মার্শাল আর্টে পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রতিবন্ধী নাসির চান কাজের সুযোগ

November 20, 2019 at 12:15 pm

আসাদুজ্জামান নূর :
চাইনিজ মার্শাল আর্ট উশু, ইন্দোনেশিয়ান পেনতাক সিলাত, ইন্ডিয়ান সিলাম বাম, পৃথিবীর প্রথম মার্শাল আর্ট জাপানী জুজুৎসু ও জাপানী কারাতে মার্শাল আর্ট। এই পাঁচ রকম মার্শাল আর্টে দক্ষ রাজশাহীর পবা উপজেলার রাজপাড়া থানাধীন শিলিন্দা বাড়ইপাড়া গ্রামের নাসির উদ্দীন। তাঁর রয়েছে চারটি জাতীয় ও একটি জেলা পর্যায়ের পদক।

তিনি ২০১৮ সালে শেখ কামাল স্মৃতি আন্তর্জাতিক মার্শাল আর্ট রৌপ্যপদক, ২০১৩ সালে ওয়েস্টার্ন সিটি পেনতাক সিলাম স্বর্ণপদক, একই বছর গ্র্যান্ড মাস্টার পি. সিলভারাজ সিলামবাম তা¤্রপদক, সিনিয়র ক্লাব কারাতে রৌপ্য পদক, ২০১৩-১৪ সেশনে জেলা উশু প্রতিযোগিতায় সানডা ইভেন স্বর্ণপদক লাভ করেন।

তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো নাসির একজন অর্ধ-দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। এক চোখে দেখতে পান না। তারপরও এতগুলো ক্যাটারগরিতে মার্শাল আর্ট করতে পারেন। আর সেটাও কোন প্রতিবন্ধীর সঙ্গে নয়, স্বাভাবিক মানুষদের সঙ্গে।
দক্ষ খেলোয়াড় ও এত পুরস্কার পাওয়ার পরেও বহু কষ্টে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে তাকে। কারন এসকল প্রতিযোগিতায় নিজ খরচে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে। আর পুরস্কার ‘পদক’ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। এর কোন প্রাইজ মানি নেই।

শুধু খেলা দিয়ে তো আর জীবন চলে না। তাই বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বড়বোন ও স্ত্রী-কণ্যার সংসার চালাতে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন নাসির। সেটাও অনিয়মিত। প্রতিবন্ধী হওয়ার কারনে প্রতিদিন কাজ পান না। শ্রমিক সঙ্কট থাকলে তবেই কাজ মেলে তার।

নাসিরের স্ত্রী রেহানা পারভীন বলেন, মাসের ১০ দিন কাজ হলে ২০ দিন তাকে বসে থাকতে হয়। ১০ দিনের টাকা দিয়েই চালাতে হয় পুরো সংসার। তার বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বড়বোনের চিকিৎসা, সংসারের খরচ সবই চালাতে হয়। মেয়েটা অসুস্থ, তাকে ডাক্তার দেখাতে পারছি না। ঘরের ছাদ নেই, বৃষ্টির দিনে পানি পড়ে।

নাসির জানান, কারও কাছে কখনো কোনরকম সহযোগিতা পান নি। প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে কাজ করেন তিনি। উপজেলার হড়গ্রাম ইউনিয়নের প্রত্যয় প্রতিবন্ধী অধিকার সংস্থার সহ-সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিবন্ধীদের জন্য কোন সুযোগ-সুবিধা এলে নিজে গ্রহণ না করে অন্যদেরকে দেয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি।
শত অভাব ও প্রতিকূলতার মধ্যেও অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন নাসির। তার এই শিক্ষাগত যোগ্যতা ও খেলাধুলার বিশেষ অভিজ্ঞতা নিয়ে চাকুরীর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোন লাভ হয় নি।

২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়েতে চাকুরীর জন্য বেশ কয়েকটি পরীক্ষা দিয়েছেন। একবার মৌখিক পরীক্ষা অর্থাৎ ভাইভাও দিয়েছেন। মৌখিক পরীক্ষায় ভাল করলেও তার চাকুরী হয় নি। যদিও চাকুরীর বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবন্ধী কোটা ও প্রার্থীদের বিশেষ অভিজ্ঞতা, খেলাধূলা, স্কাউট ও অন্যান্য সনদ থাকলে অগ্রাধিকার দেয়া কথা বলা হয়।

নাসির বলেন, আমার জানা মতে বাংলাদেশে কোন প্রতিবন্ধী আমার মত এতগুলো মার্শাল আর্ট করতে পারে না। সেটা আবার স্বাভাবিক মানুষদের সাথে। প্রতিবন্ধী সনদ ছাড়াও খেলাধুলায় আমার বিশেষ পদক ও সনদ রয়েছে। বাংলাদেশ রেলে বেশ কয়েকবার আবেদন করেছি। ভাল ভাইভাও দিয়েছি। কিন্তু তারপরেও চেষ্টা করেও কোন স্থায়ী কর্মসংস্থান হয় নি। খুবই কষ্টে জীবনযাপন করছি। যেটা কাউকে বলতেও পারি না।

নাসিরের মার্শাল আর্ট শিক্ষক ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উশু কোচ শরিফুল ইসলাম বলেন, নাসির ২০০০ সাল থেকে মার্শাল আর্ট করে। বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতায় আনসার, আর্মি, বিজিবি, নৌবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে পুরস্কার অর্জন করেছে। সে খুবই কষ্টে জীবনযাপন করে। দক্ষতা, খেলোয়াড় ও প্রতিবন্ধী কোটায় তার একটি চাকুরী হলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সে হয়তো একটু ভালভাবে জীবনযাপন করতে পারবে।

নাসিরের প্রতিবেশী পারুল বলেন, আমাদের নাসির প্রতিবন্ধী। সে খেলাধুলা করে। তার বোনও প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী হওয়াতে তার স্থায়ী কোন কর্মসংস্থান নাই। অনেক কষ্টে সে সংস্থার চালায়। তার যদি কোন চাকরী-বাকরি হলে খুবই ভালো হতো।

প্রতিবন্ধী কোটায় নাসিরের সরকারী চাকুরীর বয়স রয়েছে আর ৬ মাস। এখনো কোন স্থায়ী কর্মসংস্থান না হওয়ায় উদ্বিগ্ন তিনি। কেননা এ ৬ মাস পেরোলেই ‘পদক’ আর ‘সনদ’ ঘরে সাজিয়ে রাখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।

Print