খেলাপি ঋণ : বছরে মাত্র ১৩ হাজার কোটি টাকা আদায়

October 10, 2019 at 3:22 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর করা মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে খুবই ধীরগতিতে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর করা ২ লাখ ৫৫ হাজারটি মামলার বিপরীতে আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত এক বছরে আদায় হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যা মোট আটকে থাকা অর্থের ৬ শতাংশ। একই সঙ্গে ঋণ আদায়ে খরচের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে।

মামলার বিপরীতে খেলাপি ঋণ আদায় পরিস্থিতির ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের করা একটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী নিয়োগ, আইনজীবীর সঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগাযোগ, আইনজীবীর চাহিদা অনুযায়ী নথিপত্রের জোগান, জামানতের দখল বজায় রাখা- এসব খাতে খরচ বাড়ার কারণে মামলার পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আইনি জটিলতার কারণে সঠিকভাবে মামলা পরিচালনা হচ্ছে না, ঋণখেলাপির সঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তাদের গোপন আঁতাত, সঠিকভাবে ঋণ না দেয়ায় ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত জামানত না থাকা, রাজনৈতিক প্রভাব- এসব কারণে মামলার নিষ্পত্তি হচ্ছে খুবই কম। আর মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় এর বিপরীতে অর্থ আদায়ও হচ্ছে না। এদিকে প্রতিবছরই নতুন করে হওয়া খেলাপি ঋণের বিপরীতে মামলা হচ্ছে। ফলে আদালতে খেলাপি ঋণের মামলার পাহাড় জমেছে।

মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে বাণিজ্যিক ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও আইন কমিশনের সমন্বয়ে গত জুনে একটি বৈঠক হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। বৈঠকে আইনি কাঠামো আরও জোরদার ও স্পষ্টীকরণের সিদ্ধান্ত হলেও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আইনি সংস্কার এবং আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত একাধিক কমিটি এ লক্ষ্যে কাজ করছে। তারা ইতিমধ্যে বেশকিছু সুপারিশও দিয়েছে। সেগুলো নিয়ে এখন কাজ হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ব্যাংকিং খাতে এখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে আরও ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণকে খেলাপি হিসেবে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। কিন্তু ব্যাংকগুলো এসব ঋণকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

এ ছাড়া অবলোপন করা হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকার ঋণ। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা আদায়ে ২ লাখ ৫৫ হাজারটি মামলা করেছে ব্যাংকগুলো।

সূত্র জানায়, এর বাইরে আরও অনেক খেলাপি ঋণ রয়েছে, যেগুলো খেলাপি হওয়ার যোগ্য হলেও তা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে না। এসব ক্ষেত্রে ব্যাংক কোনো অর্থ আদায় করতে পারছে না। তারপরও এগুলোকে নিয়মিত দেখানো হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর করা মামলার মধ্যে গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের বিরুদ্ধেই সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে। কৃষিঋণ নিয়ে যারা খেলাপি হয়েছেন তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে সার্টিফিকেট মামলা করে ব্যাংকগুলো। এখন পর্যন্ত এমন মামলার সংখ্যা ১ লাখ ৫৭ হাজারটি। অর্থাৎ মোট মামলার সাড়ে ৭৮ শতাংশই কৃষকের বিরুদ্ধে।

অথচ এর বিপরীতে আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ মাত্র ৫৩৩ কোটি টাকা, যা মোট অর্থের শূন্য দশমিক ২৭ শতাংশ। আর বড় খেলাপিদের কাছে আটকে থাকা প্রায় ১ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা আদায়ে করা হয়েছে ৯৮ হাজার মামলা। মোট মামলার মধ্যে বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে হয়েছে ২২ শতাংশ। অথচ এর বিপরীতে আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ প্রায় শতভাগ অর্থাৎ ৯৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

মোট মামলার মধ্যে অর্থ ঋণ আদালতে বিচারাধীন ৬২ হাজার ২০৪টি। এর বিপরীতে আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। ৫২১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলো দেউলিয়া আদালতে মামলা করেছে ১৬৫টি। ৪২ হাজার ৫৪ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায়ে দেওয়ানি আদালতে ব্যাংকগুলোর ঝুলে আছে ৩৫ হাজার ৫১৪টি মামলা। এর বাইরে উচ্চ আদালতে ৫ হাজার ৩৭৬টি রিট মামলা রয়েছে। এসব মামলায় আটকে আছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ২ লাখ কোটি টাকা আটকে রয়েছে।

এসব মামলার বিপরীতে আটকে থাকা অর্থের মধ্যে এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন- এই ছয় মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, যা খেলাপি ঋণের মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকগুলোকে আইনজীবীদের ফি বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৭ লাখ টাকা।

একইভাবে গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর- এই ছয় মাসে ব্যাংকগুলো আদায় করেছে মাত্র ৮ হাজার কোটি টাকা, যা খেলাপি ঋণের মাত্র ৪ শতাংশ। ওই সময়ে আইনজীবীদের ফি বাবদ পরিশোধ করেছে সাড়ে ৬ লাখ টাকা।

Print