পৌর প্যানেল মেয়রসহ সাংবাদিকও জড়িত ইয়াবা কারবারে!

May 8, 2019 at 4:19 am

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

কক্সবাজারের সীমান্ত এলাকায় সাংবাদিকতার আড়ালে এবং পৌর কাউন্সিলারের ক্ষমতায় দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা কারবার চালিয়ে আসছিলেন সাদা পরিচ্ছন্ন পোশাকের চালচলনের ভদ্রবেশী আবদুল্লাহ মনির। এতকাল ইয়াবা কারবারের সাথে জড়িত থাকলেও এমন ক্ষমতাধর সাংবাদিক নামধারি জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে কোনো মামলা-মোকদ্দমার রেকর্ডও নেই।

কিন্তু এই প্রথম আদালতে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দীতে টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলার, প্যানেল মেয়র ও সাংবাদিক নামধারি আবদুল্লাহ মনিরের বিরুদ্ধেও ইয়াবা কারবারের সুনির্দ্দিষ্ট চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। সেই সাথে টেকনাফ সীমান্তের সাংবাদিক নামধারি আরো বেশ ক’জনের বিরুদ্ধেও ইয়াবা কারবারের গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে গেছে।

টেকনাফের শিলবুনিয়া পাড়ার ডা. মোহাম্মদ হানিফের পুত্র হাজী সাইফুল করিমের ভগ্নিপতি হচ্ছেন প্যানেল মেয়র আবদুল্লাহ মনির। আবদুল্লাহ মনির টেকনাফের নবগঠিত পৌর প্রেস ক্লাবের সভাপতি এবং একটি

জাতীয় দৈনিকের টেকনাফ সংবাদদাতাও। দেশের শীর্ষ স্থানীয় ইয়াবা ডিলার হাজী সাইফুল করিম টেকনাফের স্থল বন্দরের ব্যবসা দেখিয়ে ইয়াবা কারবারের মাধ্যমে শীর্ষ করদাতা গণ্য হয়ে সিআইপি উপাধিও বাগিয়ে নিয়েছিলেন।

মাত্র বছর দুয়েক আগেও হাজী সাইফুল করিমের ক্ষমতা এবং টাকায় টেকনাফ থেকে চট্টগ্রাম মহানগরী ছিল একাকার। পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তারাও হাজী সাইফুলের পাশে পাশে থাকতেন।

টেকনাফ সীমান্তে হাজী সাইফুলের তিন ভাই মাহবুবুল করিম, রাশেদুল করিম, জেড করিম জিয়া ও তাদের ভগ্নিপতি পৌর প্যানেল মেয়র এবং সাংবাদিক আবদুল্লাহ মনিরসহ আরো কয়েকজন সাংবাদিক নামধারী ব্যক্তি ইয়াবা কারবার নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন।

এদের মধ্যে এখনো কয়েকজন সাংবাদিক নামধারী ব্যক্তি পুলিশকে গোপন তথ্য সরবরাহ দেওয়ার আড়ালে থানায় সকাল-সন্ধ্যা আনাগোনা করেন। এমনকি হাজী সাইফুল সিন্ডিকেটের এসব সদস্যরা পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে সিন্ডিকেটের আসল কাজে কৌশলে সহযোগিতা দিয়ে আসছেন। এমনকি এসব সাংবাদিক নামধারি ব্যক্তিরা টেকনাফ থানার গেইটে হরদম ওঁৎ পেতে থাকেন।

টেকনাফে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ইয়াবা ডন হাজী সাইফুল করিমের ম্যানেজার মোহাম্মদ নুর (২৮) কর্তৃক আদালতে স্বেচ্ছায় দেওয়া জবানবন্দীতেই এসব উঠে এসেছে। হাজী সাইফুলের ম্যানেজার মোহাম্মদ নুর পুলিশকে যে তথ্য দিয়েছেন এবং পরবর্তীতে আদালতে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট দেওঁয়া জবানবন্দী পেয়ে টেকনাফ থানার পুলিশ কর্মকর্তারাও রিতীমত হতবাক হয়ে পড়েন। এতদিন যারাই কিনা সীমান্ত এলাকায় পুলিশকে নানা তথ্য দেওয়াসহ ইয়াবাবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান ও ইয়াবাবিরোধী সভা-সমাবেশে বক্তব্য দিযে আসছিলেন এবং সভা পরিচালনা করে আসছিলেন তারাই ইয়াবা কারবারে জড়িত থাকার তথ্যও মিলেছে পুলিশের কাছে।

গত ৩ মে রাতে টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশের নেতৃত্বে একদল পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে টেকনাফের শিলবুনিয়া পাড়ার ডা. মোহাম্মদ হানিফের পুত্র হাজী সাইফুল করিমের ঘরে।

পুলিশের দল গোপন সূত্রে সংবাদ পেয়ে হাজী সাইফুলের সাংবাদিক ও এনজিওকর্মী পরিচয়ধারী দুই ভাই মাহবুবুল করিম ও রাশেদুল করিমকে গ্রেপ্তার করেন। দুই ভাই গ্রেপ্তারের পর পরই তাদের শয়ন কক্ষের খাটের নিচে থাকা দশ হাজার ইয়াবার পুটলি এবং ৪টি অস্ত্র পুলিশের হাতে তুলে দেন। এ সময় দুই ভাই পুলিশের কাছে স্বীকার করেন, তাদের ভাই ইয়াবা ডন হাজী সাইফুল গা ঢাকা দেওয়ার পর থেকেই তারা কারবার চালিয়ে আসছেন। তাদের ভাই সাইফুল এসব ইয়াবা ও অস্ত্র তাদের হাতে তুলে দেন।

এ ঘটনার পরের দিন গোপন সূত্রের সংবাদে পুলিশ আবারো হানা দেয় ইয়াবা বাড়ি হিসাবে পরিচিত হাজী সাইফুলের ঘরে। পুলিশ ঘরে দ্বিতীয় অভিযান চালিয়ে আবারো ৪ হাজার ২০০ ইয়াবা এবং ২টি অস্ত্র এবং গুলি উদ্ধার করে। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয় সাইফুলের ম্যানেজার মোহাম্মদ নুরকে।

গ্রেপ্তার হওয়া মোহাম্মদ নুর হচ্ছেন টেকনাফ পৌর এলাকার নাইটং পাড়ার বাসিন্দা করিম উল্লাহর ছেলে। তিনি পুলিশকে সাইফুলের ইয়াবা কারবারের যাবতীয় তথ্য প্রদান করেন। পরবর্তীতে গত সোমবার ম্যানেজার মোহাম্মদ নুর কক্সবাজারের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হেলাল উদ্দিনের নিকট ১৬৪ ধারা জবানবন্দীতে অকপটে সব স্বীকার করেন।

টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরো জানান, ইয়াবা ডন সাইফুল করিমের ম্যানেজার মোহাম্মদ নুর স্বীকারোক্তিতে বলেছেন, কক্সবাজার শহরের সাগর পাড়ের হাজী সাইফুল করিমের মালিকানাধীন বিলাসবহুল ‘হোটেল স্বপ্নালয়’ হচ্ছে ইয়াবা কারবারের অন্যতম ঘাঁটি। এই হোটেলেই সাইফুল করিম তার ভাইগণ এবং ভগ্নিপতি টেকনাফ পৌরসভার প্যানেল মেয়র আবদুল্লাহ মনিরের সাথে বৈঠক করেন। এই বৈঠকেই তাদের সিন্ডিকেটের ইয়াবা কারবার নিয়ে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

স/আর

Print