ও নাটক করতাছে: আবরারকে কাতরানো দেখে ছাত্রলীগ নেতার ঔদ্ধত্য

October 10, 2019 at 12:24 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ছাত্রলীগ ডেকে নিয়ে মারধরের পর মুমূর্ষু অবস্থায় কাতরাতে থাকেন। এ সময় হামলাকারী এক ছাত্রলীগ বলে ওঠে, ‘ও (আবরার) নাটক করতাছে’।

এভাবে ছটফট করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন আবরার। তার মৃত্যু নিশ্চিত জেনে সটকে পড়ে ছাত্রলীগ নেতারা। এর মিনিট চারের পরেই শেরেবাংলা হলের ওই কক্ষে যায় আবরারের রুমমেট আরাফাত ও মহিউদ্দিন। তারা গিয়ে দেখেন আবরারের শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। তাদের আক্ষেপ আর মিনিট পাঁচেক আগে গেলে হয়তো আবরারকে হাসপাতালে নেয়া যেত, তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা যেত।

বুধবার আবরার হত্যার বিচার দাবিতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ চলাকালে ছাত্রলীগের হামলায় আবরারের মৃত্যুর এ বর্ণনা দেন বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ছাত্র আরাফাত ও মহিউদ্দিন। এ সময় তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

মহিউদ্দিন জানান, আবরারকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পিটিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রেখে যাওয়ার পর তিনি তাকে দেখেন কাতরানো অবস্থায়। মহিউদ্দিন বলেন, আবরারকে কাতরানো অবস্থায় দেখার সময় এক ছাত্রলীগ নেতা বলছিলেন, ‘ও নাটক করতাছে।’ এ রকম পরিস্থিতিতে তাকে বাঁচাতে না পারায় মহিউদ্দিনের এখন আফসোস হচ্ছে।

আর আরাফাত যখন আবরারকে দেখেন, তখন তার পুরো শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। আরাফাত আফসোস করে বললেন, তিন-চার মিনিট আগে তিনি যদি সেখানে উপস্থিত হতে পারতেন, তা হলেও হয়তো আবরারকে বাঁচানো যেত।

আরাফাত বলেন, পড়া শেষে রাতে নিচে খাবার আনতে বেরিয়েছিলাম। তখনই দেখি তোশকের মধ্যে একজন পড়ে আছেন। তখনও আমার চিন্তায় আসেনি এ রকম হতে পারে। আমার ধারণা হয়েছিল, হয়তো কেউ মাথা ঘুরে পড়ে গেছে।

আরাফাত বলেন, ‘খোদার কসম, এক সেকেন্ডের জন্যও মাথায় আসেনি এভাবে কাউকে মারা হতে পারে।’ আরাফাতের ভাষ্য- ‘যখন আবরারের হাত ধরি, তখন হাত পুরো ঠাণ্ডা, পা ঠাণ্ডা। শার্ট-প্যান্ট ভেজা। তোশক ভেজা। মুখ থেকে ফেনা বের হচ্ছে।’

তিনি বলছিলেন, ‘তখন ওকে বাঁচানোর জন্য বুকে চাপ দিই। হাতে চাপ দিই। আশপাশের সবাইকে বলি, কেউ একজন ডাক্তারকে ম্যানেজ কর। এর পর ডাক্তার এলো। ডাক্তার দেখে বললেন, ১৫ মিনিট আগেই সে (আবরার) মারা গেছে।’

আফসোস করে কাঁদতে কাঁদতে আরাফাত বলছিলেন, ‘তিন-চারটা মিনিট আগে যদি খাবার আনতে যাইতাম, তা হলে পোলাডারে বাঁচাইয়া রাখতে পারতাম। এই তিন মিনিটের আফসোসে তিন দিনে তিন ঘণ্টাও ঘুমাইতে পারি নাই।’

আরাফাত এ বক্তব্য দেয়ার পর মহিউদ্দিন কথা বলেন। মহিউদ্দিনের ভাষ্য- ‘আরাফাতের তো তিন মিনিটের আফসোস আছে, আর আমার আছে অনুতাপ।’

আবরারকে ফেলে রাখার দৃশ্য দেখার বর্ণনা দিয়ে মহিউদ্দিন বলেন, তখন আড়াইটার মতো বাজে। আমি পড়া শেষে খেতে বের হয়েছি। তখন দেখেন আবরার কাতরাচ্ছেন। তখনও ছাত্রলীগ নেতা জিয়ন বলছিলেন, ‘ও (আবরার) নাটক করতাছে।’

নিষ্ঠুরতার এই বর্ণনা দিতে দিতে মহিউদ্দিন আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, ‘আমি ওরে বাঁচাইতে পারিনি। মাফ করে দিস, ভাই। আমারে সবাই মাফ কইরা দিস। আমি জীবিত দেইখাও ওরে বাঁচাইতে পারি নাই।’

প্রসঙ্গত এর আগে ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় খুন হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে। ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করে শনিবার বিকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন ফাহাদ। এর জের ধরে রোববার রাতে শেরেবাংলা হলের নিজের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে ২০১১ নম্বর কক্ষে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পিটুনির সময় নিহত আবরারকে ‘শিবিরকর্মী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায় খুনিরা।

তবে আবরার কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না বলে নিশ্চিত করেছেন তার পরিবারের সদস্যসহ সংশ্লিষ্টরা।

হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ না রাখতে সিসিটিভি ফুটেজ মুছে (ডিলেট) দেয় খুনিরা। তবে পুলিশের আইসিটি বিশেষজ্ঞরা তা উদ্ধারে সক্ষম হন। পুলিশ ও চিকিৎসকরা আবরারকে পিটিয়ে হত্যার প্রমাণ পেয়েছেন।

এ ঘটনায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলসহ ১৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

এ ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে তার বাবা চকবাজার থানায় সোমবার রাতে একটি হত্যা মামলা করেন। বুয়েট কর্তৃপক্ষ একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। পাশাপাশি গঠন করেছে একটি তদন্ত কমিটিও।

এদিকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলায় বুয়েট শাখার সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১১ জনকে ছাত্রলীগ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।

Print