এজাহার দায়েরে পুঠিয়ার সাবেক ওসির ভূমিকা সন্দেহজনক: বিচারিক অনুসন্ধান প্রতিবেদন

November 13, 2019 at 10:33 am

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি নুরুল ইসলাম হত্যার ঘটনায় এজাহার দায়েরে কারসাজির বিষয়ে পুঠিয়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাকিল উদ্দিন আহমেদের সন্দেহজনক ভূমিকা রয়েছে। ওই হত্যা মামলার এজাহার বদলে দেওয়ার অভিযোগে নিয়ে করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশে বিচারিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে এমন তথ্য এসেছে। ওই হত্যা মামলার এজাহার বদলে দেওয়ার অভিযোগে নিহত নুরুলের মেয়ে নিগার সুলতানা গত ৮ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট করেন।

এর প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ১৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রুল দিয়ে অভিযোগটি বিচারিক অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন। অনুসন্ধান করে রাজশাহীর চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ মেহেদী হাসান তালুকদারকে এ বিষয়ে ৪৫ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

ইতিমধ্যে চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ মেহেদী হাসান তালুকদার অনুসন্ধান প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছেন। এর একটি ফটোকপি সোমবার কাছে এসেছে। প্রতিবেদনের সিদ্ধান্ত অংশে বলা হয়, নুরুল ইসলামের মেয়ে নিগার সুলতানার দায়ের করা এজাহার গ্রহণ না করে কারসাজিমূলক এজাহার দায়েরের ক্ষেত্রে পুঠিয়া থানার সাবেক ওসি সাকিল উদ্দিন আহমেদের সন্দেহজনক ভূমিকা রয়েছে বলে অনুসন্ধান প্রতিবেদন মতে প্রতীয়মান হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি প্রত্যাশিত যে ন্যায়বিচারের দাবিতে পিতাহারা এক সন্তান থানা-প্রশাসনের সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও আন্তরিকতা পাওয়ার অধিকারী ছিলেন। যেটি দেখাতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ- প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। রিট আবেদনকারী নিগার সুলতানার পক্ষে গত ১৬ সেপ্টেম্বর আদালতে শুনানি করেছিলেন জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।

সেদিন জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেছিলেন, নুরুল ইসলামকে হত্যার ঘটনায় তাঁর মেয়ে নিগার গত ১১ জুন পুঠিয়া থানায় আবদুর রহমান ওরফে পটলসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে এজাহার দাখিল করেন। পরে ওসি সাকিল উদ্দিন এজাহার সংশোধন করতে বলেন। এর পর এজাহার সংশোধন করে দাখিল করা হয়। এ বিষয়ে পদক্ষেপ না নেওয়ায় নিহতের স্ত্রী রাজশাহীর আদালতে একটি মামলা করেন। তখন পুলিশ একটি এজাহার দাখিল করে।

এই এজাহার অনুসারে, গত ১১ জুন অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তবে আসামি হিসেবে ওই আটজনের নাম নেই। যে এজাহার নথিভুক্ত হয়েছে, তা নিগারের নয়। নিগারের দাখিল করা এজাহার বদলে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে কোনো ফল না পেয়ে নিগার রিটটি করেন। প্রতিবেদনে তিন সুপারিশ বিচারিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে আদালতের কাছে তিন দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে নিগার সুলতানার দায়ের করা এজাহারের কপিকে এজাহার হিসেবে রেকর্ড করার জন্য পুঠিয়া থানার ওসিকে নির্দেশ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

দ্বিতীয় সুপারিশ হচ্ছে, ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অপরাধ) মো. মাহমুদুল হাসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মু. মতিউর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পুঠিয়া) সার্কেল মো. আবুল কালাম সহিদ ও পরিদর্শক (তদন্ত) মহিনুল ইসলাম এবং সাবেক ওসি সাকিল উদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যথাযথ আদেশ প্রদান। তৃতীয় সুপারিশে থানায় এজাহার পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে রেকর্ডিং অফিসার কর্তৃক এজাহারকারীকে সময় ও তারিখ উল্লেখে প্রাপ্তি স্বীকার প্রদান করতে হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনের ভাষ্য, স্পষ্টভাবে দেখা যায়, গত ১১ জুন নিগার তাঁর বাবার হত্যার বিচার চেয়ে পুঠিয়া থানায় মামলা দায়ের করতে গেলে তৎকালীন ওসি তার সঙ্গে আইনানুগ আচরণ করেননি। এ ক্ষেত্রে এজাহার দায়েরের কারসাজির বিষয়ে ওসির ভূমিকা রয়েছে বলে স্বাভাবিকভাবে অনুমান করা যায়। তাঁর জবানবন্দিতে সম্পূর্ণ কার্যক্রম গ্রহণকালে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মাহমুদুল হাসান, মু. মতিউর রহমান ও মো. আবুল কালাম সহিদ ও পরিদর্শক মহিনুল ইসলামগণ উপস্থিত ছিলেন। ফলে এজাহার কারসাজির বিষয়ে তাঁরাও দায় এড়াতে পারেন না।

ঘটনার পূর্বাপরঃ রিট আবেদনকারীপক্ষ জানায়, গত ১১ জুন পুঠিয়ার কাঁঠালবাড়িয়া এলাকার একটি ইটভাটা থেকে পুঠিয়া উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি নুরুল ইসলামের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে তিনি গত ২৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সংগঠনের নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। গত ২৫ এপ্রিল নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়, যেখানে আবদুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জয়ী ঘোষণা করা হয়।

তবে ফলাফল নিয়ে রাজশাহীর আদালতে নুরুল ইসলামসহ অন্যরা মামলা করেন। নিহত নুরুল ইসলামের দাবি ছিল, তিনি ৬০২ ভোট পেয়েছেন, আবদুর রহমান পেয়েছেন ৫২০ ভোট। ওই মামলার ধারাবাহিকতায় গত ৯ জুন রাজশাহীর আদালত আবদুর রহমানসহ তিনজনের দায়িত্ব গ্রহণ ও কার্যক্রম পরিচালনা থেকে বিরত থাকতে নিষেধাজ্ঞা দেন, যা গত ১০ জুন বিবাদের প্রতি জারি হয়।

আর ১০ জুন রাতে নিখোঁজ হন নুরুল। পরদিন তাঁর লাশ পাওয়া যায়। এদিকে মঙ্গলবার আদেশের দিন থাকলেও রাজশাহীর পুলিশ সুপার ( এস. পি) শিশু আসামীকে গ্রেফতার ও মিডিয়ার সামনে স্বীকারোক্তির বিষয়ে কেন কথা বলেছেন এ বিষয়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে প্রতিবেদন না দেয়ায় আগামী রবিবার বিচারিক তদন্ত প্রতিবেদনসহ সার্বিক বিষয়ে আদেশের দিন ধার্য করা হয়েছে।

 

স/আর

Print