গোদাগাড়ীতে কেঁচো সার ব্যবহারে লাভবান কৃষক

September 23, 2019 at 9:19 pm

শামসুজ্জোহা বাবু, গোদাগাড়ীঃ

গবাদী পশু, গরু ,ছাগলের বিষ্ঠা কাজে লাগিয়ে কেঁচো কম্পোস্ট (ভার্মি কম্পোস্ট) অর্থাৎ জৈব সার তৈরী করে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে অল্প খরচে জমি চাষাবাদে লাভবান হয়েছেন বেশ কিছু গোদাগাড়ী উপজেলার কৃষক। কেঁচো যে সকল খাবার গ্রহণ করে তা কেঁচোর পরিপাকতন্ত্র হয়ে যে বর্জ্য বের হয়ে আসে তাই ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার।

এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, কার্যকর ও উন্নত মানের পরিবেশবান্ধব জৈব সার যা ১০০ অর্গানিক। এরমধ্যে গাছের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদানের অধিকাংশই বিদ্যমান। এটি মাটিকে নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ করে এবং মাটিতে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদান গাছের জন্য সহজলভ্য করে। এটি গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং রোগ-বালাই ও পোকার আক্রমণ প্রতিরোধ করে। কেঁচো সার ব্যবহারে মাটির ভৌত, জৈব ও রাসায়নিক গুন উন্নত হয় এবং পানি ধারণ ক্ষমতা ও সেচের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।

উপজেলার ফরমান আলী পেশায় একজন চাকুরিজীবী সে মৎস্য বিভাগে ডেনিডা প্রজেক্টে ষ্টোর কিপার পদে কর্মরত ছিলেন সে সুবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে চাকুরী করে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জন করে। তার শখ ছিল একটি গরু খামার করব। গত বছর চাকুরী জীবন শেষ করে উপলোর গোদাগাড়ী ইউনিয়নে শিমলা এাকায় একটি ছোট গরু খামার গড়ে তুলেন সে খামারে লাভবান হওয়ার পর তিনি চিন্তা করলেন গরুর বর্জ্য থেকে কি করা যায়।

তিনি ময়মনসিং জেলায় কৃষি বিশ্ব বিদ্যালয়ে গিয়ে কেঁচো থেকে জৈব সার উৎপাদনের প্রক্রিয়া দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজ গ্রামে পরিক্ষামূলক ১ কেজি ৭০০ গ্রাম কেঁচো ক্রয় করে কেঁচো কম্পোস্ট (ভার্মি কম্পোস্ট) সার তৈরী করে সফল হয়। পরে ৩০ কেজি কেঁচো ক্রয় করে প্রতি মাসে ২০-৩০ মণ জৈব সার উৎপাদন হচ্ছে। প্রতিমণ সার ৬০০-৭০০ টাকা। এই সার তৈরী করতে ১ মাস সময় লাগে । একটি কেঁচো বাচ্চা দেই ৪-৫ টি ,একটি কেঁচোর স্থায়ীত্বকাল ৩ মাস। এভাবে তিনি ভার্মি কম্পোস্ট সার তৈরী করে এলাকার কৃষকদের ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

তার ছোট ভাই এনামুল এই সার ব্যবহার করে লাভবান হলে অন্য কৃষকেরা উদ্বুদ্ধ হয়ে এই সার ক্রয় করে পেয়ারা বাগানের মালিক আব্দুল জাব্বার মাল্টা বাগানের স্বপন ,ধানী জমিতে সাইদুল এবং পটলের জমিতে অনেক কৃষক ব্যবহার করে লাভবান হয়েছে। এতে এই সারের চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় আরও ১ বিঘা জমির উপর এই সার তৈরীর কারখানা বৃদ্ধি করা হচ্ছে আগামী মাসে এর চেয়ে ৩-৪ গুণ সার উৎপাদন বৃদ্ধি হবে। কৃষি কর্মকর্তা বা কারিগরি সহায়তা পেলে উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব।

ফরমান আলী বলেন, কেঁচো কম্পোস্ট (ভার্মি কম্পোস্ট) আমরা নিজেই বাড়িতে তৈরি করতে পারি কিছু সাধারণ উপকরণ দিয়ে। এখনো কৃষিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাসায়নিক সার ব্যবহৃত হয়। যা দেশের ভারসম্য নষ্ট হচ্ছে । তবে বর্তমানে আমাদের দেশে স্বল্প পরিসরে কেঁচো কম্পোষ্ট (ভার্মি কম্পোষ্ট) এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই সার তৈরীর কৌশল দেখে অনেকে তৈরী করবে এবং এর প্রভাব গোটা উপজেলায় পড়ুক এটায় আমার কাম্য।

কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্র মতে কেঁচো একটি অন্যতম উপকারী প্রাকৃতিক ক্ষুদ্র প্রাণী। কেঁচো কম্পোস্ট একটি জৈব সার। জমির উর্বরতা বাড়াতে এ সার ব্যবহার করা হয় । গোবর, লতাপাতা, গাছের পাতা, খড়, পচনশীল আবর্জনা ইত্যাদি খেয়ে কেঁচো মল ত্যাগ করে এবং এর সাথে কেঁচোর দেহ থেকে রাসায়নিক পদার্থ বের হয়ে কেঁচো কম্পোস্ট তৈরি হয়। বর্তমানে এ সার ফসল উৎপাদনে এবং জমির স্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যাপক সাফল্য এনেছে। যে কোনো ব্যক্তি কেঁচো কম্পোস্ট উৎপাদন ও বিক্রি ব্যবসা শুরু করে বাড়তি আয়ের পথ প্রসার করতে পারেন।

প্রথমে গরু, ছাগলের বর্জ্য সংরক্ষণ করতে হবে সেগুলো ১ মাস জমা করে রাখলে ভাল তারপর স্যানিটারি রিং এর ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী পরিমাণমত কাঁচা গোবর সংরক্ষণ করতে হবে।সংগৃহীত কাঁচা গোবর গাঁদা করে পলিথিন অথবা পলিথিনের বস্তা দিয়ে ছায়া যুক্ত স্থানে মাটির উপরে অথবা মাটিতে গর্ত করে ৬-৮ দিন ঢেকে রাথতে হবে।এরপর কোদাল অথবা বেলচা দিয়ে উক্ত মাটিগুলো উলট-পালট করে দিতে হবে যাতে করে গোবরে ৪০-৫০% আদ্রতা থাকে।

যদি আদ্রতা না থাকে তাহলে গোবরের উপরে হালকা করে পানি ছিটিয়ে দিতে হবে। এভাবে ওলট-পালট করতে করতে যখন গোবর কালচে রং ধারন করবে এবং গোবরের কাঁচা গন্ধ বা ঝাঁঝালো গন্ধ বের হয়ে যাবে ঠিক তখন মনে করতে হবে স্যানিটারি রিং বা চারিতে ঢালার জন্য উপযোগী হয়েছে। এবার পঁচানো গোবর স্যানিটারি রিং বা চারিতে ঢালতে হবে।লক্ষ্য রাখতে হবে যেন স্যানিটারি রিং বা চারিতে কমপক্ষে দুই ইি পরিমান খালি থাকে। তা না হলে রিং বা চারি হতে কেঁচোগুলো বের হতে পারে।


প্রতি ১৫০ কেজি গোবরে নির্দিষ্ট প্রজাতির প্রায় ২০০০ টি কেঁচো দিতে হবে। পরবর্তীতে স্যানিটারি রিং বা চারিকে মশারি বা নেট দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। কেননা কেঁচোর অন্যতম শত্রু যেমন-পিঁপড়া, মুরগি, উইপোকা, ইঁদুর ও তেলাপোকা ইত্যাদির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মশারি বা নেট জাঁল দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। কেঁচোর প্রধান শত্রু লাল পিঁপড়া। কেঁচোর ডিমগুলোকে লাল পিঁপড়া হাত থেকে রক্ষা করার জন্য পরিমাণ মতো মরিচের গুড়া, হলুদের গুড়া, ডিটারজেন্ট পাউডার এবং লবণ একত্রে মিশিয়ে স্যানিটারি রিং বা চারির চারপাশে বর্ডারের মত করে দিতে হবে। যাতে করে লাল পিঁপড়া কেঁচোর ডিমগুলোকে আক্রমণ করতে না পারে। সঠিকভাবে যতœ নিলে ৩০ দিনের মধ্যে কেঁচো সার প্রস্তুত হয়ে যাবে। এছাড়া অন্যান্য কম্পোস্টের চেয়ে কেঁচো কম্পোস্টে প্রায় ৭-১০ ভাগ পুষ্টিমান বেশি থাকে যা মাটির স্বাস্থ্য ভাল রাখতে এবং ফসল উৎপাদনে সহায়ক ভুমিকা পালন করে। গবেষণায় দেখা গেছে একটি আদর্শ ভার্মি কম্পোস্ট ১.৫৭% নাইট্রোজেন, ২.৬০% পটাশ, ০.৬৬% ম্যাগনেশিয়াম, ১.২৬% ফসফরাস, ০.৭৪% সালফার, ০.০৬% বোরণ রয়েছে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার মতিয়র রহমান বলেন, কেঁচো কম্পোস্ট (ভার্মি কম্পোস্ট) মাটিকে সমৃদ্ধ করে ও মাটির পুষ্টিমান বৃদ্ধি করে।কেঁচো কম্পোস্ট মাটিতে পুষ্টি উপাদান যুক্ত করে এবং বেলে মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।মাটিতে উপকারী অনুজীবের কার্যক্রম বৃদ্ধি করে এবং সবজি ফসলে মালচিং এর কাজ করে।কম্পোস্ট সার মাটির ভৌত রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাগুণ বৃদ্ধি করে।এ সার ব্যবহারে পানির অনুপ্রবেশ ও শিকড়ের বৃদ্ধি ঘটে এবং মাটিতে বায়ু চলাচল বাড়ে।এ সার ব্যবহারে মাটির গঠন উন্নত হয় এবং উৎপাদিত ফসলের গুণগতমান ভালো হয়। তিনি আরও বলেন কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারে কম খরচে অনেক বেশি ফসল ফলানো যায়, উৎপাদিত ফসলের গুণগত মান ভালো হয় এবং জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়।

স্থানীয় কৃষকেরা বলেন,পেয়ারা, বরই, মাল্টা, পেঁপে বাগান ০-১ বছরের গাছের জন্য গাছপ্রতি ৫০০ গ্রাম এবং ফলবান গাছের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ কেজি ফল ধারণ ক্ষমতার জন্য দুই কেজি সার ৩ বারে প্রয়োগ করতে হবে।সাথে প্রতিবার ১৫০- ২০০গ্রাম রাসায়নিক সার (পটাশ- ডিএপি অথবা পটাশ-টিএসপি-ইউরিয়া) প্রয়োগ করতে হবে। সার ছিটানোর পর তা মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে। ধানজমি প্রথম ভাঙ্গার সময় বিঘাপ্রতি ২৫ কেজি কেঁচো সার প্রয়োগ করতে হবে। সাথে পরিমাণমতো রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে।ছাদ বাগানে কেঁচো সারছাদবাগানে ব্যবহারের জন্য সহজ এবং উত্তম জৈব সার হচ্ছে এই কেঁচো সার বা জৈব সার ভার্মি কম্পোস্ট। ভার্মি কম্পোজ ব্যবহারে ফসলের উৎপাদন অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়। রাসায়নিক সারের ব্যবহার অর্ধেকেরও কম করতে হয়। ভার্মি কম্পোস্ট কেঁচো সার একটি সম্পূর্ণ জৈব সার। এই সার মাটির স্বাস্থ্য ভালো করে ও মাটিকে উর্বর করে তুলে। ফসলের বর্ণ গন্ধ স্বাদ ও অন্যান্য গুণগত মান উন্নায়নে সহায়তা করে।

স/অ

Print