জাবিতে দুই শিক্ষককে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানে অনিয়মের অভিযোগ

April 13, 2019 at 12:10 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) দুই পিএইচডি গবেষককে অনিয়মের মাধ্যমে তড়িঘড়ি করে ডিগ্রি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ওই দুই গবেষক জাহাঙ্গীরনগরের ইতিহাস ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) বাংলা বিভাগের শিক্ষক। তাদের গবেষণা কর্মের ওপর দুটি করে উন্মুক্ত সেমিনার আয়োজনের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক বিরতি মানেনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বিভাগের উচ্চশিক্ষা কমিটি। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পরীক্ষা অধ্যাদেশ ও নীতিমালা’ লঙ্ঘন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক এম নূরুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে ‘তাজউদ্দীন আহমেদের রাজনীতি ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ বিষয়ে গবেষণা করেন একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুলতানা আক্তার। তার দুটি সেমিনারের মাঝে বিরতি ছিল দুই মাস ১২দিন। অপরদিকে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক পৃথ্বিলা নাজনীন নীলিমার তত্ত্বাবধানে ‘অভিজিৎ সেনের কথাসাহিত্যঃ ইতিহাস ও ভূগোল পারম্পর্য’ বিষয়ে গবেষণা করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাজিব মন্ডল। তার দুই সেমিনারের মাঝে বিরতি ছিল চার মাস সাত দিন।

কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পরীক্ষা অধ্যাদেশ ও নীতিমালা’র পিএইচডি অংশের ৫.৪ ধারায় বলা আছে, গবেষককে গবেষণা কর্মের ওপর কমপক্ষে দুটি সেমিনার দিতে হবে। আর ওই দুই সেমিনারের মাঝে কমপক্ষে ছয় মাস বিরতি থাকা আবশ্যক।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ মার্চ একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় ওই দুই গবেষককে পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। পরে ৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় ডিগ্রি অনুমোদন হয়। একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় সেমিনারের বাধ্যতামূলক বিরতি না মানায় রাজিব মন্ডলকে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানে কয়েকজন সদস্য আপত্তি জানান। বিষয়টি  নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে দীর্ঘ আলোচনার একপর্যায়ে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম ডিগ্রি অনুমোদনের সুপারিশ করেন। অপরদিকে একই নিয়ম ভঙ্গ করায় সুলতানা আক্তারকে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানে কেউ আপত্তি তোলেননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনজন শিক্ষক জানিয়েছেন, বিতর্ক সত্ত্বেও তত্ত্বাবধায়কদের তদবিরে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় দুজনকে ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছে।

এ বিষয়ে উপাচার্য ও একাডেমিক কাউন্সিল সভাপতি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বলেন, ‘সুলতানা আক্তারের পিএইচডির বিষয়টি আমাদের নজরে আসেনি। একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় কেউ আপত্তি জানাননি। আর রাজিব মন্ডলের পিএইচডি দীর্ঘদিন ধরে আটকে ছিল। তাই অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা যায়, ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে খণ্ডকালীন গবেষক হিসেবে ভর্তি হন ওই দুই শিক্ষক। গত বছরের ৩০ জুন তাদের মেয়াদ পূর্ণ হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডিগ্রি শেষ করতে না পারায় বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধি করে। বর্ধিত সময়ের মধ্যেও তারা শেষ করতে ব্যর্থ হন। পরে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম নিজ ক্ষমতাবলে এ বছরের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত আরেক দফা মেয়াদ বৃদ্ধি করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছরের ৩১ অক্টোবর জাবির ইতিহাস বিভাগের সুলতানা আক্তারের প্রথম সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এর দুই মাস ১২দিন পর এবছরের ১৩ জানুয়ারি দ্বিতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সবশেষ মেয়াদের একদিন আগে ২৪ জানুয়ারি অভিসন্দর্ভ জমা দেন সুলতানা আক্তার। পরে ৩ মার্চ অভিসন্দর্ভের ওপর মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করে ডিগ্রি প্রদানের সুপারিশ করে পরীক্ষা কমিটি।

এ বিষয়ে যুগ্ম গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক এ টি এম আতিকুর রহমান বলেন, ‘নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে ডিগ্রি শেষ করার জন্য দুই সেমিনারের মাঝে বিরতি কমিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল। গবেষকের গবেষণা কর্ম ভালো হয়েছে। যার ফলে আমরা শিথিলতা দেখিয়েছি, কঠোর হইনি।’

অপরদিকে রাজিব মন্ডলের ডিগ্রির ব্যাপারে তার তত্ত্বাবধায়ক এবং বাংলা বিভাগের উচ্চশিক্ষা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক পৃথ্বিলা নাজনীন নীলিমা বলেন, ‘কলা ও মানবিকী অনুষদে সেমিনারের ছয় মাসের বিরতিকে খুব বড় করে দেখা হয় না। আমরা গবেষকদের সবসময় উৎসাহিত করি। সময়ের ব্যাপারে কড়াকড়ি হলে তারা নিরুৎসাহিত হন। এছাড়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতেই বিরতি কমানো হয়েছিল।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে যেসব গবেষকরা ডিগ্রি শেষ করতে পারছিলেন না তাদের বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে আমরা সময় বৃদ্ধি করেছিলাম। ওই সময়ের মধ্যে শেষ করতে গিয়ে হয়তো নির্ধারিত বিরতি মানা হয়নি। তবে অসৎ উদ্দেশ্যে সেটি করে থাকলে যেকোনও সময় তা বিচারের আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে। এসব বিষয় কখনও অনিয়ম হয় না।’

এ বিষয়ে সুলতানা আক্তার বলেন, ‘দুই সেমিনারের মাঝে বিরতি কমানো না হলে ডিগ্রি লাভের মেয়াদ শেষ হয়ে যেতো। আমি গবেষণায় অনেক পরিশ্রম করেছি। বিভাগ বিষয়টি বিবেচনা করেছে।’

রাজিব মন্ডল বলেন, ‘মানবিক দিক বিবেচনা করে ডিগ্রি লাভের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছিলাম। বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মেয়াদ বৃদ্ধি করেছিল। ওই বর্ধিত সময়ের মধ্যে ডিগ্রি লাভের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে দুই সেমিনারের মাঝে বিরতি কমানো হয়েছিল।’

Print