আ.লীগ প্রতিহিংসার রাজনীতি করলে বিএনপির অস্তিত্ব থাকত না

September 11, 2019 at 10:34 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করলে এ দেশে বিএনপির অস্তিত্ব থাকত না। আজ বুধবার জাতীয় সংসদে বিএনপির নারী সাংসদ রুমিন ফারহানার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ মানুষ হত্যার রাজনীতি করে না। প্রতিহিংসার রাজনীতিতেও বিশ্বাসী নয়। আমরা যদি তা–ই বিশ্বাস করতাম, তাহলে এদেশে বিএনপির অস্তিত্ব থাকত না। কারণ বিএনপির দ্বারা আমরা যে পরিমাণ হত্যা, নির্যাতন, নিপীড়নের শিকার হয়েছি, তা আর কেউ হয়নি।’

তারকা চিহ্নিত প্রশ্নে বিএনপির সাংসদ রুমিন ফারহানা বলেন, দেশে এখন মানুষ হত্যা থেকে মশা মারা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার প্রয়োজন হয়, যা রাষ্ট্রের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়া, অকার্যকর হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। প্রাতিষ্ঠানিক সফলতা একটি কার্যকর রাষ্ট্রের পূর্বশর্ত। রুমিন প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, এই অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলো কি রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের সার্বিক ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে না?

জবাবে এই প্রশ্নকে অনাকাঙ্ক্ষিত, অসংসদীয় ও অবান্তর প্রশ্ন হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সংসদ সদস্য ‘মানুষ হত্যা’ আর মশা মারাকে একই সমতলে নিয়ে এসেছেন।

শেখ হাসিনা বলেন, সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারপ্রধানের অন্যতম কাজ এবং দায়িত্ব হলো সব মন্ত্রণালয়-বিভাগের কাজের সমন্বয় করা। মন্ত্রীদের কাজের তদারকি করা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণ আমাকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছেন তাঁদের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য। আরাম-আয়েশের জন্য আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করিনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে জনগণের প্রতি আমার দায়বদ্ধতার একটি আলাদা জায়গা রয়েছে। সেটাই আমি প্রতিপালন করার চেষ্টা করি। সেই জন্যই দিনরাত পরিশ্রম করি। কোনো প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করার জন্য নয়, সব প্রতিষ্ঠানকে আরও সক্রিয় রাখার জন্য সর্বদা সচেষ্ট রাখি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাষ্ট্রযন্ত্র কাজ করছে বলেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তা না করে সংসদ সদস্যের (রুমিন ফারহানা) নেত্রী খালেদা জিয়ার মতো দুপুর ১২ পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটালেই কি প্রশ্নকারী খুশি হতেন?’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অকার্যকর রাষ্ট্রের উদাহরণ বিএনপি সৃষ্টি করেছিল। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসত রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, এমন ব্যক্তির কাছ থেকে। প্রধানমন্ত্রী ঘুমিয়ে থাকতেন, সিদ্ধান্ত নিতেন তাঁর পুত্র, হাওয়া ভবন থেকে। মন্ত্রী-সচিবেরা হাওয়া ভবন থেকে নির্দেশের অপেক্ষায় প্রহর গুনতেন।

বিভিন্ন খাতে উন্নয়নের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আর্থসামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেল, দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি প্রবৃদ্ধিতে বিশ্বসেরার জায়গা করে নিয়েছে। এসব আপনাআপনি হয়নি। সবার পরিশ্রমে হয়েছে। প্রতিষ্ঠান অকার্যকর থাকলে এসব অর্জন সম্ভব হতো না।

শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান জাতির জনক বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের সদস্যদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে খুনিদের সহায়তায় ক্ষমতায় বসেছিলেন। দেশে হত্যা, ক্যু, অপরাজনীতি শুরু করেন। ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাটের সংস্কৃতি চালু করেন। একটা পুরো প্রজন্মকে নষ্ট করে দেন জিয়াউর রহমান। এ কারণে বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্যের মুখে মানুষ মারার বিষয়টি অবলীলায় চলে আসে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের চেয়েও তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া এক কাঠি সরেস, সে প্রমাণ তিনি রেখেছেন। এদেশে জঙ্গি সৃষ্টি, অগ্নি সন্ত্রাস, বোমা হামলা, মানি লন্ডারিং, এতিমের টাকা আত্মসাৎসহ হেন অপকর্ম নেই যে তিনি ও তাঁর দুই পুত্র এবং দলের নেতারা করেননি। এ সকল ধারণা থেকেই প্রশ্নকারী আমাকে খালেদা জিয়ার সমান্তরালে ফেলেছেন।’

তিস্তার আলোচনা হবে ভারত সফরে
সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির মুজিবুল হকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিতে বাংলাদেশ যাতে ন্যায্য হিস্যা পায়, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং সতর্কতা গ্রহণ করা হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি প্রবাহ হ্রাসের বিষয়ে উদ্বেগ ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে এবং এটি সুরাহার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পানির প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য ভারতের সঙ্গে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত আছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে এখনো তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব হয়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তিস্তা পানিবণ্টন সমস্যা সমাধানে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। তাঁদের সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। আগামী অক্টোবরে ভারত সফরের সময়ও প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন।

ডেঙ্গু নিয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান
জাতীয় পার্টির সাংসদ রুস্তম আলী ফরাজীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সারা বিশ্বে বিশেষ করে উষ্ণমণ্ডলীয় ১২৭টি দেশে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ ও প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। বাংলাদেশেও এ বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধে ও রোগীদের চিকিৎসায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এর পাশাপাশি জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বহুমুখী পদক্ষেপ ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

রুস্তম আলী ফরাজীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরির আহ্বান জানান। তিনি জনগণকেও নিজ নিজ ঘর ও আশেপাশের জায়গা পরিষ্কার রাখা এবং পানি যাতে জমে না থাকে, সে দিকে সচেতন থাকার পরামর্শ দেন।

প্রধানমন্ত্রী ঘুমান ৫ ঘণ্টা
গণফোরামের সাংসদ সুলতান মুহাম্মদ মনসুরের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেখানেই থাকি না কেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জনগণের ভালো–মন্দ দেখার দায়িত্ব আমার। আমি তো আর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ চালাই না। ১২টায় ঘুম থেকে উঠি না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৫ ঘণ্টা আমার ঘুমের সময়, বাকি সময়টায় আমি সর্বক্ষণিক চেষ্টা করি দেশের কোথায় কী হচ্ছে সেগুলি নজরে রাখার। এটাকে আমি নিজের কর্তব্য বলে মনে করি।’

‘আমি বিশ্ব নেতা না’
গণফোরামের সাংসদ মোকাব্বির খান সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বনেতা। তাঁর কন্যা শেখ হাসিনাও বিশ্বনেতা। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়টি কীভাবে হৃদয়ে ধারণ করেন, তা জানতে চান মোকাব্বির।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। তিনি সবকিছু ত্যাগ করে এদেশের মানুষকে সুন্দর জীবন দিতে চেয়েছিলেন। মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চেয়েছেন। তাঁকে হত্যার মধ্য দিয়ে উন্নয়নের ধারা স্তব্ধ হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত হলো, যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করেছিলেন, তা পূরণ করা। শেখ হাসিনা বলেন, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা, মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করাই তাঁর লক্ষ্য। তিনি কী পেলেন, সে চিন্তা করেন না। এটা ভাবার সময়ও নেই।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আর বিশ্ব নেতা আমি না। আমি অন্তত এটুকু বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই।’

রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে
সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ রুমানা আলীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার প্রশ্নে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। দ্বিতীয় দফায় ২২ আগস্ট ২০১৯ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তারিখ ঠিক করা হয়। যাবতীয় প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও কোনো রোহিঙ্গা ফিরে যেতে সম্মত না হওয়ায় প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি। তা ছাড়া জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের চাপে মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই করলেও তা বাস্তবায়নে যথেষ্ট গড়িমসি করে। বাংলাদেশের অব্যাহত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ শিগগিরই রাখাইন রাজ্যে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করবে এবং দ্রুত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

Print