পশ্চিমাঞ্চল রেলে বেসরকারী এটেন্ডেন্ট সার্ভিস বন্ধ হচ্ছে

March 26, 2019 at 1:43 pm

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ, এখনো আন্ত:নগর ট্রেনগুলোতে যাত্রীরা পা ফেলানোর জায়গা পান না। সেবার মাণের চেয়ে টিকিটের মূল্য বেশি। তার পরেও কেনো রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ লোকসান গুনছে বছরের পর বছর। এর কারণ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে যেসব চিত্র ফুটে উঠেছে, তার মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ, জনবল থাকলেও কাজ না করে বেতন উত্তোলন, লুটপাটসহ নানা অনিয়ম। সেই অবস্থা থেকে লোকসান কমাতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আন্ত:নগর ট্রেনগুলোতে বেসরকারি এটেন্ডেন্ট নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

এতে বছরে কেবল একটি ট্রেন থেকেই অন্তত ১৫ লাখ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। কিন্তু সেই বেসরকারী এটেন্ডেন্ট পক্রিয়া বাতিল করে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে এটেন্ডেন্ট নিয়োগের চেষ্টায় মাঠে নেমেয়ে একটি চক্র। যারা এর আগে রেলওয়ের নানা নিয়োগে বাণিজ্য করে আসছে। এতে করে একদিকে যেমন আবার রেলওয়ের লোকসান বেড়ে যাবে, তেমনি যাত্রীসেবার মাণেও নামবে ধস।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের আরেক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে এটেন্ডেন্ট মঞ্জুরী আছে ২৩৫ জন। বর্তমান কর্মরত আছেন ১৮৮ জন। এছাড়াও বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী আরো ৫৭০ জন এটেন্ডেন্ট প্রয়োজন। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে আরও ৫০টি কোচ যুক্ত হচ্ছে। তখন এটেন্ডেন্ট চাহিদার সংখ্যা আরো বাড়বে। এই এটেন্ডেন্ট স্বল্পতা দূর করতে গত চার মাস ধরে পরীক্ষামূলকভাবে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বেসরকারি এটেন্ডেন্ট সার্ভিস সেবা চালু করে।

ঠিকাদার নিয়োগ করে এটেন্ডেন্ট নিয়োগ করা হয় প্রতি বগির জন্য এক করে। এর মধ্যে রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী ধূমকেতু ট্রেনে এই সেবা দেওয়া হয়। এছাড়াও আরো ৫টি ট্রেনে একই সেবা চালু করা হয়। এতে করে রেলের খরচ কমে যাওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দেওয়ায় সম্ভব হয়। ফলে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু রেলওয়ের মঞ্জুরীকৃত এটেন্ডেন্ট কম থাকায় প্রত্যেকটি ট্রেনের ৩-৪টি বগি মিলে একজন করে এটেন্ডেন্ট নিয়োগ দেওয়া হয়।

এদিকে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, বেসরকারী এটেন্ডেন্ট সার্ভিস নতুন করে চুক্তি মেয়াদ না বাাড়তে রেল মন্ত্রণালয় থেকে মৌখিকভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েকে। এর ফলে নতুন করে এ সেবার মেয়াদ বাড়াতে গিয়ে থমকে যান পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের কর্মকর্তারা। তবে এই সেবা চালু রাখলে রেলওয়ের লাভ হবে জানিয়ে এরই মধ্যে গত ১৯ মার্চ একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পক্ষ থেকে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহা-ব্যবস্থাপক খন্দকার শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিটি রেল মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলেও নিশ্চিত করেছে একটি সূত্র। কিন্তু তার পরেও সার্ভিসটি বন্ধের পায়তারা করছে একটি চক্র।

রেলওয়ে নিযুক্ত এটেন্ডেন্টদের কারণে যাত্রীসেবা যেমন বিঘ্ন ঘটে, তেমনি বেতন ও কিলোমিটার প্রতি টিএ-ডিএ দিতে গিয়ে আরো অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়। আবার এটেন্ডেন্ট স্বল্পতার কারণে আন্তঃনগর ট্রেন বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলে ঢাকামুখী ট্রেনগুলোতে ফেরীওয়ালা, ভিক্ষুকসহ টিকিটবিহীন যাত্রীর সংখ্যার বৃদ্ধি পাই। ফলে কমে যায় যাত্রীসেবার মাণ। অন্যদিকে প্রতিবগিতে একজন করে এটেন্ডেন্ট থাকলে এসব সমস্যা অনেকটা লাঘব হয়। যাত্রীরাও স্বাচ্ছন্দে রেলভ্রমণ করতে পারেন।

রেলওয়ে সূত্র মতে, বর্তমানে পশ্চিমাঞ্চলে ৭৬৯/৭৭০ নম্বর ট্রেন ধূমকেতু এক্সপ্রেস, ৭২৫/৭২৬ নম্বর ট্রেন সুন্দরবন এক্সপ্রেস, ৭৭১/৭৭২ নম্বর ট্রেন রংপুর এক্সপ্রেস ও ৭০৫/৭০৫৬ নম্বর ট্রেন একতা এক্সপ্রেস এবং ৭৭৩/৭৭৪ নম্বর ট্রেন টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস আন্তঃনগর ট্রেনে বেসরকারি এটেন্ডেন্ট সেবা (অনবোর্ড সার্ভিস) চালু আছে।

রেলওয়ে সূত্র মতে, রেলওয়ের একজন এটেন্ডেন্টের পেছনে মাাসিক বেতন ২১ হাজার টাকা এবং মাইলেন্স দাঁড়ায় ৪৫ হাজার টাকা। সবমিলে একজন এটেন্ডেন্টে মাসিক বেতন দাঁড়ায় ৬৬ হাজার টাকা প্রায়। এছাড়াও একটি ট্রেনে ২ শিফটে এটেন্ডেন্ট লাগে ২৬ জন। ২৬ জনের বেতন দাঁড়ায় ১৭ লাখ ১৬ হাজার টাকা প্রায়। এছাড়াও যাত্রীদের জন্য মালামাল দিতে হয় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার মতো। সর্বমোট একটি ট্রেনে মাসিক খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১৯ লক্ষ ৬৬ হাজার টাকা। কিন্তু বেসরকারী খাতে এটেন্ডেন্ট নিয়োগ দিলে একটি ট্রেনের খরচ দাঁড়ায় ৫-৬ লাখ টাকা।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের একাধিক সূত্র জানায়, এরই পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আরো বেসরকারি ক্ষাতে এটেন্ডেন্ট সার্ভিস চালু করার চিন্তা করছে। কিন্তু রেলওয়ের একটি চক্র চাইছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষই এটেন্ডেন্ট নিয়োগ দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করুক। এ নিয়ে ভিতরে ভিতরে তারা নানা তদবিরও শুরু করেছে। আর এটি বাস্তবায়ন হলে কেবল পশ্চিমাঞ্চলেই রেলের ক্ষতির পরিমাণ বর্তমান সময়ের চেয়ে আরো অন্তত ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলেও দাবি করেন সংশ্লিষ্ট মহল।

অন্যদিকে রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী সিল্কসিটি আন্ত:নগর ট্রেনের যাত্রী আজগর হোসেন বলেন, আমি প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে ঢাকা যাই। প্রতি রবিবার ঢাকা থেকে ধূমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেনে রাজশাহী আসি। ঢাকা যাওয়ার সময় পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে এসি বগিতে হিজড়া আর হকাররা উঠে যাত্রীদের বিরক্ত করে।

মামুনুর রশিদ নামেন একজন এটেন্ডেন্ট বলেন, ‘আমরা ১৫ বগিতে চারজন এটেন্ডেন্ট ডিউটি করি। চার বগিতে একজন করে। চার বগিতে ১৬টি দরজা থাকে। আমার একার পক্ষে এতগুলো দরজা সামলানো সম্ভব না। তাই হিজড়াসহ নানা ধরনের লোকজন উঠে পড়ে যাত্রীদের হয়রানি করে। কিন্তু বেসরকারীভাবে যেসব ট্রেনে এটেন্ডেন্ট সার্ভিস চালু আছে, সেগুলোতে এটি সম্ভব নয়। কারণ সেসবগুলোতে প্রতিটি কোচে একজন করে এটেন্ডেন্ট থাকে।

জানা গেছে, পূর্বাঞ্চলেও ১১টি ট্রেনে বেসরকারি এটেন্ডেন্ট সেবা চালু আছে। কিন্তু পশ্চিমাঞ্চলে মাত্র ৫টিতে রয়েছে। সেটিও বাতিলের চক্রান্ত করছে এই অঞ্চলের নিয়োগ বাণিজ্যকারী একটি চক্র। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এটেন্ড নিয়োগ দিলে তারা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ নানাভাবে অবৈধ সুযোগ হাতিয়ে নিতে পারবেন সেই কারণে এমন চক্রান্ত চলছে বলেও দাবি করেছেন রেলওয়ের একটি চক্র।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা এএমএন শাহনেওয়াজ বলেন, আমরা পরীক্ষামূলকভাবে বেসরকারিভাবে এটেন্ডেন্ট সেবা চালু করেছিলাম। এটির প্রয়োজনও আছে। কারণ রেলের যেমন আর্থিক খরচ কমছে, তেমনি যাত্রীসেবার মাণও বাড়ছে। তার পরেও মন্ত্রণালয় এই সেবা বন্ধ করতে চাইছে। এর কারণ আমাদের জানা নাই। তবে সেবাটি রাখার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।’

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের আরেকজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তাও বলেন, প্রায় একই কথা। তিনি এও বলেন, এই সেবা বন্ধ হলে সেটি হবে হঠকারী সিদ্ধান্ত। যাতে করে লোকসানের পরিমাণ আরো বাড়বে।’

স/আর

Print