রাজশাহীর হাটে-ঘাটে বিক্রি হচ্ছে অনুমোদনহীন ওষুধ, প্রতারিত মানুষ

July 12, 2019 at 10:48 pm

নিজস্ব প্রতিবেদক: গত ২৭ জুনের ঘটনা। রাজশাহী নগরীর তেরোখাদিয়া মোড় এলাকায় কামারুজ্জামান বিভাগীয় স্টেডিয়ামের সামনে চারিদিকে গোল হয়ে প্রায় দুই শতাধিক মানুষ গান শুনছেন। আর গোলাকারের মাঝখানে বাদ্যযন্ত্র ও মাইক নিয়ে বসে গান গাইছেন কয়েক শিল্পী। দুই-তিনটা গান শেষ হতে না হতেই মাইক্রোফোন হাতে নিলেন মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তি। প্রথমেই তিনি নিজেকে হকার নয় বলে দাবি করলেন। এরপর একটি ওষুধের পাতা হাতে নিয়ে কয়েকবার কসম কেটে বললেন এই ওষুধটি তিনি নিজেও খান। যার নাম হলো ‘ক্যাল এক্স’। এটি হাইম্যাক ইউনানী ল্যাবরেটরিজ নামের একটি কোম্পানী তৈরী করে। বাজারে যার মূল্য ৩০০ টাকা প্যাকেট (১০ ট্যাবলেট)। কিন্তু তিনি প্রচারের স্বার্থে দাম নিবেন মাত্র ৫০ টাকা প্যাকেট। ওষুধটি বাত, ব্যাথাসহ বিভিন্ন রোগের কাজ করে। তার কথা শুনে উপস্থিত কয়েকজন ব্যাথা আক্রান্ত রোগীকে ফ্রি একটি করে ওষুধও খাওয়ানো হলো। এরপর নানা ছলচাতুরি করে প্রায় শ’ খানেক ব্যক্তির কাছে ২ প্যাকেট করে ওষুধ ১০০ টাকা মূল্যে বিক্রি করলেন ওই ব্যক্তি। মাঝে এই প্রতিবেদককে জানালেন তাঁর নাম আবুল হোসেন রানা। তাঁর ওষুধটি অনেক উপকারী, তাই তিনি ফেরি করে এই ওষুধগুলো গ্রাম-গঞ্জে বা শহরের পাড়া-মহল্লায় বিক্রি করে যাচ্ছেন মাইক্রোযোগে।

তবে এই ওষুধ তিনি নিজে উৎপাদন করেন না বলেও দাবি করেন। ঢাকায় উৎপাদিত এই ওষুধ কোম্পানির হয়ে তারা বিক্রি করছেন ফেরি (হকারি) করে। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, না হওয়ারই কথা। কিন্তু সরকারি অনুমোদন আছে কি না, আদৌ নানা ধরনের রোগ-বালাইয়ের উপশম হয় কি না জানেন না তিনি। তবে প্রতিদিন ঠিকই হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে তুলে দিচ্ছেন ওজানা এই ওষুধটি। আর হাতিয়ে নিচ্ছেন হাজার হাজার টাকা। আবুল হোসেন রানার এই ওষুধ বিক্রি দলে তিনজন শিল্পীসহ রয়েছেন সর্বমোট ৬ জন। প্রতিদিন এভাবে তাঁরা রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় অসেচতন মানুষের কাছে বিক্রি করছেন অনুমোদনহীন এই ওষুধ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী অঞ্চলের হাটবাজার থেকে শুরু করে বিভিন্ন মোড়ে, পাড়া-মহল্লায় যেখানে লোকজনের জটলা বাধে সেসব স্থানে এভাবে প্রতিদিন শতাধিক হকার নানা ধরনের রোগ-বালাই উপশমের নাম করে হাজারো রকমের ওষুধ বিক্রি করে চলেছেন। দেদারছে বিক্রি হওয়া এসব অনুমোদিত ওষুধ কিনে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আবার কোনো ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন অসেচতন গরিব মানুষরাও। কিন্তু প্রশাসনিকভাবে এসব হকারদের বিরুদ্ধে কখনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। যার ফলে প্রতিদিন এসব হকারররা অনায়াসে ওষুধ বিক্রির নামে প্রতারণা করে যাচ্ছেন হরহামেশায়। এতে করে যেমন বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, তেমনি প্রতারণার শিকার হয়ে পকেট কাটা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের। যাদের অধিকাংশই হলেন গরিব শ্রেণির। অল্প টাকায় জটিল থেকে শুরু করে নানা রোগ-বালাইয়ের অসুখ থেকে উপশমের নামে প্রতারিত হচ্ছেন তাঁরা।

তেরোখাদিয়া মোড়ে ওষুধ বিক্রির সময় কথা হয় ওই এলাকার বাসিন্দা আলি আকবরের সঙ্গে। এসময় রিকশা চালক আলী আকবর জানান, এর আগেও বিভিন্ন সময়ে হকারের নিকট থেকে তিনি তাঁর কমরের ব্যাথাসহ বিভিন্ন রোগ-বালাইয়ের জন্য ওষুধ কিনেছেন। কিন্তু কখনোই উপকার পাননি। তার পরেও অল্প টাকায় পাওয়া যায় বলে সেইদিন আবারো দুই প্যাকেট ট্যাবলেট হকার আবুল হোসেন রানার নিকট থেকে ১০০ টাকায় কিনেন তিনি।
বার বার ঠকার পরেও আবারো কেনো কিনলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভালো ডাক্তারের গেছে গেলেও ৬০০-৭০০ টাকা বিজিট (ফি) দিতে হয়। এরপর ল্যাখে এক ডজেন (অনেক) ওষুধ। এতো ট্যাকা কুণ্ঠে পাবো। তাই যখন যে হকার পাই, কাছে ট্যাকা থাকলেই অসুখ ভালো হওয়ার আশায় কিনে লিই। কখনো কখনো একাট্টুক আরামও পাওয়া যায়। তবে ভালো হয় না।’
এদিকে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রাজশাহীর কোর্ট চত্বর, বানেশ্বর বাজার, দুর্গাপুর বাজার, তাহেরপুর বাজার, কাঁকনহাট বাজারসহ রাজশাহী অঞ্চলের বড় বড় হাটে হাটের দিন করে প্রতিদিন শতাধিক হকার নানা রোগ-বালাইয়ের নাম করে অনুমোদনহীন বা নিজেদেরই তৈরী নানা ধরনের ওষুধ বিক্রি করে চলেছেন। কেউ কেউ ভ্যানে করে, কেউ মাইক্রোবাসে করে আবার কেউ নানা বাহানা করে মানুষ জটলা করে এসব ওষুধ বিক্রি করছেন হকাররা। আর তাদের নিকট থেকে ওষুধ কিনে প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ ও গরিব শ্রেণির মানুষগুলো।
রাজশাহীর কোর্ট চত্বরে ওষুধ বিক্রি করা হকার সেলিম হোসেন বলেন, ‘প্রায় ২০-২৫ বছর ধরে তিনি এই কোর্ট চত্বরে ওষুধ বিক্রি করছেন। বিভিন্ন গাছ-গাছড়া দিয়ে তৈরী করা নিজের ওষুধ। মানুষ উপকার পান বলেই তো ব্যবসাটি এখনো টিকে আছে।’
তবে কোর্ট চত্বরের ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘কোর্টে প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ আসে গ্রাম-গঞ্জ থেকে। এসব মানুষই সাধারণ টার্গেট হয়ে থাকেন এই হকারের। শহরে বসে যখন কোনো হকার ব্যবসা করেন, তখন গ্রাম থেকে আসা অসেচতন মানুষগুলো বিশ্বাস করেই সেই ওষুধ কিনে নিয়ে যান। এর ফলে প্রতারিতও হন তারা।’

এসব নিয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী সিভিল সার্জন কাজী মিজানুর রহমান বলেন, ‘হাটে-বাজারে হওকারের মাধ্যমে বিক্রি হওয়া এসব ওষুধে যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে, তেমনি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও থাকে। আবার মানুষও প্রতারিত হয়। সাধারণত গরিব শ্রেণির মানুষরাই প্রতারিত হয় বেশি। কারণ তারা আর্থিক অভাবে ভালো চিকিৎসা করতে পারে না বলে এসব হকারের কাছে ছুটে যায়। আবার হকারদের প্রলোভনে পা দিয়ে ওষুধ কিনে প্রতারিত হন অনেক শিক্ষিত ও ধনি শ্রেণির লোকেরাও। তবে হকারের কোনো ওষুধই মানসম্মত নয়। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’

স/শা

Print