‘গুজব ছড়িয়ে নয়, শিশুদের জন্য গড়ি নিরাপদ বাংলাদেশ’ ।। রফিকুল ইসলাম

July 21, 2019 at 10:15 pm

ছোট ভাইয়ের ছেলের বয়স হলো আট মাস। আমার অন্য তিন ভাই এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে গ্রামে থাকেন আমার ‘মা’। সম্প্রতি আমার বাবা মারা যাওয়ার পরে মা ছোট ভাইয়ের একমাত্র ছেলেটিরে সঙ্গেই বেশি সময় কাটান। মানে নাতির সঙ্গে। বাড়ির সবার ছোট শিশুটি রুহানকে নিয়ে অন্যদেরও আগ্রহের শেষ নেয়। আবার ওর বড় আমার ছেলে আহানকে নিয়েও মাতামাতি সবার। আহান যখন গ্রামে ছুটে যায় (আমাদের বাড়িতে) আমাদের সঙ্গে, তখন তাকে নিয়েই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আবার আহান যখন রাজশাহী থাকে, তখন মা ফোন করেই খোঁজ নেন, আহান কেমন আছে। ওকে সাবধানে রেখো। ওষুখ-বিষুখ হয়েছে কি না, খেয়েছে কি না? নাতির জন্য কতসব প্রশ্ন উগড়ে আসে দাদির। আর একটার পর একটা জবাব দিতে  হয় আমাকে। আবার আমার বড় ভাইয়ের ছেলে, ভাবিসহ অন্যরাও যখন ফোন করেন কোনো কাজে, তখনই আসে আহান প্রসঙ্গ। আমরাও যখন ফোন করি গ্রামের বাড়ির খোঁজ-খবর নিতে, তখন খোঁজ নিই ভাইদের ছোট বাচ্চাগুলো কে কেমন আছে?

শিশুদের প্রতি এমন ভালোবাসা শুধু আমাদের পরিবারেই আছে তা নয়।  তাদের প্রতি এই ভালোবাসা গোটা দেশজুড়েই। দেশের সীমানা পেরিয়ে গোটা বিশ্বজুড়েই শিশুদের এমন ভালোবাসার নজির বয়ে যাচ্ছে। এটাই স্বাভাবিক। কারণ আজকের শিশুকে নিয়িই আমরা অভিভাবকরা গড়ি আগামীর স্বপ্ন। যেমন আমাদের নিয়ে গড়েছেন আমাদের বাবা-মা, তাদের নিয়ে তাদের বাবা-মা। এভাবেই ধারাবাহিকতা চলে আসছে। চলবে। একটি শিশু একটি পরিবারের জন্য কতটা ভালোবাসার, কতটা আবেগের-তা মুখে বলে বা হাতে লিখে প্রকাশযোগ্য নই। আমরা দেখেছি, তুরস্কের উপকূলে ভেসে আসা শিশু আয়লানের মৃতদেহকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে শিশুদের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ।

অন্যদিকে মায়ানমার থেকে পালিয়ে আসার সময় শত শত শিশুদের নিয়েও গোটা বিশ্বের ভালোবাসার বহি:প্রকাশ ঘটতেও দেখেছি। এ দুটি ঘটনাই ছিলো ‘ইতিহাসের নির্মম ট্রাজেডি’। আমাদের দেশের শিশুদের নিয়ে এমন নির্মম ট্রাজেডির কোনো ঘটনা নাই। কিন্তু তার পরেও এই শিশুদের নিয়ে আজ গোটা দেশের মানুষ আতঙ্কিত। বিচলিত।

বাড়ির প্রিয় শিশুটিকে একেবারে পরিচিত মানুষের কাছেও এখন আর অনেকে ভয়ে ছেড়ে দিতে সাহস পাচ্ছেন না। আবার গ্রামে যে শিশুটি বাড়ির বাইরে আশে-পাশের উঠানে গলিতে গিয়ে খেলায় মেতে উঠে বড়ে হয়ে উঠছে এখন তাকেও বাড়ির মধ্যে আটকে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন অভিভাবকরা। পাশাপাশি পরিচিতজনদের কাছে ফোন করে খবর নিচ্ছেন, ওখানে না কি শিশুর মাথা কেটে নিয়ে গেছে, সেখানে এতোজন ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে-এমন কোনো খবর তারা জানেন কি না?

আমার মা’ও গত কয়েকদিনে এই রকম প্রশ্ন অন্তত ৫ বার করেছেন ফোন দিয়ে। সঙ্গে এও সাবধান করেছেন, ‘যেন আহানকে দেখে দেখে রাখি। সাবধানে রাখি।’ রুহানকে নিয়েও বাড়ির সবাই আতঙ্কে আছে সেটিও জানাচ্ছেন বার বার।’

পেশায় সাংবাদিকতা করি বলে আমাদের কাছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া খবরগুলো একটু বেশিই থাকে-সেটা মা বিশ্বাস করেন। তাই কোনো গুজব শোনার পরেই মা সেটিকে যাচাই করতে ফোন করেন আমার কাছে। আমি মাকে এই কয়দিনের প্রতিবারই আশ্বস্ত করেছি, ‘মা ছেলেধরা নিয়ে যে কথাগুলো আসছে, এগুলোর সবই গুজব।’

মাকে আমি এই বলেও আশ্বস্ত করেছি, মা দুই-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে, বা ঘটছে। এগুলো আগেও ঘটতো, এখনো ঘটছে। তবে সেতু নির্মাণের পেছনে শিশুদের মাথার প্রয়োজনের সঙ্গে এর কোনো মিল নাই। পুরোটাই গুজব ছড়ানো হচ্ছে দেশকে অস্থিশীল করতে।

কিন্তু মা আমার কথায় কতটুকু আশ্বস্ত হতে পারছেন জানি না। কারণ হিসেবে যতটুকু জানা গেছে, গ্রামে প্রতিটি ক্ষণে ক্ষণে বিভিন্ন মাধ্যমে ‘ছেলেধরা’ নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ছে মুহূর্মুহূ। যার ফলে আমি মাকে যতটা আশ্বস্ত করতে পারছি, মা ওইসব খবরে ততটাই বিচলিতি ও আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন তার ছোট নাতি-নাতনীদের নিয়ে।

এমন আতঙ্ক শুধু আমারে গ্রামের বাড়িতেই যে বিরাজ করছে-তা নয়। রাজশাহীসহ সারাদেশের অনেক গ্রামেই এই আতঙ্ক এখন চরমে পৌঁছেছে বলে খবর আসছে প্রতিদিন গণমাধ্যমে। গত কয়েকদিনে সামাজিক গণমাধ্যম ফেসবুৃকজুড়েও এমন আতঙ্ক বিরাজ করছে সাধারণ মানুষের মাঝে। এ কারণে ফেসবুকের পাতাজুড়ে বা ম্যাসেঞ্জারে অনেকেই জানতে চাচ্ছেন এমন গুজব সম্পর্কে। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রতিদিনই বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। গুজব ছড়িয়ে কাউকে হত্যা করে আইন নিজের হাতে তুলে না নিতেও আহ্বান জানানো হচ্ছে। কিন্তু তার পরেও থেমে নেই এই গুজব ও আতঙ্ক।

গ্রাম পেরিয়ে এখন শহরেও এই গুজবের ডালপালা বিরাজ করছে জোর। তবে গ্রামের পরিস্থিতেই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। শিশুদের নিয়ে যেন রীতিমতো আতঙ্ক নেমে এসেছে ঘরে ঘরে। এ যেন ভয়াবহ চক্রান্ত বা অশনিসঙ্কেত নেমে এসেছে আমাদের মাঝে। এ থেকে আমাদের দ্রুত মুক্তি দরকার।

আশার কথা হলো-সরকার বিষয়টি নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। তার পরেও পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এই সময়ে প্রতিটি গ্রামে প্রতিদিন অন্তত একবার করে টহল দেওয়া দরকার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল গাড়ী দেখলেই হয়তো গ্রামের মানুষের মাঝে এখনকার ভীতিকর পরিস্থিতি দূর হবে দ্রুত। মানুষ আস্থা পাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহলে। পাশাপাশি আমাদের যে যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে ভয়াবহ এই গুজবের হাত থেকে গ্রামের সাধারণ মানুষকে সচেতনতা সৃষ্টিতে। আতঙ্ক না ছড়িয়ে গ্রামে কোনো অপিরিচিত লোক দেখে সন্দেহজনক মনে হলে তার সম্পর্কে আগে খোঁজ-খবর নিতে হবে সবাইকে একজোট হয়ে। কাউকে হুট-হাট ধরে নির্যাতন না করে অপিরিচিত সেই লোক সম্পর্কে প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবগত করতে হবে। তার আগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরকেউ অবগত করা যেতে পারে।

তবে সবার আগে কেবল সচেতনতাই পারে এই এই অশুভ পরিস্থিতি থেকে আমাদের রক্ষা করতে। কাজেই আসুন, গুজব ছড়িয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি নয়, সাধারণ মানুষকে সচেতন করি। বাড়ির আশে-পাশে অপিরিতি লোক ঘুরা-ফেরা করতে দেখলে প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ জনপ্রতিনিধিদের অবগত করি। আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে জোটবদ্ধ হয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করি। আমার-আপনার সন্তানকে ভীতকর পরিস্থিতির মাঝে ঠেলে না দিয়ে তাদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলি।

লেখক: রফিকুল ইসলাম

সাংবাদিক, দৈনিক কালের কণ্ঠ

ব্যুরো প্রধান, রাজশাহী

Print