ভারতে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার নেপথ্যে

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

সুন্দর একটি বিশ্বে শিক্ষার্থীরা একে অপরের মাথা ফাটিয়ে দেয়ার মতো কাজ করবে না। গত ৫ জানুয়ারি দিল্লিতে আবারও প্রমাণিত হল, সৌন্দর্য কোনো রাজনৈতিক আদর্শ নয়।

ওই দিন জওহরলাল নেহেরু ইউনিভার্সিটির (জেএনইউ) ফরাসি ভাষার অনার্স প্রথমবর্ষের এক শিক্ষার্থী উগ্রপন্থী হিন্দু সংগঠন রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘের (আরএসএস) সহযোগী ছাত্রসংগঠন এবিভিপির আকশাথ আওয়েস্থির নেতৃত্বে জেএনইউর বামপন্থী ছাত্র সংসদের নেতা ঐশী ঘোষসহ কিছু শিক্ষার্থীকে পেটানো হয়।

উল্লেখ করার মতো দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হল, এটি কোনো হিন্দু বনাম মুসলিম সংঘর্ষ ছিল না। এবিভিপির হামলায় মুখোশধারী শিক্ষার্থীরা লোহার রড বহন করছিল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলগুলোয় সন্ত্রাস-আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছিল।

এবিভিপি পরিচালিত সন্ত্রাসের টার্গেট ছিল ছাত্র সংসদ কর্তৃক সার্ভার রুম ভাংচুর, যাতে শীতকালীন তথা উইন্টার সেমিস্টারের রেজিস্ট্রেশন করা না যায়। কয়েক সপ্তাহ আগে জেএনইউ খবরের শিরোনামে এসেছে হোস্টেল ফি বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে। সেমিস্টারের নিবন্ধন ফি বাড়ানোর বিষয়টি বৈধতা দেয়া হবে। যখন এবিভিপি হামলে পড়ল, তখন পুলিশ নীরব ভূমিকা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। দিল্লিতে অমিত শাহর নেতৃত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নির্দেশনার মধ্য দিয়ে চলেছে পুলিশ বাহিনী। সহায়তা করার জন্য ক্যাম্পাসের লাইটগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজ ও কল হিস্ট্রি বলছে, ছাত্ররা সহায়তার জন্য স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে অনেকবার যোগাযোগ করেছে। কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই পুলিশ দিল্লির জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ এবং আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের (মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক বলে বিবেচিত) বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিল।

পুলিশ বলছে, এ কারণে এবার তারা অজুহাত খুঁজছিল যতক্ষণ না জেএনইউ প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের অনুরোধ করে। এটি এসেছে শিক্ষার্থীদের ওপর রডের আঘাতের পর। এভাবে আরেকটি তীব্র শীতের রাত ভয়ংকর মারধর ও রক্তাক্ত ডেরায় কেটেছে।

২০ জানুয়ারি দিল্লিতে হতে যাচ্ছে রাজ্যসভা নির্বাচন। যদি জরিপগুলোকে বিশ্বাস করা হয় তবে ক্ষমতাসীন আম আদমি পার্টির (এএপি) মুখ্যমন্ত্রী অরভিন্দ কেজরিওয়াল সম্ভবত বিজয়ী হতে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় উত্তেজনা ও সহিংসতার মাঝে তিনি একজন সাধু হয়ে এসেছেন, সত্যিকার অর্থে তিনি যা-ই হোন না কেন।

কেন্দ্রে বিজেপি সরকার সক্রিয়ভাবে যখন নিজের বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতে লিপ্ত- পার্লামেন্টে অজনপ্রিয় বহু বিল আনা এবং দেশজুড়ে লাগামহীন সহিংসতার দ্বার উন্মোচন করে দেয়ার মাধ্যমে, তখন ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কেজরিওয়ালের হাতে লড়াই করার সুযোগ রয়েছে। সেটি হল, তিনি হলেন একজন সপ্রতিভ জনতুষ্টিবাদী- দিল্লির বাসে নারীদের জন্য নিরাপদ আরোহণ, পানি ও বিদ্যুৎ প্রায় ফ্রি সরবরাহ করার বারবার প্রচেষ্টা, ফিনল্যান্ড বা নরওয়ের মতো আধুনিক রাষ্ট্রের বিষয়গুলো বাস্তবায়ন নির্লিপ্তভাবে বিবেচনা করা, এসব বিষয় তার পক্ষে যে কোনোভাবে রাজপথ তৈরি করে দিতে সহায়তা করেছে। সর্বোপরি, কেজরিওয়াল ও মোদির মধ্যে সম্পর্কহানি হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেনি।

দিল্লিতে গত এক পক্ষকালে যা ঘটেছে তা অবশ্যই পর্যবেক্ষণমূলক চিন্তার মধ্যে আসতে হবে। শক্তিশালী একটি সরকার, যার কি না এক অর্থনীতি ছাড়া আর সবকিছুতে ভালো নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সে কেন বারবার নিজেকে এমনসব বিষয়ে আটকে ফেলছে যেগুলো নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে পরিবেশ তৈরি করে? জেএনইউর ঘটনা স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে মৌন সমঝোতা তৈরির কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে তাদের পারস্পরিক হস্তক্ষেপের সময় ও মাত্রা কমিয়ে আনা যায়। অমিত শাহ কি এমন সমঝোতা হারিয়ে ফেলছেন?

অমিত শাহ সম্ভবত এমন উপসংহার টানার সঙ্গে একমত হবেন না। তিনি বিশ্বাস করেন, নিজের রাজনৈতিক এজেন্ডার সঙ্গে মিল রেখে সবকিছুকে তিনি সুস্পষ্টভাবেই দেখছেন। কিন্তু স্পষ্টতার সঙ্গে প্রায় সময় যে সমস্যাটি হয় তা হল এটি একটি সুড়ঙ্গপথের মতো আকৃতির হয়ে থাকে। সুড়ঙ্গপথের বাইরের দিকে কী আছে, আপনি সেটি দেখতে পাবেন না।

নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে জামিয়া মিলিয়ার প্রতিবাদের ফল হয়েছে মুসলমানদের এক ধরনের সেক্যুলার বানানো। এই প্রথম মুসলিম তরুণরা রাজপথে নেমেছে ভারতের জাতীয় পতাকা ও সংবিধান হাতে নিয়ে এবং বোরকা পরিধান করে। ক্যাম্পাসগুলোয় চলমান শহুরে জঙ্গিপনা তরুণদের- পরবর্তী প্রজন্মের সক্রিয় ভোটার, সিদ্ধান্ত-প্রণেতাদের- জেগে উঠতে সহায়তা করেছে।

এ প্রবণতা সত্ত্বেও যদি মোদি-শাহ জুটি ডানপন্থী আইডিয়া চালিয়ে নিতে চায়, তবে হিন্দু ভোট বাগিয়ে নেয়ার সংহতি ও মেরুকরণ অর্জনে সেটি তাদের সহায়তা করতে পারে। কিন্তু জনসংখ্যার দিক থেকে বললে, হতে পারে এর মধ্য দিয়ে বয়োজ্যেষ্ঠদের ভোট বিজেপি বগলধাবা করবে। তরুণরা কিন্তু ভিন্ন পাশে রয়েছে। যেটিকে ভারতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অন্যভাবে বলা যায়, সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে সম্ভবত আলো নেই, যে সুড়ঙ্গ মোদি ও অমিত শাহ অনেক বেশি অধ্যবসায়ের সঙ্গে খনন করছেন। অন্যভাবে বলতে গেলে, তাদের পরিণাম হতে পারে আংশিক অন্ধত্ব।

গত সপ্তাহে মোদি সরকার বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের একটি গ্রুপকে কাশ্মীর উপত্যকায় নিয়ে গেছে সবকিছু ঠিক আছে দেখাতে। কূটনীতিকরা ফিরে এসেছেন, সৌভাগ্যবশত অক্ষত অবস্থায়। কিন্তু এ বছর যখন কাশ্মীর রাজ্যসভার নির্বাচন হবে, তখন এমন প্রদর্শনের কোনো প্রতিক্রিয়া থাকবে না।

এটি একটি নিরাপদ বাজি ধরা হবে যে, তরুণদের অনিচ্ছাকৃত উদ্বুদ্ধকরণ এবং মুসলিমদের সেক্যুলারকরণ এক ধরনের মুক্ত-কাশ্মীর রাজনীতির অনুমোদন দেবে। ওই স্বাধীনতার মাত্রা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু সুনির্দিষ্ট একটি বিতর্ক হতে যাচ্ছে ভোট ও ভাবমূর্তির বিবেচনায়।

যেহেতু বহুদিক থেকে কাশ্মীর নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে- ধর্মের ভিত্তিতে, উপ-জাতীয়তাবাদ, বিচ্ছিন্নতা ও সংখ্যালঘু ইত্যাদি ইস্যুতে; সেহেতু ভারত এমন একটি গণতন্ত্রের সামনে রয়েছে, যাতে বিভিন্ন মেরুকরণ চলে আসতে পারে। সংক্ষেপে বললে, জাতীয় বনাম জাতীয়বিরোধী রক্তাক্ত অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। এটি একটি আতঙ্কের বিষয়। দেশটিকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে- এ ব্যাপারে বিজেপি যদি সচেতন থাকে, তাহলে বলতে হবে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শীতের রোববারে যে আলো নিভে গিয়েছিল, তা পুঞ্জীভূত অন্ধকারকেই মনে করিয়ে দেয়।

গালফ নিউজ থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম

সি পি সুরেন্দ্র : ভারতের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

Print