বীমা খাতে হয়রানির ফাঁদ, স্বল্প সময়ে ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা দিতে হবে

বীমা কোম্পানিগুলো শুধু প্রিমিয়ামের কিস্তি নিতে ব্যস্ত ক্ষতিপূরণের বেলায় ইচ্ছেমতো হয়রানি

September 16, 2019 at 11:13 am

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

শুধু বীমার আওতা বাড়ালে হবে না, আগে দরকার যথাসময়ে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার নিশ্চয়তা। কেননা দেশের অর্থনীতিতে চরম হয়রানির নাম বীমা খাত।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য আইনে বীমা বাধ্যতামূলক থাকায় উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে উচ্চ প্রিমিয়াম নেয় কোম্পানিগুলো। কিন্তু শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে বছরের পর বছর ঘুরেও ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় না। জীবন বীমার অবস্থা আরও খারাপ।

ফলে সামগ্রিকভাবে বীমা কোম্পানির প্রতি সাধারণ মানুষের এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এ কারণে দেশের শিল্পায়নের বিকাশে স্বল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। সামগ্রিকভাবে বীমা খাতের সংস্কার করতে হবে।

দেশের অর্থনীতিবিদ, বীমা বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেন। তাদের মতে, সুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়াতে বিদেশি কোম্পানিগুলোর অনুমোদন দিতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বীমা কোম্পানির মালিকরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। ফলে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথোরিটির (আইডিআরএ) কর্মকর্তারাও তাদের কাছে অসহায়।

বীমা খাতের চেয়ারম্যান ও এমডিদের সঙ্গে রোববার এক মতবিনিময় সভায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, যেসব বাড়ি, ফ্ল্যাট, অফিস ভবন ও গাড়ি এখনও বীমার আওতায় আনা হয়নি সেগুলোকে অবশ্যই বীমাভুক্ত করতে হবে।

এমন মন্তব্য শোনার পর অনেকে ফোন করে ও সরাসরি তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু জোকের মতো প্রিমিয়ামের কিস্তি হাতিয়ে নিতে চায়। কিন্তু ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয় সামনে এলে হয়রানির সব পথ বেছে নেয়।

তাই বীমার আওতা বাড়ানোর আগে সরকারকে সময়মতো ক্ষতিপূরণের টাকা বুঝে পাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। তা না হলে এটি হবে জনগণের পকেট সাবাড় করার আরেকটি হতিয়ার।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, এমনিতেই দেশের বীমা খাতের ভাবমূর্তি নেতিবাচক। তারা যথাসময়ে গ্রাহকের দাবি পূরণ করে না। ফলে এখানে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। মানুষ বাধ্য না হলে বীমা কোম্পানির কাছে যেতে চায় না।

সামগ্রিকভাবে এতে বীমা শিল্পের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি উপলব্ধি করে সরকার, বীমা কোম্পানি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারকে কঠোর হতে হবে। বিশেষ করে কোনোভাবেই অপরাধীদের ছাড় দেয়া যাবে না এবং বীমাকারী ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি যাতে খুব দ্রুত পেতে পারেন সে বিষয়ে সরকারকে নিশ্চয়তা দিতে হবে।

জানা গেছে, বিদ্যমান আইনে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য বীমা বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে রয়েছে অগ্নি বীমাসহ বিভিন্ন ঝুঁকি বীমা। আর এজন্য বীমা কোম্পানিকে মোটা অংকের প্রিমিয়াম দিতে হয়। এক্ষেত্রে কোম্পানিতে আগুন লাগাসহ অন্য কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বীমা কোম্পানির পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা।

বিদ্যমান আইনে কোনো গ্রাহকের বীমা দাবি উত্থাপন হলে সার্ভে রিপোর্ট হাতে পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে ওই দাবি পরিশোধ করা বীমা কোম্পানির জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু গ্রাহকের দাবি পূরণের ক্ষেত্রে বীমা কোম্পানির হয়রানি ও প্রতারণা নিয়মিত ঘটনা। ক্ষতিপূরণের প্রাপ্য টাকা পরিশোধ না করে নানা রকম টালবাহানা করে কোম্পানিগুলো।

নানা অজুহাতে গ্রাহকের পাওনা টাকা না দিয়ে বেশিরভাগ কোম্পানি হয়রানি ও প্রতারণা করে। বীমা খাতে ইতিমধ্যে এটি প্রতিষ্ঠিত। কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে শত শত অভিযোগ জমা আছে। এসব কোম্পানির মালিকরা অত্যন্ত প্রভাবশালী হওয়ায় আইডিআরএর পক্ষ থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। এ কারণে ভুক্তভোগীরা বাধ্য হয়ে আদালতেও যাচ্ছেন। এতে করে অনেকে দীর্ঘসূত্রতার ফাঁদে পড়ে যান।

কিন্তু ইউরোপ, আমেরিকা, সিঙ্গাপুর এবং জাপানের মতো উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতিতে ব্যাংকের চেয়ে শক্তিশালী খাত হল বীমা। এসব দেশে ব্যাংক গ্যারান্টির চেয়ে বীমা গ্যারান্টিকে বেশি মূল্যায়ন করা হয়। ওই সব দেশে প্রতিটি বীমা কোম্পানির একটি হটলাইন রয়েছে।

আবেদনের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও কম সময়ে ক্ষতিপূরণ বুঝিয়ে দেয়া হয়। অথচ আমাদের দেশে বীমার প্রিমিয়াম নেয়ার জন্য সবাই ব্যতিব্যস্ত। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটলে আর টাকা দেয়ার খবর থাকে না।

জীবন বীমার অবস্থা আরও ভয়াবহ। পলিসির মেয়াদ শেষ হলেও প্রায় ২৫ হাজারের গ্রাহকের টাকা পাওনা রয়েছে। এর মধ্যে ৬ হাজার গ্রাহকের টাকা পরিশোধ করছে না ৫ জীবন বীমা কোম্পানি। গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স, বায়রা লাইফ, সানলাইফ, হোমল্যান্ড লাইফ এবং সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি এ কাজ করছে।

টাকার দাবিতে গ্রাহকরা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থায় অভিযোগ করেছেন। জমানো টাকা ফিরে পেতে প্রতিদিনই তারা আইডিআরের অফিসে ভিড় করছেন। সর্বশেষ কোম্পানিগুলোকে টাকা পরিশোধের জন্য সর্বোচ্চ ২ মাস দেয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোম্পানিগুলোর মালিকরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। মালিক পক্ষের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) নেতৃত্বেও আছেন এরা। তাই তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া যাচ্ছে না।

জানতে চাইলে আইডিআরের সদস্য গকুল চাঁদ দাস বলেন, দাবি পূরণে সমস্যা আছে। তবে অগ্রগতি হচ্ছে। তিনি বলেন, সাধারণ বীমার ক্ষেত্রে সমস্যা সার্ভে রিপোর্ট। সার্ভেয়াররা কী রিপোর্ট দিচ্ছে, তা ক্ষতিপূরণের আবেদনকারীরা জানেন না। যখন রিপোর্ট দেয় তখন দাবির সঙ্গে তারা একমত হতে পারেন না। এতে সমস্যা তৈরি হয়। আর জীবন বীমার ক্ষেত্রে কয়েক কোম্পানির দাবি পূরণের সক্ষমতা নেই। এসব দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অর্থমন্ত্রী আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে যারা দাবি পূরণ করতে পারবে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আইন অনুসারে কোম্পানিগুলোর আদায় করা গ্রস প্রিমিয়ামের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত এজেন্ট কমিশন দেয়া যায়। কিন্তু বেশিরভাগ কোম্পানির কোনো এজেন্ট নেই। এক্ষেত্রে ভুয়া এজেন্ট দেখিয়ে কমিশনের টাকা কর্মকর্তারা ভাগবাটোয়ার করে নেন। আইডিআরএ সূত্র জানায়, বীমা কোম্পানির এজেন্ট যাচাইয়ে ২ বছর এদের কাছে এজেন্টের বায়োডাটা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু বেশিরভাগ কোম্পানি এজেন্টদের বায়োডাটা দিতে পারেনি। অর্থাৎ ভুয়া এজেন্ট দেখিয়ে এজেন্টদের টাকা কোম্পানির কর্মকর্তারা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন।

জানতে চাইলে কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, বীমা খাতে কিছু অনিয়ম রয়েছে। কোম্পানিগুলো দাবির টাকা পরিশোধ করতে চায় না। এটি অস্বীকার করা যাবে না। তবে এটি কমছে। তিনি বলেন, বেশ কিছু ভালো কোম্পানি রয়েছে। তারা গ্রাহকের টাকা নিয়মিত পরিশোধ করছে। তিনি বলেন, যেসব কোম্পানি দাবি পরিশোধ করে না, তারাই এ খাতের বদনাম ছড়াচ্ছে। এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

জানা গেছে, ক্ষমতা বিবেচনায়ও দেশের অন্যান্য খাতের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে এ খাত। দক্ষ জনবল নেই, প্রয়োজনীয় এবং হালনাগাদ আইন নেই। সরকারের প্রয়োজনীয় নজরদারিও নেই। ফলে চরম স্বেচ্ছাচারিতা চলছে এ খাতে। উদ্যোক্তারাও তা স্বীকার করছেন। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে ৭৮টি বীমা কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে জীবন বীমা ৩২টি এবং সাধারণ বীমা ৪৬টি।

Print