন্য তাকে সার্বক্ষণিক ইবাদত-বন্দেগি, রুকু-সিজদা ও দোয়া-মোনাজাতে মগ্ন থাকার প্রয়োজন হবে না। বরং সে এমনিই উপলব্ধি করতে পারবে সর্বদাতা ও রাজাধিরাজ মহান আল্লাহর অস্তিত্ব অনিবার্য। যিনি তার প্রার্থিত ও অপ্রার্থিত সব প্রয়োজন পূরণ করছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি তোমাদের দিয়েছেন তোমরা তাঁর কাছে যা চেয়েছ তা থেকে। তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করলে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না। মানুষ অবশ্যই অতিমাত্রায় অবিচারকারী ও অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৩৪)

বিশ্বজগতের শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা আল্লাহর অস্তিত্বের জ্ঞান লাভে সহায়ক। সে যদি চিন্তা করে তবে দেখবে, সৃষ্টির সময় থেকে সূর্য আলো, উত্তাপ ও জীবন-জীবিকার উৎস হিসেবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে এবং কোনো প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি ও আপত্তি-অভিযোগ ছাড়াই নিজের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। চাঁদ তার ঔজ্জ্বল্য ও ক্লান্তিহীন পথচলার মাধ্যমে মাস ও বছরের হিসাব নির্ণয় করে দিচ্ছে। পাহাড় হাজার বছর ধরে আপন দায়িত্বে অবিচল। বৃক্ষরাজি আপন জায়গায় ইবাদতে মগ্ন—ছায়া, ফুল ও ফল দিয়ে মানুষের সেবা করছে। বাতাস জীবনের বার্তা নিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটে যাচ্ছে। মেঘমালা এক স্থান থেকে পানি বহন করে অন্য স্থানে পৌঁছে দিচ্ছে এবং মাটিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করছে; তার মাধ্যমে নদী প্রবাহিত হচ্ছে, মানুষের পিপাসা দূর হচ্ছে, ফসল উত্পাদিত হচ্ছে আর মাটি তার ভাণ্ডার উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। চতুষ্পদ জন্তুগুলো এমনভাবে চলছে যেন সে রুকুতে আছে। তারা মানুষকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দিচ্ছে, বোঝা বহন করছে আবার তাদের মাধ্যমে মানুষ পোশাক ও খাবার সংগ্রহ করছে। কিছু প্রাণী পেটের ওপর ভর করে চলে। তাদের দ্বারাও মানুষ নানা রকম উপকার লাভ করে। এসব সৃষ্টির না আছে হৃদয়, না আছে বিবেকবুদ্ধি। তারা সর্বক্ষণ আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতে মশগুল। তাদের পরিমণ্ডলে কোনো অবাধ্যতা নেই, কোনো বিদ্রোহ নেই, কোনো ছন্দঃপতন নেই, কোনো বিরতি নেই; তারা সব সময়, সর্বাবস্থায় সিজদানুগত। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি দেখো না, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা ও জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ১৮)

আল্লাহ আরো বলেন, ‘আল্লাহকেই সিজদা করে যা কিছু আছে আকাশমণ্ডলীতে, পৃথিবীতে যত জীবজন্তু আছে সেসব এবং ফেরেশতারাও, তারা অহংকার করে না। তারা ভয় করে তাদের প্রতিপালককে তাদের ওপর এবং তাদের যে আদেশ করা হয় তা তারা মান্য করে।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৪৯-৫০)

সৃষ্টিজগতের অবিনশ্বর প্রতিপালক আল্লাহ নিজের পরিচয় ও বান্দার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ তুলে ধরে বলেন, ‘আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। যিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তা দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উত্পাদন করেন। যিনি নৌযানকে তোমাদের অধীন করেছেন—যেন তাঁর নির্দেশমতে তা সমুদ্রে বিচরণ করে এবং যিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন নদীগুলো। তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন সূর্য ও চন্দ্র। যারা অবিরাম একই নিয়মের অনুবর্তী এবং তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন রাত ও দিন।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৩২-৩৩)

এই বিশাল সৃষ্টিজগৎ আকার-আকৃতি ও প্রকার-প্রকরণে ভিন্ন হলেও আপন ভঙ্গিতে তারা আল্লাহর ইবাদত করে যাচ্ছে। তারা এমনভাবে আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে ও নামাজ আদায় করে, যা তাদের প্রকৃতি ও তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এটি শুধু সে-ই অবলোকন করতে পারে আল্লাহ যার অন্তরদৃষ্টি খুলে দিয়েছেন এবং পার্থিবজগতের আবরণ যার চোখ থেকে তুলে দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সাত আকাশ, পৃথিবী এবং তাদের অন্তর্বর্তী সব কিছু তাঁরই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং এমন কিছু নেই যা তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না। কিন্তু তাদের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা তোমরা অনুধাবন করতে পারো না। নিশ্চয়ই তিনি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৪৪)

আল্লাহ প্রদত্ত মানুষের অনন্য বৈশিষ্ট্য, মর্যাদা ও সম্মান, বিবেক ও অন্তঃকরণের দাবি ছিল তারা অন্য সৃষ্টির তুলনায় আল্লাহর ইবাদতে বেশি মগ্ন থাকবে, সব সময় সে আল্লাহর স্মরণ, রুকু, সিজদা ও তাসবিহ পাঠে ডুবে থাকবে। কোনো সময় সে তার জবান আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত হবে না। তাদের প্রতি মহান আল্লাহর যেসব বিশেষ অনুগ্রহ রয়েছে, তাদের যেসব নিয়ামতের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে এবং প্রতি মুহূর্তে তাদের ওপর যে পরিমাণ অনুগ্রহ বর্ষিত হচ্ছে, তার দাবি ছিল সে এক মুহূর্তের জন্যও আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদত থেকে উদাসীন না হওয়া। তাদের অবস্থা হবে সেসব ফেরেশতার মতো যাদের ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছে, ‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা তাঁরই; তাঁর সান্নিধ্যে যারা আছে তারা অহংকার বশে তাঁর ইবাদত থেকে বিমুখ হয় না এবং ক্লান্তিও বোধ করে না। তারা দিন-রাত তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে, তারা শৈথিল্য করে না।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ১৯-২০)

মানুষ যেহেতু পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের গুরুভার বহন করবে এবং অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই দায়িত্ব পালন করবে, তাই তাকে ইচ্ছাশক্তিও দেওয়া হয়েছে—দায়িত্ব পালনে যার প্রয়োজনও ছিল। একই কারণে তার ভেতর আবেগ, ভালোবাসা, আনন্দ ও বেদনার অনুভূতি, জ্ঞানের অন্বেষা ও কৌতূহল দেওয়া হয়েছে। যেন সে পৃথিবীতে তার সেবায় নিয়োজিত সৃষ্টিকুলকে যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারে। মানবসভ্যতার জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা মূলত তার বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের গুরুদায়িত্ব পালন করবে বলেই তাকে সার্বক্ষণিক ইবাদত থেকে রেহাই দেওয়া হয়েছে। মানুষ যখন তার ব্যক্তিজীবনে, পরিবার ও সমাজে, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের কথা ভুলে যাবে এবং তা পালনে ব্যর্থ হবে, তখনই পৃথিবীতে বিপর্যয় নেমে আসবে; যার আশঙ্কা করে ফেরেশতারা বলেছিল, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে?’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৩০)

মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও তার ওপর দায়িত্ব উভয় বিষয় বিবেচনা করে এমন ইবাদত ও ইবাদত রীতির প্রয়োজন ছিল, যা তার প্রকৃতি, তার দায়িত্ব এবং সৃষ্টিজগতে তার সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়। ইসলামের পঞ্চস্তম্ভে তার প্রতিফলন দেখা যায়। আর নামাজ হলো সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তেমন একটি ইবাদত। যাকে আল্লাহ পূর্ণতা দান করেছেন এবং এই নামাজই আল্লাহর স্মরণ ও উপলব্ধি লাভের সর্বোত্তম পন্থা। হাদিসের ভাষায় যা মুমিন বান্দার জন্য মিরাজস্বরূপ (আল্লাহর সাক্ষাৎ)।

 

পাক্ষিক তামিরে হায়াত থেকে

আতাউর রহমান খসরুর ভাষান্তর