আফগানিস্তানে খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও অবকাঠামো নির্মাণে চীনের বিনিয়োগ বাড়ছে। এতে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে তালেবান সরকার।
তবে এসব প্রকল্প ঘিরে স্থানীয় মানুষের জমি, পানির অধিকার ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের আয় থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা যথাযথ সুবিধা পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফেরার পর পশ্চিমা দেশগুলো দেশটিতে তাদের কূটনৈতিক উপস্থিতি কমিয়ে আনে। তবে চীন কাবুলে দূতাবাস খোলা রাখে এবং নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কমে যাওয়ার পর আফগানিস্তানে প্রভাব বিস্তারের সুযোগও দেখে বেইজিং।
তালেবান সরকারের জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর শর্তের মুখে পড়লেও চীন তুলনামূলকভাবে কম শর্তে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে। বর্তমানে চীন আফগানিস্তানের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার।
খনিজ সম্পদে চীনের আগ্রহ
আফগানিস্তানের তেল ও তামার খনিতে চীনা কোম্পানিগুলোর আগ্রহ দীর্ঘদিনের। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তালেবান সরকার চীনের জিনজিয়াং সেন্ট্রাল এশিয়া পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড গ্যাস কম্পানির সঙ্গে আমু দরিয়া অববাহিকায় তেল উত্তোলনের জন্য ২৫ বছরের চুক্তি করে। কোম্পানিটি সেখানে ৫৪ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়।
এ ছাড়া লোগার প্রদেশের মেস আয়নাক তামার খনিতেও চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। ২০০৮ সালে আগের আফগান সরকারের কাছ থেকে ৩০ বছরের জন্য খনিটির ইজারা পেয়েছিল একটি চীনা কনসোর্টিয়াম।
নিরাপত্তা, শ্রম ও পরিবেশগত বিভিন্ন সমস্যায় দীর্ঘদিন প্রকল্পটির কাজ আটকে ছিল। ২০২৪ সালে তালেবান সরকার প্রকল্পটি আবার চালুর উদ্যোগ নেয়।
তবে খনিজ সম্পদ উত্তোলন ঘিরে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কম্পানিগুলোর বিরোধও বাড়ছে। ২০২৩ সালের আগস্টে উত্তর আফগানিস্তানের তাখার প্রদেশের চাহ আব জেলায় সামতি সোনার খনির ইজারা দেওয়া হয় একটি চীন-আফগানিস্তান কম্পানিকে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সেখানে খনন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ চলার খবর প্রকাশিত হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, খনির কারণে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পানির উৎসে প্রবেশাধিকার কমছে এবং প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। বদাখশান প্রদেশেও চীনা অংশীদারিতে সোনা উত্তোলন নিয়ে জমি ও পানির অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবাদ দমনের অভিযোগ
খনি প্রকল্প নিয়ে অসন্তোষ একপর্যায়ে সংঘর্ষেও গড়িয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তালেবান কর্তৃপক্ষ জানায়, চাহ আব জেলায় সংঘর্ষে তিনজন স্থানীয় বাসিন্দা ও একটি খনি কম্পানির এক কর্মী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো পাঁচজন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, খনির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে এবং দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে কম্পানিটির নাম বা মালিকদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতেও চীনা কম্পানির সঙ্গে খনি চুক্তির কারণে সম্পত্তির ক্ষতি এবং প্রকল্পের আয় থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবাদ করেছিলেন। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েও তারা প্রতিকার পাননি।
খনি এলাকার বাসিন্দারা রাস্তা, পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নও দাবি করেছেন। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের প্রতিবাদ তালেবান কর্তৃপক্ষ দমন করেছে।
তালেবানের সঙ্গে চীনের রাজনৈতিক সম্পর্ক
চীন এখনো তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে আফগানিস্তানের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়িয়েছে। ২০২৩ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর চীন প্রথম নতুন রাষ্ট্রদূত পাঠায়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তালেবান সরকারের রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র গ্রহণ করেন।
২০২৬ সালের এপ্রিলে চীনের উরুমকিতে তালেবান ও পাকিস্তানের মধ্যে শান্তি আলোচনার আয়োজন করে বেইজিং। এতে আঞ্চলিক কূটনীতিতে চীনের ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়।
তবে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তালেবানের ওপর চাপ তৈরির ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা সীমিত। নারী অধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তালেবান ব্যর্থ হলেও বেইজিং সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এতে আফগানিস্তানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে আন্তর্জাতিক চাপ দুর্বল হতে পারে বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
চীনের কৌশলগত স্বার্থ
আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর পেছনে চীনের নিরাপত্তাগত স্বার্থও রয়েছে। বিশেষ করে জিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা ঠেকাতে তালেবানের সহযোগিতা চায় বেইজিং। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্টের (ইটিআইএম) সদস্যরা আফগানিস্তানে চলাচল করছেন এবং তাদের একটি অংশ বদাখশান প্রদেশে অবস্থান করছেন।
এ ছাড়া আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ফিরে আসার সম্ভাবনাও চীনের উদ্বেগের কারণ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে চীন, রাশিয়া, ইরান ও পাকিস্তান আফগানিস্তান এবং এর আশপাশে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে।
চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর আফগানিস্তান পর্যন্ত সম্প্রসারণের বিষয়েও ২০২৫ সালের মে মাসে তিন দেশ সম্মত হয়। তবে সম্প্রসারণের কাজ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৬ সালের অক্টোবরে তালেবান সরকার চীনের সীমান্তের দিকে ওয়াখান করিডরে ১২১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি নুড়িপাথরের সড়ক উদ্বোধন করে। সেখানে এখনো বাণিজ্যিকভাবে সীমান্ত পারাপারের ব্যবস্থা চালু হয়নি।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আফগানিস্তানের খনিজ সম্পদ চীনে নেওয়া সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও বাজারের জন্য চীনের ওপর আফগানিস্তানের নির্ভরতাও বাড়তে পারে।
প্রতিবেদনের লেখক নাতিক মালিকজাদার মতে, চীনের বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সহায়তা তালেবান সরকারের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত করতে পারে। অথচ যেসব এলাকার সম্পদ উত্তোলন করা হচ্ছে, সেখানকার মানুষের প্রকল্পের শর্ত নির্ধারণে অংশ নেওয়ার সুযোগ সীমিত। ফলে আফগানিস্তানের সম্পদ থেকে আয় বাড়লেও স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রায় তার সুফল পৌঁছাচ্ছে না।
ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট অবলম্বনে লিখেছেন সাংবাদিক নাতিক মালিকজাদা









