চাঁপাইনবাবগঞ্জে এমপি ওদুদের ডান হাত বুলির অপকর্মে ডুবছে আ.লীগ

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

আওয়ামী লীগ নেতা, কলেজের প্রিন্সিপাল, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, প্রভাবশালী ঠিকাদার—এসব পরিচয় ছাপিয়ে যা আলোচনায়, তা হচ্ছে তাঁর নিয়ন্ত্রণেই গোটা সদর উপজেলা। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ সদর আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল ওদুদ বিশ্বাসের আস্থাভাজন এজাবুল হক বুলি। সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষের পদও বাগিয়ে নিয়েছেন তিনি।

 

এমপির ডান হাত বলে পরিচিত এই বুলি ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, বালুমহাল, নিয়োগ বাণিজ্য, সীমান্ত পেরিয়ে ভারত থেকে আসা গরুতে চাঁদাবাজি করে থাকেন। টিআর, কাবিখাসহ সব সরকারি বরাদ্দ এমপির হয়েই দেখভাল করে থাকেন বুলি। এমপি ওদুদের ক্যাডার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণও বুলির হাতে। কোনো কিছুর বিরুদ্ধে মুখ খুললেই দেওয়া হয় মিথ্যা মামলা। বিএনপির শাসনামলে ছিলেন যুবদল নেতা।

 

  • হামলা আর মামলা দিয়ে তটস্থ করে রেখেছিলেন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের। আর সেই যুবদল ক্যাডার বুলি দল পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে এখন হয়েছেন আওয়ামী লীগেরও নিয়ন্ত্রক। তিনি এখন আওয়ামী লীগে থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর চালিয়ে যাচ্ছেন নিপীড়ন। তাঁর কথার এদিক-সেদিক হলেই আর রক্ষা নেই।

 

স্থানীয় এমপি আব্দুল ওদুদ বিশ্বাসের প্রত্যক্ষ মদদেই বুলি ও তাঁর লোকজন সদর উপজেলায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে। তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলে বা বাধা হয়ে দাঁড়ালে নানাভাবে মামলা কিংবা হয়রানির শিকার হতে হয়। ফলে নিরাপত্তাহীনতায় কেউ মুখ খুলতে সাহস করে না। সরেজমিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ ঘুরে এমপির ঘনিষ্ঠ এজাবুল হক বুলি ও তাঁর বাহিনীর নানা কর্মকাণ্ডের চিত্র মেলে।

 

জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক এমপি হারুন-অর-রশিদ ও তাঁর স্ত্রী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়ার চাচাতো দেবর বুলি।

 

  • ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলে বিএনপির এমপি হারুন-অর-রশিদের ডান হাত ছিলেন যুবদল নেতা বুলি। ওই সময় থানার দালালিসহ তত্কালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ও সহযোগী অঙ্গসংগঠনের শতাধিক নেতাকর্মীর নামে মামলা দায়েরের নেপথ্যের কারিগরও ছিলেন তিনি।

 

২০০৫ সালে তত্কালীন সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমপি ওদুদ বিশ্বাস আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তাঁর হাত ধরেই বুলি ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

 

বুলির কর্মকাণ্ডের মধ্যে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও প্রিন্সিপালকে হটিয়ে নিজেই কলেজের প্রিন্সিপাল হওয়ার ঘটনাটি বেশ আলোচিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর কলেজের অধ্যক্ষ ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এনামুল হক ফিটুকে জোর করে কলেজ থেকে বের করে প্রভাষক থেকে একলাফে অধ্যক্ষ হন তিনি।

 

কলেজের পাঁচজন সিনিয়র সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপক থাকার পরও বুলি প্রভাষক থেকে হয়েছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে এমপি ওদুদ বিশ্বাস প্রভাব খাটিয়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ বুলিকে ওই দায়িত্বে বসান। নিয়মনীতি উপেক্ষা করে পরে ভারপ্রাপ্ত থেকে বুলিকে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

 

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, কলেজটির সাবেক অধ্যক্ষ মুক্তিযোদ্ধা এনামুল হক ফিটুর ২০১৩ সালে অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় তিনি আরো দুই বছর সময় বাড়তি পেয়েছিলেন। সেই মতে এনামুল হকের অবসরে যাওয়ার কথা ছিল ২০১৫ সালে। কিন্তু এর আগেই জোর করে তাঁকে অবসর নিতে বাধ্য করেন বুলি। শুধু তা-ই নয়, এমপির সহযোগিতায় পাঁচজন সহযোগী অধ্যাপককে ডিঙিয়ে প্রভাষক থেকে হয়েছেন অধ্যক্ষ।

 

  • সরেজমিনে গেলে কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, ‘দেশের জন্য যিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, সেই প্রিন্সিপাল মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার কারণে সরকার তাঁর জন্য চাকরির মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে দেন; কিন্তু তাঁকে অন্যায়ভাবে বাধ্যতামূলক অবসরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

 

শুধু তা-ই নয়, অধ্যক্ষ এনামুল হক প্রায় আড়াই বছর হচ্ছে অবসর নিলেও এখন অবসর ভাতার মুখ দেখতে পাননি। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার ভাতা নিয়েই কোনোমতে পরিবার নিয়ে চলছে তাঁর জীবনযাপন।

 

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক অধ্যক্ষ এনামুল হক মিডিয়ার সঙ্গে কোনো কথা বলতে চাননি। তবে তাঁরই কয়েকজন আত্মীয় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘জামায়াত-বিএনপি থেকে আসা এমপি ওদুদরা মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান দেবেন কী করে? উল্টো অন্যায়ভাবে চাকরি থেকে অবসরে যেতে বাধ্য করেছেন মুক্তিযোদ্ধাকে।

 

  • এমপি যা চান, সেটাই বাস্তবায়ন করেন তাঁরই ঘনিষ্ঠ বুলি। এই বুলির দাপটে এখন গোটা চাঁপাইনবাবগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও তটস্থ। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পল্লী বিদ্যুৎ কার্যালয় এবং বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ডে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

 

এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার পলাতক আসামিও জামায়াত নেতা আব্দুল্লাহ মাসুদ ও দুরুল হুদা। তাঁরা দুজনই শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর কলেজের প্রভাষক। পলাতক থাকলেও বেতন-ভাতা প্রতি মাসেই তুলে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। পলাতক ওই আসামিদের গাড়িতে নিয়ে ঘুরে বেড়ান বুলি। এমনকি এমপি ওদুদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও যোগ দেন জামায়াতের ওই দুই পলাতক ক্যাডার।

 

  • চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তর সূত্র মতে, বুলির হাতেই জেলার পুরো টেন্ডার নিয়ন্ত্রিত। শুধু তা-ই নয়, ক্ষমতার দাপটে ২০১৪ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঠিকাদার সমিতি দখল করে নিয়ে নিজেই আহ্বায়ক হয়ে যান। বুলি সিন্ডিকেটের বাইরে অন্য কেউ কোনো দরপত্রে অংশ নিতে পারে না।

 

ঠিকাদার সমিতির তত্কালীন সভাপতি তৌহিদুর রহমানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। শুধু বলেন, ‘আমার সঙ্গে যা করা হয়েছে, তা অন্যায় হয়েছে। এর একদিন বিচার হবেই। ’

 

বুলি সিন্ডিকেটের বাইরে প্রায় ১৬ কোটি টাকার দরপত্রে অংশ নিতে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন ঠিকাদার মনির হোসেন বকুল। চাঁপাইনবাবগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের সম্প্রসারণ কাজের দরপত্র দাখিল করতে এসে খোদ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে লাঞ্ছিত হন তিনি। জেলা ঠিকাদার সমিতির আহ্বায়ক ও আওয়ামী লীগ নেতা এজাবুল হক বুলির নেতৃত্বে তাঁকে হেনস্তা করে তাঁর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

 

  • এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদার মনির হোসেন বকুল বলেন, ‘সেদিন দরপত্র জমা দিতে গেলে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়াসহ আমাকে লাঞ্ছিত করেন বুলি। তাঁর লোকজনই জেলার টেন্ডারের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।

 

অন্য ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বুলির ঠিকাদারি লাইসেন্স হচ্ছে এবি কনস্ট্রাকশন। এই লাইসেন্সসহ হাতে গোনা কয়েকটি লাইসেন্স দিয়েই জেলার পুরো ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। জেলার দুটি বালুমহালও বুলি নিয়ন্ত্রণ করছেন। কয়েক বছরের মধ্যে বুলির বাইরে কেউ বালুমহাল ঠিকাদারি কাজে অংশ নিতে পারেনি।

 

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করে, ‘বুলি আর এমপি আব্দুল ওদুদ মানিকজোড়। তাঁদের দখলবাজি, টেন্ডারবাজি আর বিএনপি-জামায়াতিদের পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি গোটা চাঁপাইনবাবগঞ্জের সবাই জানে। তাঁদের এসব কর্মকাণ্ড থামানো না গেলে জেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসবে না। ’

 

  • মুক্তিযোদ্ধাকে বের দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে এজাবুল হক বুলি বলেন, ‘আমি কাউকে বের করে দিইনি, রেজল্যুশন করেই নিয়মের মধ্যে এটা হয়েছে। কারণ তাঁর ওই পদে থাকার মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। অবসর ভাতার শিটে স্বাক্ষর না করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি কখনো আমার কাছে শিটে স্বাক্ষরের জন্য আসেননি এবং বলেননি।

 

ঠিকাদারি সমিতি দখল এবং জেলার ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে বুলি বলেন, ‘আমি একজন ঠিকাদার। ১৮ বছর আগে থেকে ঠিকাদারি করি। বৈধ উপায়ে সেই সমিতির আহ্বায়ক হয়েছি। ঠিকাদারি কাজে অংশ নেওয়া মনির হোসেনকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।

 

বুলির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে এমপি আব্দুল ওদুদ বিশ্বাস বলেন, ‘বুলি আমার সঙ্গে আগে বিএনপি করতেন। আমরা কাছাকাছি সময়ে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছি। তাঁর বিরুদ্ধে এখন যারা অভিযোগ করছে তারা মিথ্যা বলছে। বুলি এলাকায় খুবই জনপ্রিয়, সবাই তাঁকে পছন্দ করে। গত ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচনেও বিপুল ভোটে পাস করেছেন তিনি।

সূত্র: কালের কণ্ঠ

Print