পায়রায় জেগে উঠছে স্বপ্নের লেবুখালী সেতু

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

পায়রা নদীতে দ্রুত এগিয়ে চলছে দেশের চতুর্থ বৃহত্তম লেবুখালী সেতুর নির্মাণকাজ। কৃষিপ্রধান দক্ষিণাঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে লেবুখালী সেতুটি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নান্দনিক শোভামণ্ডিত এই সেতুটি দাঁড়িয়ে থাকবে ৩৫০টি পাইলের ওপরে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত ও পায়রাবন্দর কেন্দ্র করে সেতুটির রয়েছে আলাদা গুরুত্ব।

জানা যায়, ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের লেবুখালী এলাকায় পায়রা নদীতে ব্রিজ নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৬ সালের ২৪ জুলাই। ১৪৭০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৯ দশমিক ৭৬ মিটার প্রস্থ সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হবে ১ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। তৃতীয় কর্ণফুলী সেতুর আদলে এক্সট্রাডোজ ক্যাবল স্টেট পদ্ধতিতে ব্রিজটি নির্মাণ করছে চীনের প্রকৌশল সংস্থা লং জিয়ন রোড অ্যান্ড ব্রিজ কনস্ট্রাকশন কোম্পানি।

লেবুলখালী সেতুর অর্থনৈতিক গুরুত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ ও গ্রামীণ উন্নয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইকতিয়ার উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, কৃষিপণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। ব্রিজটির নির্মাণকাজ শেষ হলে দক্ষিণাঞ্চলে যোগাযোগ বিপ্লব ঘটবে।

তিনি বলেন, এতে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে একদিকে যেমন খরচ কমে যাবে, অন্যদিকে বৃদ্ধি পাবে গতিশীলতা। ফলে কৃষিনির্ভর দক্ষিণাঞ্চলে আসবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।

অধ্যাপক ইকতিয়ার উদ্দিন আরও বলেন, সেতুটি দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ উন্নয়নেও ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

লেবুখালী ফেরিঘাট এলাকায় যাত্রী আবদুল মান্নান বলেন, পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলে এবং লেবুখালী ব্রিজ চালু হলে কুয়াকাটা থেকে রাজধানীতে নির্বিঘ্নে যাতায়াত করা যাবে। ফলে যাত্রীদের সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে।

কয়েকজন নির্মাণ শ্রমিক ও বিদেশি প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্মাণকাজ নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। খুব দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে চলছে সেতুর নির্মাণকাজ।

বেড়েছে নির্মাণ ব্যয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়

বরিশাল-কুয়াকাটা সড়কে পায়রা নদীর ওপর লেবুখালী সেতুর ব্যয় কয়েক দফা বেড়েছে। শুরুতে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১৩ কোটি টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদ তিন দফা বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে এক হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা।

ব্রিজটির দুই পাশের প্রায় দুই কিলোমিটার ডাইভারশন সড়কটি খানাখন্দে ভরা। গত তিন বছর ধরে ওই সড়কে চলাচলে জনসাধারণের ভোগান্তির শেষ নেই।

বেহাল সড়কটিতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটলেও কর্তৃপক্ষের টনক নড়ছে না বলেও ভুক্তভোগীরা জানান।

তাদের মতে, মাত্র কয়েক কিলোমিটার ডাইভারশন সড়কের কাজ এইচবিবি (ইট দ্বারা) শুরু করলেও অদৃশ্য কারণে তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। অথচ ব্যয় বেড়েছে প্রায় তিন গুণ।এ কারণে বিদেশি ঋণও নিতে হয় সরকারকে।

লেবুখালী সেতু নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক নূরে আলম কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে বলেন, বর্তমানে মূল সেতুর ৬০ শতাংশ এবং পুরো প্রকল্পের ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। একটি পরিপূর্ণ ডিজাইনের ওপর কাজ করায় ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওই সেতুর কাজ শেষ করার আশা করছেন তিনি।

২০১৩ সালের ১৯ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১ হাজার ৪৭০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। উন্নয়ন সহযোগীদের পরামর্শক নিয়োগ ও দরপত্র দলিলে তাদের সম্মতি আদায়ে দেরি হওয়ায় ২০১৬ সালের এপ্রিলের আগে প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।

এ অবস্থায় প্রকল্পটির মেয়াদ প্রথমবার বাড়ানো হয় ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত। পরবর্তী দফায় ২০২১ সালের এপ্রিলের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

আবার নতুন করে পরিকল্পনা কমিশনের মাধ্যমে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

৪১৩ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলনে লেবুখালী সেতু নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৬ সালের এপ্রিলে। এর পর প্রকল্প প্রস্তাবের বিশেষ সংশোধনী এনে ব্যয় বাড়িয়ে ৪১৮ কোটি টাকা করা হয়।

২০১৬ সালে সংশোধন করে এক হাজার ২৭৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। নতুন করে আবারও ১৬৮ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। সেতুর কাঠামোর নকশার পরিবর্তন, নদী রক্ষণাবেক্ষণ কাজের ধরন পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত ১ দশমিক ১৪ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণের কারণে ব্যয় বাড়ানো হয়।

Print