আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন : পরিসংখ্যানের ইঙ্গিত কী

নিউজ ডেস্ক৪ নভেম্বর ২০২৬৫ মিনিট পড়া

সিল্কসিটিনিউ ডেস্ক:

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি এবং সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট দিয়েছেন মার্কিন ভোটাররা। নির্বাচনের আগের রাত পর্যন্ত কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ছিল রিপাবলিকানদের হাতে।

তবে দুই কক্ষেই তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল খুবই কম। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি দুই বছর পরপর মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনের ফল আগামী কয়েক বছর দেশটির রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের হাতে নির্বাহী বিভাগের অনেক ক্ষমতা রয়েছে।

তবে সরকারের বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে কংগ্রেসের অনুমোদন লাগে। তাই ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের এক বা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশ চালানো কঠিন হবে।
নির্বাচনের সর্বশেষ ফল

যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে স্থানীয় সময় রাত ১টার মধ্যে ভোটকেন্দ্র বন্ধ হয়েছে। ডয়চে ভেলে জানায়, সিনেটে প্রথম আসনটি রিপাবলিকানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রয় কুপার।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসন জিততে হবে। প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনেই নির্বাচন হচ্ছে। এই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে কোনো দলকে অন্তত ২১৮টি আসন জিততে হবে। এখন পর্যন্ত নর্থ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকানদের কাছ থেকে একটি আসন জিতেছে ডেমোক্র্যাটরা।

ভোটারদের মতামত ও ভোটের ধরন

ভোটারদের পরিচয় ও তাদের মতামত নিয়ে প্রকাশিত তথ্য তৈরি করা হয়েছে ৭৫ হাজারের বেশি ভোটারের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে।

জরিপটি চালিয়েছে জরিপ ও বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসএসআরএস। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের হয়ে এই জরিপ করা হয়। আগাম ও ডাকযোগে ভোট দেওয়া ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে ভোট দিয়ে বের হওয়ার সময় ভোটারদের ওপর জরিপ চালানো হয়েছে।
রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট ভোটারদের শতাংশের যোগফল ১০০ না হলে বাকি অংশ তৃতীয় কোনো দলের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন।
ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি

এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অর্থনীতি ছিল অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম অনেক বেড়েছে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়ছে। প্রায় অর্ধেক মার্কিন ভোটার মনে করেন, দুই বছর আগের তুলনায় তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা এখন খারাপ। তবে যারা মনে করেন, তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা আগের চেয়ে ভালো হয়েছে, তাদের ৭৫ শতাংশ রিপাবলিকানদের ভোট দিয়েছেন। ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন ২৩ শতাংশ। অন্যদিকে, যারা মনে করেন তাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়েছে, তাদের মধ্যে ২৪ শতাংশ রিপাবলিকানদের ভোট দিয়েছেন। আর ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন ৭২ শতাংশ। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি উন্নতির দিকে যাচ্ছে।

অভিবাসন, অর্থনীতি ও গণতন্ত্র নিয়ে ভোটারদের ভাবনা

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সমস্যা কোনটি, এ প্রশ্নে ভোটারদের মতামতে দলীয় পার্থক্য দেখা গেছে। যারা অভিবাসনকে সবচেয়ে বড় সমস্যা মনে করেন, তাদের ৮৯ শতাংশ রিপাবলিকানদের ভোট দিয়েছেন। ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন মাত্র ৯ শতাংশ। ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রচারে অভিবাসনবিরোধী অবস্থান বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে অভিবাসীদের বহিষ্কারের কার্যক্রম আরও বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন।

 

এরপর দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের অভিবাসনবিষয়ক সংস্থাগুলোর তৎপরতা বেড়েছে। অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার (আইসিই) কর্মকর্তারা বিভিন্ন স্থান থেকে অভিবাসীদের গ্রেপ্তার করছেন। এমনকি যাদের আশ্রয়ের আবেদন এখনো বিবেচনাধীন, তাদেরও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। ট্রাম্প ও তার সমর্থকদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখতে এসব পদক্ষেপ জরুরি। অন্যদিকে, যারা গণতন্ত্রের বর্তমান অবস্থাকে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা মনে করেন, তাদের ৭৭ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন।

ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ও তাদের সমর্থকদের অভিযোগ, ট্রাম্প আদালতের সরাসরি নির্দেশও মানছেন না। এর মধ্যে অভিবাসীদের বহিষ্কার বন্ধের নির্দেশও রয়েছে। তাদের আরো অভিযোগ, ট্রাম্প কংগ্রেসের সিদ্ধান্তও উপেক্ষা করছেন। আর যারা অর্থনীতিকে সবচেয়ে বড় সমস্যা মনে করেন, তাদের ভোট রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে প্রায় সমানভাবে ভাগ হয়েছে।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে প্রার্থী নন। তবে গত দুই বছরে তিনি ও তার দল যেভাবে দেশ পরিচালনা করেছেন, এই নির্বাচনকে তার ওপর ভোটারদের মতামত প্রকাশের সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা অনেক কমেছে। জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ শতাংশেরও কম মানুষ মনে করেন, তিনি ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাম্প্রতিক ইতিহাসে শুধু সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের জনপ্রিয়তা এর চেয়ে কম ছিল। তার দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দিকে জনপ্রিয়তা নেমে এসেছিল ২৫ শতাংশে। ২০০৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বুশের দল রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারায়।

 

ভোটকেন্দ্র থেকে বের হওয়ার সময় নেওয়া সাক্ষাৎকারে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক ভোটার ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশের সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। চারজন ভোটারের মধ্যে তিনজন বলেছেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তারা ‘ক্ষুব্ধ’ অথবা ‘অসন্তুষ্ট’। এপির জরিপে দেখা গেছে, ক্যালিফোর্নিয়া ও ম্যাসাচুসেটসের মতো ডেমোক্র্যাট-সমর্থিত অঙ্গরাজ্যগুলোতে অসন্তোষের মাত্রা বেশি। তবে রিপাবলিকান-সমর্থিত অঙ্গরাজ্যগুলোতেও বেশির ভাগ ভোটার অন্তত অসন্তুষ্ট বলে জানিয়েছেন।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে কি ডেমোক্র্যাটরা?

মঙ্গলবারের নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে রিপাবলিকান ও তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ স্বতন্ত্র সদস্যদের দখলে ছিল ৫৩টি আসন। অন্যদিকে, প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের মধ্যে রিপাবলিকানদের হাতে ছিল ২২০টি আসন। এই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে প্রয়োজন ২১৮টি আসন। অর্থাৎ, সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনের চেয়ে মাত্র দুটি আসন বেশি ছিল তাদের হাতে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দুই দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদে দুই দলের আসনসংখ্যার ব্যবধান খুবই কম থাকছে।