প্রয়োজন দলীয়করণের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা

December 3, 2019 at 8:14 am

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

আলোর নিচে আর পেছনে যে অন্ধকার থাকে এ সত্য সবার জানা। তাই আলো দেখেই সব সময় আনন্দে উদ্বেলিত হওয়ার কারণ নেই। সততার সঙ্গে আলোর অবগাহনে নিজেদের শক্তিমান করতে না পারলে সূর্যগ্রহণ অবধারিত। তখন ওতপেতে থাকা অন্ধকার গ্রাস করবেই।

বর্তমান সরকারের কৃতিত্বে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শ্রমে ও আন্তরিকতায় দেশ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নতিতে আলোকোজ্জ্বল হচ্ছে- এ বিষয়ে নিন্দুক ছাড়া কারও দ্বিমত করার অবকাশ নেই।

কিন্তু প্রতিদিনই অনুভব করছি, চারদিক থেকে অন্ধকার ঘাপটি মেরে আছে আসুরিক দাপটে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। আশঙ্কা এই, যদি একে রোধ করা সম্ভব না হয়, তাহলে এতসব সাফল্য না জানি বিফল হয়ে যায়!

এই আশঙ্কা অনেকদিন থেকেই করছিলাম এবং একাধিকবার লিখেছিও জাতীয় দৈনিকে। এরপর যখন সরকার শক্ত হাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান শুরু করল তখন মনে হল আমাদের আশঙ্কার কথা নীতিনির্ধারণী মহলে পৌঁছাতে পেরেছি অথবা সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনরা নিজ গুণেই সত্য অনুধাবন করতে পেরেছেন। এবার বোধহয় সুদিন ফিরল।

কিন্তু অল্পদিনেই আশাবাদী দেশবাসীর চোখে আবার গ্রহণের অন্ধকার যেন দৃশ্যমান হচ্ছে। যেভাবে কোটি কোটি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও প্রার্থনাকে প্রাধান্য না দিয়ে সড়কের দাপুটে ভিলেন যানবাহনের মালিক-শ্রমিকদের নৈরাজ্যকে প্রশ্রয় দেয়া হল এবং অর্থলোভী ক্ষমতাবান ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের দাপট সহ্য করা হল তাতে হোঁচট খেল শুদ্ধি অভিযান নিয়ে প্রত্যাশার জায়গাটি। প্রশ্ন জাগল রাজনৈতিক সততা নিয়ে। সব আয়োজনই কি তাহলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও ক্ষমতাবান হওয়ার জন্য?

আমি গণতন্ত্রের নামে গণতন্ত্রহীনতার চেয়ে স্বৈরাচারী শাসনকেই প্রকৃত গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার বাহন মনে করি। তবে সে স্বৈরশাসন হবে আঠারো শতকের ইউরোপের মতো, যাকে ইতিহাস সম্মানিত করে ‘জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরাচার’ বলে।

দুর্নীতি, অন্যায়, হানাহানিতে বিপর্যস্ত ইউরোপের অনেক দেশ যখন হতাশার অন্ধকারে তলিয়ে যেতে থাকে, তখন বেশ কটি দেশের রাজা-রানীরা শক্ত হাতে দেশের হাল ধরেন। ঘোষণা দিয়েই যেন তারা স্বৈরাচারী শাসন প্রবর্তন করলেন।

নিজের স্বামী, সন্তান বা স্ত্রীকেও ছাড় দিলেন না। সব অন্যায়ের মূলোৎপাটন করতে সামান্যতম শৈথিল্য দেখালেন না। রেনেসাঁস যে সম্ভাবনা জাগিয়েছিল, তাকে অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন এ স্বৈরাচারী শাসকরা। এ জন্য ইউরোপের এই স্বৈরাচারকে ইতিহাস ‘জ্ঞানদ্বীপ্ত স্বৈরাচার’ নামে অভিহিত করেছে। আধুনিক ইউরোপের উন্নয়নের পেছনে এই স্বৈরাচারী শাসনের ভূমিকা কম ছিল না।

বিএনপি ও কোনো কোনো বাম নেতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে স্বৈরাচার বলেন। এরশাদও স্বৈরাচারী শাসক বলে পরিচিত। আসলে কোনো সরকারই এ দেশে গণতন্ত্রের ফর্মুলা মেপে মেপে দেশ শাসন করেনি। রাজনৈতিক প্রয়োজনে সবাইকে স্বৈরাচারী ভূমিকা পালন করতে দেখেছি আমরা। কিন্তু এই স্বৈরাচারী নীতিনির্ধারণ শাসকদের রাজনৈতিক স্বার্থ ও ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধির জন্য যতটা ব্যবহৃত হয়েছে, দেশের কল্যাণে ততটা হয়নি।

এ ক্ষেত্রে বলব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে দেশকে এগিয়ে নেয়ায় ভূমিকা রাখছেন, তা নতুন আশাবাদ তৈরি করেছে। এ দেশের নষ্ট রাজনীতি ও সামাজিক-প্রশাসনিক পরিবেশে গণতন্ত্রের নিয়ম মেনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যাবে না বলে আমার মতো অনেকেই বিশ্বাস করেন।

তাই প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই বারবার আমরা সংগোপনে হলেও ‘জ্ঞানদ্বীপ্ত স্বৈরাচার’কেই প্রত্যাশা করছি, যিনি দেশ ও দেশবাসীর কল্যাণ প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো ভাবাবেগে তাড়িত না হয়ে শক্ত হাতে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে আগ্রাসী ভূমিকা নেবেন। কিন্তু এমন সম্ভাবনা দেখেও যখন রাজনীতি ও ক্ষমতা সুরক্ষার জন্য সরকারের আপস মনোভাব প্রত্যক্ষ করতে হয়, তখন হতাশার জায়গাটিই বরং বেড়ে যায়।

অবস্থাদৃষ্টে এখন এমন অবস্থা যে, মানুষ ক্ষমতার বিচারে ক্রমানুসারে তিন প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করায়। এক. সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর সড়ক পরিবহনের মালিক-শ্রমিক নেতারা। দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট আর তৃতীয় ক্ষমতাধর সরকার। এ কারণে তৃতীয় স্থানে থেকে প্রথম-দ্বিতীয়কে চ্যালেঞ্জ করা সরকারের কম্ম নয়।

সড়ক পরিবহনের নেতাদের মন্ত্রিত্ব দিয়েও সুরাহা করতে পারেনি সরকার। না দেয়ায় তো সংকট ঘনীভূত হবেই। ব্যবসায়ী নেতাদের মন্ত্রী-এমপি বানিয়েও কি লাভ হয়েছে? সংকটে তারা কোনো ভূমিকা রাখতে পেরেছেন?

উনিশ শতকের ভারতে বণিকস্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে কোম্পানি শাসকরা যখন ঔপনিবেশিক শাসনকে বিপন্ন করে তুলেছিল, তখন রানী ভিক্টোরিয়ার প্রশাসন বাধ্য হয়েছিল কোম্পানি শাসনের বিলুপ্তি ঘটাতে। এভাবেই বাংলাসহ ভারতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্রিটিশ শাসন।

আমি যতটুকু দেখেছি সড়ক আইনটি ভারসাম্যমূলক একটি ভালো আইন। এ আইন কার্যকর হলে একদিকে সড়কে যেমন শৃঙ্খলা ফিরে আসার অবকাশ আছে, অন্যদিকে ড্রাইভারসহ শ্রমিকদের সুরক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। অথচ আইনটি কার্যকর করার আগে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে শ্রমিকদের মোটিভেশনের ব্যবস্থা নেয়নি সরকার পক্ষ।

আর জানাই আছে, সড়ক থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা তুলে নেয়া নেতারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলে নিজেদের ক্ষমতা প্রকাশ করতেই পছন্দ করে। এসব চাঁদার অর্থ বহুদূর পর্যন্ত যায় বলে সুবিধাভোগীরা আপসের পথে চলে।

সুতরাং প্রস্তুতি ছাড়া আইন প্রয়োগ করলে যে সেয়ানা খেলোয়াড়রা খেলবে, এ তো জানা কথাই। তাই যে কোনো দুর্ভোগ সাধারণ মানুষকেই পোহাতে হয়। এবার সরকার পক্ষ বাধ্য হল সব সুতা ঢিলে করে দিতে। এসব আখেরে সরকারের দুর্বলতা হিসেবেই বিবেচিত হবে।

এমন এক অদ্ভুত দেশে আছি যে, শোনা যায় এ দেশে জনবান্ধব ট্রেন নেটওয়ার্ক নাকি বাড়ানো যায় না বাস-ট্রাক মালিকদের চাপে। সরকারি ট্রেন ও বাস পর্যাপ্ত থাকলে বেসরকারি বাস-ট্রাক শ্রমিক-মালিকদের জিম্মি করার অভ্যাস অনেকটা কমত। কিন্তু সে ক্ষমতা সরকার পক্ষের থাকে না।

পাশাপাশি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখা যায়, মহাসড়কে কোথায় বিআরটিসির বাস চলবে কী চলবে না সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বাস-মালিকরা! সম্প্রতি দিনাজপুর থেকে চলার জন্য নতুন বিআরটিসির বাস প্রস্তুত থাকলেও এর চাকা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কারণ বিআরটিসির বাস চললে তাদের ব্যবসা কমে যাবে। এভাবে বেসরকারি পরিবহনের মালিক-শ্রমিকদের হাতে প্রকাশ্যেই জিম্মি হচ্ছে সরকার ও সাধারণ মানুষ।

অন্যদিকে আরেক শক্তিমান বণিক সিন্ডিকেটের হাতে ইতিমধ্যে ধরাশায়ী সরকার পক্ষ। পেঁয়াজ দিয়ে যাত্রা শুরু। এ আগুন এখন প্রতিদিন ছড়িয়ে পড়ছে নতুন নতুন নিত্যপণ্যে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য মন্ত্রণালয় যে ব্যবসায়ীদের ওপর কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে না তা এখন স্পষ্ট।

ব্যবসায়ীদের আচরণ এবং মন্ত্রী মহোদয়দের বিচিত্র মন্তব্য ও আশ্বাসবাণী তেমন ধারণাই দেয়। এখন মনে হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর ক্ষেত্রে বেশি নিরীক্ষা না করাই ভালো। অভিজ্ঞতার মূল্য দিতেই হবে। বাজারের অবস্থা নিয়ে নানা কথাই হচ্ছে এখন। কিন্তু সাধারণ মানুষের যে ত্রাহি দশা, এ সত্যটি কি বিবেচনায় আছে?

‘দলীয় সরকার’, ‘দলীয়বৃত্তি’ ইত্যাদি কথা বলতে গেলেই রাজনীতির চতুর মানুষরা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনা দেয়। বলতে চায় ওই দেশে সরকার পরিবর্তন হলে নতুন প্রেসিডেন্ট নিজ দলীয় মানুষকে দিয়েই সরকার সাজায়। কিন্তু প্রশ্ন থাকে, গণতন্ত্রের মার্কিন পর্যায়ে কি আমরা পৌঁছতে পেরেছি?

এ দেশে ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগই যেখানে অতীতের ইতিবাচক রাজনীতি ধরে রাখতে পারেনি, সেখানে ঐতিহ্যবিহীন ভুঁইফোড় দলগুলো কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে! কনুইয়ের গুঁতোয় পোড়খাওয়া রাজনীতিকদের সরিয়ে দিয়ে ধনবান বণিক ও আমলারা দখল করে নিচ্ছেন বড় বড় আসন। সংকটে সরকার এদের কাছ থেকে তেমন সুবিধা পাচ্ছে না।

মাসাধিক কাল ধরে মাননীয় মন্ত্রীরা এক সপ্তাহ পর, দশ দিন পর পেঁয়াজের দর স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আর্থিক চাপে পিষ্ট মানুষকে আশ্বাসবাণী দিয়েই যাচ্ছেন। কিন্তু তেমন সুদিন আর ফিরছে না। বাজারে চালের দাম কেজিতে যখন চার-পাঁচ টাকা বেড়ে গেল তখনও মাননীয় খাদ্যমন্ত্রীর ভাষায়- চালের বাজার স্বাভাবিক রয়েছে।

আবার আমাদের বিস্মিত করে খাদ্যমন্ত্রী জানালেন সাধারণ মানুষ নাকি মোটা চাল না খেয়ে সরু চাল খাচ্ছে বেশি, তাই কিছুটা দাম বেড়েছে সরু চালের। আমি বিষয়টি পরখ করার জন্য যে আড়ত থেকে চাল আনি তার মালিককে জিজ্ঞেস করায় তিনি তার বিক্রির সঙ্গে এ কথার বাস্তবতা খুঁজে পেলেন না।

দুঃখ লাগে তখনই, যখন বিশেষ অবস্থায় আমরা মাটিবিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। শুনেছি গোয়েন্দারা পেঁয়াজ সিন্ডিকেট হোতাদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অথচ দিন কয়েক আগে একটি টিভি চ্যানেল অনুসন্ধানী রিপোর্টে অন্তত চারটি সিন্ডিকেটের অস্তিত্বের কথা প্রামাণ্য উপস্থাপন করল। আমি বিশ্বাস করি না এ দেশের গোয়েন্দারা অদক্ষ-দুর্বল। তাহলে কি কোনো সিগন্যাল তাদের মান্য করতে হয়?

সংকটে পড়লে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। কট্টর দলীয়করণ নীতির কারণে সরকার পক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে মন্ত্রী পর্যন্ত দক্ষতা ও সততার বিচার না করে নিয়োগ দিয়ে থাকে। এতে প্রায়ই হোঁচট খেতে হয়।

কিন্তু দলীয় বিবেচনার বৃত্তে না থেকে ভিন্নমতকে এড়িয়েও অনেক দক্ষ, শোভন ও মেধাবী মানুষের হাতে দায়িত্ব অর্পণ করলে এর চেয়ে ভালো অবস্থা বিরাজ করত বলে আমার বিশ্বাস। বর্তমান সরকার দেশোন্নয়নের যে স্রোত তৈরি করে মানুষকে আশাবাদী করে তুলেছে, তাতে সরকারের আত্মবিশ্বাস অনেকটা দৃঢ় হওয়া উচিত।

এ অবস্থায় মুক্তচিন্তায় যদি সৎ ও যোগ্য মানুষের হাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করা যেত, তাহলে বোধহয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশটিকে এগিয়ে দেয়ার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, তার পূর্ণতা পাওয়া খুব কঠিন হতো না।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

Print