বাড়ির ভুয়া ঠিকানা দিয়ে কোথায় গেলেন তারা?

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক সি জং কিম গত ১৫ মার্চ বাংলাদেশে প্রবেশের সময় তার ঠিকানার ঘরে উল্লেখ করেছেন- বাসা নম্বর ১২/২, ২ নম্বর রোড, খুলশী আবাসিক এলাকা। তবে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, এটি একটি রেস্টুরেন্ট। এ রেস্টুরেন্টের মালিকও নন তিনি। মাঝে মাঝে খেতে আসেন এখানে। অথচ এ ঠিকানায় হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন বলে বিমানবন্দরে মুচলেকা দিয়ে এসেছিলেন তিনি।

একইভাবে গত ১১ মার্চ বাংলাদেশে আসেন আকিরো সাইতো নামের জাপানের একজন নাগরিক। ইমিগ্রেশনের তথ্যানুযায়ী তিনি বাংলাদেশে অবস্থান করবেন উত্তর খুলশী এলাকার ২ নম্বর রোডের ৬১/সি নম্বর বাসায়। থাকবেন হোম কোয়ারেন্টাইনে। ওই বাড়ির কেয়ারটেকার জানালেন, জাপান থেকে এসেই নিয়মিত চট্টগ্রাম ইপিজেডের কর্মস্থলে গেছেন তিনি।

চট্টগ্রামে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশি কিংবা বিদেশিদের ঠিকানায় গিয়ে এমন পিলে চমকানো  তথ্য পাচ্ছেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটরা। তারা বলছেন, হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন বলে প্রবাসী বাংলাদেশি ও বিদেশিরা বিমানবন্দরে যে ঠিকানা দিয়েছেন, তার প্রায় অর্ধেকেরই দেখা মেলেনি ওইসব ঠিকানায়। আবার নগরীর খুলশী ও চান্দগাঁও এলাকাকে ‘ডেঞ্জারজোন’ মনে করছেন তারা। কারণ চট্টগ্রামে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা ৯৭৩ জনের মধ্যে প্রায় ৬০০ জনই ঠিকানা ব্যবহার করেছেন এ দুটি এলাকার।

বিষয়টি স্বীকার করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকা খুলশীর এক বাড়িতে মঙ্গলবার লাল পতাকা ঝুলিয়েছি আমরা। এ বাড়িতে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন থেকে আসা ৩০ জন বিদেশি রয়েছেন। আবার আরেকটি বাড়িতে দক্ষিণ কোরিয়ার রেস্টুরেন্টের ঠিকানা দিয়ে বাংলাদেশে আসেন কোরিয়ার এক নাগরিক। হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে তিনি এ ঠিকানা ব্যবহার করলেও আসলে তিনি মাঝেমধ্যে খেতে যেতেন সেখানে। সরেজমিন গিয়ে পাওয়া যায়নি তাকে। তাই রেস্টুরেন্টটি বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছি।’

তিনি জানান, খুলশী এলাকায় এমন বিদেশি ও প্রবাসী বাংলাদেশি আছেন দেড় শতাধিক। অভিজাত এলাকা হওয়ায় বিদেশিদের অনেকে খুলশীকে তাদের হোম কোয়ারেন্টাইনের ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে ৬৭ জনের ঠিকানা আছে খুলশী এলাকার পূর্ব পাহাড়তলী ও পূর্ব নাছিরাবাদে। আর শতাধিক ব্যক্তির ঠিকানা রয়েছে দক্ষিণ পাহাড়তলী মৌজার আগ্রাবাদ সার্কেলে। মঙ্গলবারও তাদের সবার হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার কথা ছিল। সরেজমিন গিয়ে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা বিদেশিদের অনেকের দেখা মিলছে না।

অভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বলেন চান্দগাঁও সার্কেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মামনুন আহমেদ অনিক। তিনি বলেন, ‘মঙ্গলবার পর্যন্ত চান্দগাঁও, মোহরা, হিলভিউ, ষোলশহর এলাকায় ৪০১ জনের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার কথা ছিল। কিন্তু ৩০ থেকে ৩৫টি বাড়িতে গিয়ে অর্ধেক বিদেশিকেও পাওয়া যায়নি তাদের ঠিকানায়। মঙ্গলবার মোহাম্মদপুরের চারটি বাড়িতে গিয়ে কেবল দুবাইফেরত একজনকে বাড়িতে পেয়েছি। বাকিরা হোম কোয়ারেন্টাইন না মেনে রাঙ্গুনিয়া, রাউজান ও হাটহাজারীতে চলে গেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘চান্দগাঁও এলাকায় হোম কোয়ারেন্টাইন হিসেবে ব্যবহূত অনেক ঠিকানাও ভুয়া পাচ্ছি। অনেকে পাসপোর্টে থাকা ঠিকানাকে হোম কোয়ারেন্টাইনের ঠিকানা বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বাস্তবে গিয়ে আমরা মিল খুঁজে পাচ্ছি না। যারা হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন, তারা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত নন। ১৪ দিন শেষ না হতেই তাদের একেবারে ঝুঁকিমুক্ত বলা যাবে না। তাই ঠিকানা ধরে সবাইকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি আমরা।’

জানা গেছে, চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত ৯৭৩ জনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রেখেছে প্রশাসন। বিমানবন্দর থেকেই তাদের নিয়মকানুন মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে এতদিন কঠোরভাবে মনিটর করা হয়নি এদের চলাফেরা। তাই অনেকে নিয়ম না মেনে যোগ দিয়েছেন কর্মস্থলে। সেরেছেন প্রাত্যহিক অনেক কাজ। এ কারণে ঝুঁকি বাড়ছে সবার।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াছ হোসেন বলেন, ‘যারা হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন, তাদের ব্যাপারে এখন ভালোভাবে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে ঠিকানা খতিয়ে দেখছেন। নিয়ম না মানলে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিকে।’

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামের চান্দগাঁওতে গতকাল দুটি বাড়ি লকডাউন করে দিয়েছে পুলিশ। এ দুটি বাড়ির একটি হোম কোয়ারেন্টাইনের ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন কক্সবাজারের এক বাসিন্দা। নিউ চান্দগাঁওয়ের ৭ নম্বর রোডের ৬৪ নম্বর বাড়িতে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকবে বলে বিমানবন্দরে উল্লেখ করেছিলেন তিনি। তবে ভ্রাম্যমাণ আদালত গিয়ে সে বাড়িতে পাননি কাউকে। আবার হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিকে না পেয়ে খুলশীর একটি বাড়িতেও লাল পতাকা ঝুলিয়েছেন ম্যাজিস্ট্রেট।

Print