বাংলাদেশের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ

July 11, 2019 at 8:44 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

২০১৯ সাল জনসংখ্যা ও উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের (আইসিপিডি) ২৫ বছর পূর্তির বছর। এ বিবেচনায় এ বছর ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে—‘জনসংখ্যা ও উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ২৫ বছর: প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়ন’। ১৯৯৪ সালের ৫-১৩ সেপ্টেম্বর মিসরের কায়রোতে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর ১৭৯টি দেশ এবং ১১ হাজার অংশগ্রহণকারী জনসংখ্যা ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত যে কর্মসূচি চূড়ান্ত করে, তার কেন্দ্রে রয়েছে অধিকার ও উন্নয়ন।

এ ক্ষেত্রে প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার, জেন্ডার সমতা, নারীর ক্ষমতায়ন, পরিবার পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলোতে গুরুত্ব প্রদান করা হয়, যা জনসংখ্যা ও উন্নয়ন বিষয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি-পরিকল্পনায় সংযুক্ত হয়। ফলে আইসিপিডি-জনসংখ্যা ও উন্নয়ন বিষয়ে জনসংখ্যার গুণগত দিক ও অধিকারের বিষয়টি প্রথমবারের মতো বিশেষ গুরুত্ব পায়।

জনসংখ্যা ও উন্নয়নবিষয়ক যুগান্তকারী এ সম্মেলনের ২৫ বছর পূর্তিতে আমাদের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে দরকার প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়ন।

লক্ষণীয় যে আইসিপিডি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। যেমন সরকারের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ (২০১৮), মাথাপিছু দারিদ্র্যের হার হ্রাস পেয়ে এখন ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ (বিবিএস ২০১৬)। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা (১৫-৫৯ বছর) এখন সবচেয়ে বেশি (৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ, এসভিআরএস ২০১৮) আর নির্ভরশীলতার হার এখন সবচেয়ে কম। ফলে জনমিতির লভ্যাংশ অর্জনের সুযোগের সময়কাল পার করছে বাংলাদেশ।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে ছেলেমেয়ের সমতার ক্ষেত্রে রয়েছে লক্ষণীয় সাফল্য। পাঁচ বছরের নিচে বয়সীদের ক্ষেত্রে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৩৮-এ নেমে এসেছে। ১৯৯৩-৯৪ সালের মোট প্রজনন হার ৩ দশমিক ৪ থেকে ২ দশমিক ৩-এ এসেছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হার ১৯৯৩-৯৪ সালের ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ৬২ শতাংশে পৌঁছেছে । দেশের মানুষের গড় আয়ু এখন উন্নীত হয়েছে ৭২ দশমিক ৩ বছরে।

এসব অগ্রগতির পাশাপাশি নতুন চ্যালেঞ্জ কিংবা অসম উন্নয়নও লক্ষণীয়। যুবগোষ্ঠী ও দ্রুত বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। বেকারত্বের হারে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। আয়বৈষম্যে কোনো উন্নতি হয়নি, বরং বেড়েছে। প্রাথমিক স্কুলে ঝরে পড়ে ৩৩ দশমিক ৮ শতাংশ আর মাধ্যমিকে ৬৯ শতাংশ (২০১৮, ইউএনডিপি)। দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে (৩৫ দশমিক ৯ শতাংশ-ইউএনডিপি, ২০১৮)। জলবায়ুর পরিবর্তন বা পরিবেশগত বিভিন্ন কারণে শহরে স্থানান্তরিত হচ্ছে মানুষ। নগরজীবনে উদ্ভূত হচ্ছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। এখানে নারী, কিশোর-কিশোরী ও যুবগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণে পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এখনো দেশে বাল্যবিবাহের হার ৫৯ শতাংশ (ইউএনএফপিএ ২০১৯)।

কিশোরী অবস্থায় গর্ভধারণের হার অনেক বেশি (৩১ শতাংশ-বিডিএইচএস ২০১৪, যা ১৯৯৩-৯৪ সালে ছিল ৩৩ শতাংশ)। ২০১১ ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের তথ্যানুযায়ী, প্রজনন হার হ্রাসে কোনো অগ্রগতি হয়নি, ২ দশমিক ৩-এ আটকে আছে।

জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি ব্যবহারের হারেও নেই অগ্রগতি (৬২ শতাংশ, বিডিএইচএস ২০১৪)। জানা যায়, সর্বশেষ ২০১৭-১৮ সালের বিডিএইচএস জরিপেও রয়েছে তা অপরিবর্তিত। ১৫-৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অপূর্ণ চাহিদার হার ১২ শতাংশ হলেও ১৫-১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে তা বেশি (১৭ শতাংশ)। তার ওপর ‘জাতীয় জনসংখ্যা নীতি ২০১২’ অনুযায়ী, এ-সংক্রান্ত জনসংখ্যা নীতির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জন করা যায়নি। আর সরকারের বাংলাদেশ রূপকল্প (২০১০-২১), সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১৬-২০)—এসব নীতি-কর্মকৌশলে রয়েছে অসামঞ্জস্যতা।

এ ছাড়া এখনো বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার অনেক বেশি। সেই সঙ্গে অসংক্রামক ব্যাধিতে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

জনসংখ্যার বয়স কাঠামোতে আশাব্যঞ্জক পরিবর্তনে জনমিতির লভ্যাংশ অর্জনের সুযোগ থাকলেও তা নির্ভর করছে সৃষ্ট এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করার ওপর। আমাদের গবেষণাকর্ম বলছে, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়ার এ সম্ভাবনা রয়েছে ২০৪০ সাল পর্যন্ত। গবেষণা সূত্রে জানা যায়, দেশে এখন প্রতিবছর ২১ লাখ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী জনসংখ্যায় যোগ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (২০১৬) তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫-২৪ বছর বয়সী যুবগোষ্ঠীর ৪০ দশমিক ৩ শতাংশই শিক্ষা, চাকরি অথবা প্রশিক্ষণের কোনোটিতেই নেই।

 জনসংখ্যা নীতির বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হিসেবে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদ। পরিষদ গত ৯ বছরে এ-সংক্রান্ত কোনো সভা করেনি। তার ওপর ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর থেকে পাঠানো চিঠিতে জানা যায়, ‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’ স্লোগানের পরিবর্তন করে ‘ছেলে হোক, মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট’ স্লোগান ব্যবহারের তাগিদ। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এ স্লোগান পরিবর্তনের বিষয়টি কতটুকু যুক্তিযুক্ত হয়েছে, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।

বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাল্যবিবাহ, কিশোরী মাতৃত্ব, শ্রমবাজারে নারীদের কম অংশগ্রহণ, কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় স্থানীয় ও পরিবর্তিত বিশ্ববাজারে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া। শুধু বাল্যবিবাহের কারণেই অর্ধেকের বেশি টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন হবে আমাদের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ছাড়াও আমাদের দরকার পরিবার পরিকল্পনা করা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার নিশ্চিতকরণ ও নারীর ক্ষমতায়ন। আইসিপিডিতে এসব বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয় ও ২০৪১ সালের মধ্যে ‘উন্নত’ দেশের কাতারে পৌঁছাতে হলে সরকারকে আইসিপিডি সম্মেলন পরবর্তী অগ্রগতি, প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ মূল্যায়ন করে এখনই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জনসংখ্যা ও উন্নয়ন ইস্যুগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় নীতি ও পরিকল্পনাতে সমন্বয় ও একীকরণ করতে হবে ।

Print