বঙ্গমাতার স্বদেশ ভাবনা

August 8, 2019 at 12:42 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

আমি এমন এক মাতার কথা লিখছি যিনি না জন্মালে বাংলার ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে লেখা হতো। আমি এমন এক জননীর কথা বলছি যার অবদান লিখে শেষ করা যায় না। আমি সেই মহিয়সী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব কথা বলতে বলছি। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬৬ এর ছয়দফা, ৬৯ এর গণঅভ্যত্থান, ৭০ এ নির্বাচন, ৭১এর স্বাধীনতা আন্দোলন স্বদেশের জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে থেকে মানসিক শক্তি ও সাহস যুগিয়েছেন। বঙ্গমাতার ভাবনার জগত বিশাল। তাঁর চিন্তা ও আচরণের প্রত্যেকটি দিক দিয়ে ভাবনার সুযোগ রয়ে গেছে। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের স্বদেশ ভাবনাকে নির্দিষ্ট কোনো মাত্রায় আবদ্ধ করা সম্ভব নয়। তবে সামগ্রিকভাবে মোটাদাগে দুটি ভাগে বিভক্ত করে তাঁর স্বদেশ ভাবনাকে আলোচনা করা যায়। সামাজিক ও রাজনৈতিক। সামাজিক দিক দিয়ে তিনি ধর্মীয়, অনাথ-এতিম-দুঃখী মানুষের সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের আদর্শ আর ন্বপ্নের বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন এবং রাজনৈতিক দিক দিয়ে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিভৃত-নীরবে দেশের জন্য কাজ করে গেছেন। জগতে ছিলেন মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর। বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন বলেই ঘাতকরা তাঁকে স্বপরিবারে হত্যা করেছে। অনাথ-এতিম দুঃখী, কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা, গরীব-দুস্থ ও খেটে খাওয়া মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ এই জননী সুযোগ পেলেই সব সময় তাদের পাশে দাঁড়াতেন এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

সময় পেলেই বিভিন্ন এতিমখানায় যেতেন এবং সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। দলীয় নেতা-কর্মী, সাধারণ মানুষ পরিচিত-অপরিচিত, অত্মীয়-স্বজনের সুখ দুঃখের সঙ্গী ছিলেন তিনি। তাঁর কাছ থেকে সাহায্য চেয়ে কেউ কখনো খালি হাতে ফিরে যান নি। আমরা জননেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার লেখা থেকে জানতে পারি ছোটবেলায় লেখাপড়ার প্রতি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের অত্যন্ত আগ্রহ ও মনোযোগ ছিল। পরবর্তী জীবনে প্রচুর পড়াশুনা করতেন। তিনি বই-পুস্তক, কোরআন পড়ার পাশাপাশি পত্র-পত্রিকাও পড়তেন। প্রতিদিন দেশের কোথায় কী ঘটছে তার খবর রাখতে দৈনিক পত্রিকা থেকে। বঙ্গবন্ধুর সাথে কখনো কখনো সেই খবরগুলো বিনিময়ও করতেন সময় পেলেই। তাঁর স্মরণশক্তিও প্রখর ছিল।

দেশ-জাতি সম্পর্কে যেকোনো ঘটনায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বঙ্গবন্ধুর কাছে উপস্থাপন করতেন। বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি পদক্ষেপে এই মহিয়সী নারী সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নাদর্শকে বাস্তবায়ন করবার জন্য অবদান রেখেছেন পাহাড় সমান। জীবনে তাঁকে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেছেন। আমরা যদি বঙ্গমাতার সংগ্রামী জীবনের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো এর জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে তাকে। অনেক দুঃখ-কষ্ট ও দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মিথ্যা আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করার পর গোয়েন্দা-সংস্থা বেগম মুজিবকে কয়েকবার হয়রানিমূলক জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং গ্রেফতারের হুমকি দেয়। কিন্তু বঙ্গমাতাকে সাহস ও অসীম ধৈর্যের সাথে সেগুলো মোকাবিলা করতে হয়েছে। মিথ্যা আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন জেলে তখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মু্িক্ত দেয়ার প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব দৃঢ়তার সাথে বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, ‘কোনো অবস্থায় প্যারোলে মুক্তি নিয়ে তুমি শাসকদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিতে রাওয়ালপিন্ডি যাবে না’। সত্যিই বঙ্গবন্ধু সেদিন প্যারোলে মু্িক্ত নিয়ে বের হলে এদেশের ইতিহাস হয়তো অন্যরকম হতো। দেশের জন্য বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি না নেয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়ে বঙ্গমাতা তাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, দৃঢ়তা ও গভীর দেশপ্রেমের প্রমাণ দিয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা আন্দোলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই আন্দোলনে বঙ্গমাতার অবদান স্মরণীয় হয়ে আছে। ছয় দফা আন্দোলনের সময় তিনি নিজের অলঙ্কার বিক্রি করে সংগঠনের জন্য উদার হস্তে সাহায্য করেছেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যত্থানে শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের অবদান উল্লেখ করার মতো। ঊনসত্তরের গণঅভ্যত্থান সংগঠিত করবার জন্য জোর চেষ্টা চালিয়েছেন, অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। পুলিশ ও পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে গোপনে সংগঠনকে সংগঠিত করেছেন, ছাত্রদের নির্দেশ দিয়েছেন, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেছেন। রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা ও দেশের খবর বিনিময়ের জন্য বঙ্গবন্ধু তাঁর সহধর্মীর অনেক ক্ষেত্রে পরামর্শ করতেন। আমরা তাঁর সেই আকুতির প্রমাণ পাই যখন দেখি জেলখানা থেকে তাঁর জীবনসঙ্গিনীর সাথে সাক্ষাতের জন্য কারা কর্তৃপক্ষের কাছে অসংখ্য চিঠি লিখেছিলেন। যেকথাগুলো বঙ্গবন্ধুর অপ্রকাশিত চিঠিপত্রের ভেতরে পাওয়া যায়। স্বাধীনতা আন্দোলন চলাকালীন প্রতিটি ঘটনা জেলখানায় সাক্ষাতকারের সময় বঙ্গবন্ধুকে জানাতেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশ নিয়ে আসতেন। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদেরকে সেই নির্দেশ জানাতেন। বর্তমান প্রজন্মের আমরা অনেকেই হয়তো সেই ইতিহাস সম্পর্কে জানি না। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে কাপুরুষ পাকিস্তানি হানাদার (হায়েনা) বাহিনী গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।

২৬ মার্চ হানাদার-বাহিনী ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়ি আক্রমণ করে। শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব সন্তানদের নিয়ে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নেন। দেশের জন্য, আপামর মানুষের জন্য, নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য দিনের পর দিন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় লুকিয়ে লুকিয়ে দিন কাটান। পাশাপাশি তিনি ভেঙ্গে না পড়ে দেশের সমস্ত জনগণ এবং দলের নেতাকর্মীদের সংগঠিত হবার জন্য উৎসাহিত করেছেন। এসময় তিনি দেশের মানুষ ও মু্িক্তযোদ্ধাদের নিকট বঙ্গবন্ধুর নির্দেশসমূহ পাঠাতেন। অবশেষে বঙ্গমাতা মগবাজারের একটি বাড়ি থেকে পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। তাঁকে প্রচন্ড চাপ প্রদান করে, মানসিক অত্যাচার ও যন্ত্রণা ও মৃত্যুর হুমকি দেয় যাতে তিনি বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রত্যাহার করতে বলেন। কিন্তু বঙ্গমাতা উত্তরে বলেছেন, ‘আমি মারা যাব, তোমরা আমাকে, বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলতে পারো কিন্তু আমি আমার জনগণের দাবী এবং আমার প্রাণের দাবী স্বাধীনতা থেকে দুরে সরে যাব না’। দেশ স্বাধীন হবার পর ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ বঙ্গমাতা বন্দিদশা থেকে মুক্তি লাভ করেন। মুক্তিলাভের সাথে সাথে বাড়ির উপরে হানাদার বাহিনী কর্তৃক টাঙিয়ে রাখা পািকিস্তানি পতাকা ছিড়ে টুকরো টুকরো করে নিজ পা দিয়ে গুড়িয়ে মাড়ান এবং আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেন।

নিজেই জয় বাংলা স্লোগান দিতে শুরু করেন। এসময় হাজার হাজার বাঙালি জনতা বাড়িতে ছুটে আসতে থাকেন। তখনও বঙ্গমাতা জানেন না, তাঁর প্রাণপ্রিয় স্বামী পাকিস্তানের কারাগারে বেঁচে আছেন নাকি তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। এরকম বুক ভরা ব্যথা নিয়ে সেদিন তিনি মায়ের মতো করে সব জনতাকে অভিনন্দিত করে নিজের সন্তানদের ন্যয় দেশের সমস্ত জনগণকে নির্দেশনা প্রদান করেন। অথচ দুর্ভাগ্যের বিষয় এই জননীকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ঘাতকরা স্বপরিবারে হত্যা করে। আজকের কোনো মা যদি চোখ বন্ধ করে কল্পন করেন যে তাঁর স্বামীকে, তার সন্তানকে চোখের সামনে ঘাতকরা হত্যা করছে অতঃপর তাকেও তাহলে বঙ্গমাতার সেই কষ্ট অনুভব করা হয়তো সম্ভব হবে। আজকের কোনো বাবা যদি একইভাবে কল্পনা করেন যে তার চোখের সামনে স্ত্রী-সন্তানদের ঘাতকরা হত্যা করছে অতঃপর তাকেও তাহলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম পরিহাসের কথা অনুভব করা সম্ভব হবে। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার এই পরিণতি হয়েছিল এদেশের মানুষের কথা ভাববার জন্য, তাদেরকে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের শাসন-শোষন ও নির্যাতনের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য। দেশের জন্য বঙ্গমাতা তাঁর দুই সন্তানকে মু্িক্তযুদ্ধে পাঠিয়েছেন। মায়ের প্রেরণা ও পিতার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে শেখ কামাল ও শেখ জামাল মু্িক্তযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন। তাঁরা দেশমাতৃকার স্বাধীনতার লড়াকু সৈনিক। এভাবে শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হয়ে উঠেছেন মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের গর্বিত মা হিসেবে। এই দেশমাতার সংগ্রামী জীবন, কর্ম, অবদান ও স্বদেশ ভাবনা পাঠ্যপুস্তকে অর্ন্তভূক্ত করার মাধ্যমে আমরা তার আত্মাকে কিছুটা শান্তি দিতে পারি। পাশাপাশি স্বদেশ ভাবনার ক্ষেত্রে শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের অবদান, তাঁর জীবন, কর্ম ও সংগ্রামের নতুন নতুন অধ্যায় রচনা ও বর্তমান প্রজন্মকে অবগত করার জন্য প্রয়োজন প্রামাণ্য-তথ্যচিত্র নির্মাণ, নতুন নতুন গবেষণা ও অনুসন্ধানের।

ড. মুসতাক আহমেদ

লেখক: প্রফেসর, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ ও প্রভোস্ট, মতিহার হল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Print