সুনীল অর্থনীতিই আগামীর নির্ভরতা

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

প্রাণিবিজ্ঞানী মারাহ্ জে. হার্ডট ২০১৭ সালে ‘মনোরহ্যাফিশ শুনি’ প্রজাতির যে সামুদ্রিক স্পঞ্জটির কথা উল্লেখ করেছিলেন, সেটির বয়স ১১ হাজার বছর। অর্থাৎ ১১ হাজার বছর ধরে প্রাণীটি সমুদ্রের তলদেশে বেঁচে আছে। তাহলে আমরা যে এতদিন জানতাম পৃথিবীর দীর্ঘজীবী প্রাণী হচ্ছে কচ্ছপ, সে ধারণাটি ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে।

এর মাধ্যমে আমরা জানলাম, এ ধরনের বিস্ময়কর তথ্য আমরা একমাত্র সমুদ্র থেকেই পেতে পারি। এই যে দীর্ঘজীবী সামুদ্রিক প্রাণী সেগুলোর জিন মানবদেহে প্রবিষ্ট করানো সম্ভব হলে কি মানুষও এতটা দীর্ঘজীবী হবে? এটি বিজ্ঞানীরা ভেবে দেখতে পারেন।

তবে আমরা যে ধারণাটি পেলাম সেটি হচ্ছে, সমুদ্র যেমন অপার রহস্যের আধার, তেমনি শক্তিরও বিশাল উৎস। এ শক্তিশালী সমুদ্র এতদিন আমাদের ছিল না। ছিল না বলেই সমুদ্র সম্পর্কে আমাদের ধারণাও ছিল খুবই সীমিত। আমরা বলি, সমুদ্র স্নানে যাচ্ছি এবং অতঃপর হাঁটুপানিতে জলকেলি করে মধুচন্দ্রিমা সেরে ফেরত আসি।

২০১২ সালে আমাদের সামনে সমুদ্রের এক বিশাল দিগন্ত উন্মোচিত হল। তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের নেতৃত্বে আমরা মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে বিবাদ মিটিয়ে সাকুল্যে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা লাভ করি।

তাতে আমাদের মোট সমুদ্রসীমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ১১০ বর্গকিলোমিটার, যা আগে ছিল ২ হাজার ২৯৭ বর্গকিলোমিটার। হিসাব করলে দেখা যায়, এটি বাংলাদেশের প্রায় সমান, অর্থাৎ মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ২৬ হাজার ৪৬০ বর্গকিলোমিটার ছোট।

তার মানে আমাদের তৃতীয় প্রতিবেশীটি বেশ বড়সড় শরীর নিয়ে আমাদের পাশে অবস্থান করছে। এখন তাকে আর অবহেলা করা যাবে না, এখন অবলোকন করার কার্যক্রম আর হাঁটুপানিতে স্নান করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।

গভীর এ সমুদ্রকে এখন আমাদের গভীরভাবেই পর্যবেক্ষণ করতে হবে। জানার চেষ্টা করতে হবে কী অমূল্য সম্পদ লুকিয়ে আছে সমুদ্রজুড়ে এবং এর তলদেশে। অবশ্য অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনেই সমুদ্রের দিকে আমাদের ধাবিত হতে হবে।

চাষযোগ্য জমির পরিমাণ হ্রাস এবং অন্যান্য কারণে যেভাবে আমাদের খাদ্যভাণ্ডার সংকুচিত হয়ে আসছে তাতে বিকল্প খাদ্যের অনুসন্ধান করা ছাড়া উপায় নেই। এ অনুসন্ধানে সমুদ্রই অকৃপণ হস্তে তার ভাণ্ডারের দ্বার উন্মুক্ত করে দিতে পারে।

সংস্কারবশত আমরা যে এতদিন সি ফুড ব্যবহার করতাম না, সেই মানসিক অবস্থান থেকে এখন সরে আসতে হবে। ফিল্ড ওয়ার্কের একটি অভিজ্ঞতা না বললেই নয়। সি উইড (সামুদ্রিক শৈবাল) নামের ঔষধি গুণসম্পন্ন যে সমুদ্র সম্পদটি পরিচিত, সেটি কাঁচাই খাওয়ার যোগ্য। অতঃপর রন্ধন করে খেয়ে দেখেছি এর স্বাদের সীমাই নেই। তেমনি বিশ্বব্যাপী যে সি ফুড ব্যাপকভাবে প্রচলিত, সেগুলোর প্রতি আমাদের নির্ভরশীলতা বাড়াতে হবে।

আমরা যদি একটি হাইপোথিসিসের মাধ্যমে অগ্রসর হই যে, সমুদ্র প্রাণপ্রাচুর্য আর ঐশ্বর্যে ভরপুর তাহলে অনেক পেছনে ফিরে তাকাতে হবে, তাকাতে হবে পুরাণের যুগে। এ নিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যেমনটি বলেছিলেন, ‘মন্থন-মন্দার দিয়া দস্যু সুরাসুর/মথিয়া লুণ্ঠিয়া গেছে তব রত্নপুর।’ (সিন্ধু, তৃতীয় তরঙ্গ)।

তবে পুরাণের যুগ যেহেতু বাসি হয়েছে, আমাদের বাস্তবভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে জেনে নিতে হবে আমরা আসলে কতটা ঐশ্বর্যশালী। এ অবস্থায় সমুদ্র জয়ের প্রেক্ষাপটে বৈজ্ঞানিক (সিসমিক ও ভূতাত্ত্বিক) গবেষণাই হতে হবে আমাদের প্রথম পদক্ষেপ।

যে যত কথাই বলুক, এ জরিপ ও গবেষণা কর্মটি সম্পন্ন হয়নি বলেই সমুদ্র জয়ের ৭ বছর অতিক্রান্ত হলেও আমরা এখনও কোনো সমুদ্র সম্পদ উত্তোলন করতে সক্ষম হইনি।

গভীর সমুদ্রের মৎস্যসম্পদ নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, আমরা তো জানিই যে, ভারত মহাসাগরের অংশ বিধায় আমাদের বিজিত সমুদ্রসীমায় টুনা মাছের প্রাচুর্য আছে। তা আছে বটে; কিন্তু টুনা ধরা মোটেও সহজ নয়।

২০১৭ সালে নিউইয়র্কে সমুদ্র সম্মেলনে যোগদানের সময় এক মালদ্বীপ প্রতিনিধির মুখে পিলে চমকানো কথা শুনেছিলাম। ছোট্ট একটি দ্বীপ হলেও মালদ্বীপ প্রতিদিন ১০০ টন টুনা মাছ ধরছে।

কারণ তাদের প্রত্যেক পরিবারেই রয়েছে একটি করে মাছ ধরার নৌকা, সর্বোপরি তাদের রয়েছে এ পদ্ধতিতে মাছ ধরার হাজার বছরের ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশও সমুদ্রজয়ের পর এ বিষয়ে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে শুরু হবে লং লাইনার ও পার্স সেইনিং পদ্ধতিতে মাছ ধরার কার্যক্রম।

তেমনি জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পেট্রোবাংলা শুরু করেছে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ। রাখাইন বেসিনের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করে মিয়ানমার যদি তার সুনীল অর্থনীতির ফল ভোগ করতে পারে, তবে এর প্রতিবেশী বেঙ্গল বেসিন থেকে বাংলাদেশও সম্পদ আহরণ করে তার অর্থনীতিতে আয় যোগ করতে সক্ষম হবে।

ওদিকে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর অনুসন্ধান করছে খনিজসম্পদের। আমাদের সমুদ্রের তলদেশে জিরকন, রুটাইল, গারনেট, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট ইত্যাদি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এসব এখন সময়ের ব্যাপার, তবে লক্ষ রাখা উচিত সময় দ্রুত কমিয়ে আনার।

কারণ সুনীল অর্থনীতির উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ অতিরিক্ত কালক্ষেপণই করে ফেলেছে। ব্লু ইকোনমির আরও অনেক উদ্যোগ রয়েছে। সমুদ্রের বিশাল জলরাশিকে ব্যবহার করার জন্য বাংলাদেশ-ভারত-শ্রীলংকা-মালদ্বীপ- এ ৪টি দেশের সমন্বয়ে সিক্রুজ-কোস্টাল ট্যুরিজমের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।

এতে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন সমন্বিতভাবে কাজ করবে। আমরা জানি, ইতিমধ্যেই ঢাকা থেকে কলকাতা অভিমুখে যাত্রা সম্পন্ন করেছে সিক্রুজের প্রথম জাহাজটি।

‘সিন্ধু’ কবিতায় ছিল সমুদ্র মন্থনের কথা। আমরা যদি সম্পদ আহরণ করতে গিয়ে সমুদ্র মন্থন করে সব শেষ করে দিই তাহলে তো চলবে না। আশার কথা এ বিষয়ে অন্তত বাংলাদেশের সচেতনতার ঘাটতি দেখা দেয়নি।

২০১৭ সালের সমুদ্র সম্মেলনেই বাংলাদেশ এ বিষয়ে ৩টি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত অঙ্গীকার করেছিল : এক. ২০২৫ সালের মধ্যে সামুদ্রিক এলাকায় সব ধরনের দূষণ, বিশেষ করে মূল ভূভাগ থেকে দূষণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনা, দুই. ২০২০ সালের মধ্যে ৫ শতাংশ সামুদ্রিক এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে সংরক্ষণ করা, তিন. ২০২০ সালের মধ্যে সামুদ্রিক এলাকা থেকে অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ, অবৈধ, অধিকৃত, নিয়ন্ত্রণাধীন এবং ধ্বংসাত্মক মৎস্য আহরণ পদ্ধতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

উল্লেখ্য, নিঝুম দ্বীপ এলাকায় সমুদ্র সংরক্ষণের উদ্যোগের মাধ্যমে এ কার্যক্রম ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১৪-এর অধীনে।

আশানুরূপ ফলোদয় না হলেও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারি উদ্যোগ যথাযথ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিষয়াদির সুষ্ঠু সমন্বয়ের জন্য জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অধীনে সরকার সৃষ্টি করেছে ব্লু ইকোনমি সেল।

উদ্যোগ ও বাস্তবায়নের মধ্যে কোনো গ্যাপ তৈরি না হলে গুন্টার পাউলির ভাষ্য অনুযায়ী, এ দেশও ১০ বছরে ১০০ উদ্ভাবন দ্বারা ১০০ মিলিয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্বপ্ন দেখতে পারে। এতে প্রাইভেট সেক্টরের কার্যকর ভূমিকা থাকবে।

জাতীয় কবি কালজয়ী ‘সিন্ধু’ কবিতাটি লিখেছিলেন ৯৩ বছর (১৯২৬ সালের ৩১ জুলাই) আগে, চট্টগ্রাম বসে। এতে তিনি সাবমেরিনের প্রসঙ্গ টেনেছিলেন : হাঙর-কুমির-তিমি চলে ‘সাবমেরিন’। তাহলে কত বছর পর আমাদের নৌবাহিনী সাবমেরিনের মালিকানা অর্জন করল?

তবে এ ধরনের সময় অতিক্রান্তিকে উদাহরণ হিসেবে ধরে না নিলেও এবং জাতীয় ক্ষতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত না করলেও এটি বলার অপেক্ষা রাখে না, সুনীল অর্থনীতির উদ্যোগ বাস্তবায়নে আমরা খানিকটা সময় নিয়েই ফেলেছি। এ ক্ষতি পোষানোর জন্য আমাদের একটি ইতিবাচক ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ নীতি অবলম্বন করার কথা ভাবতে হবে।

ড. গোলাম শফিক : প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক

Print