ভেজাল ওষুধে মৃত্যু

দুর্বল আইন আর প্রভাবে পার পায় অপরাধীরা

February 12, 2019 at 10:50 am

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক: 

অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার লোভে খাঁটি ওষুধ প্রস্তুত না করে ভেজাল ওষুধ প্রস্তুত করে। মানুষের জীবন নিয়ে তারা ছিনিমিনি খেলে। আসামি আব্দুর রব ভেজাল প্যারাসিটামল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স পলিকেম ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের পরিচালক। তাই তিনি ভেজাল প্যারাসিটামল তৈরির দায় এড়াতে পারেন না। তাঁকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া যুক্তিসংগত বলে আদালত মনে করেন।’ ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ ও ড্রাগ আদালতের বিচারক সৈয়দ কামাল হোসেন গত ৭ ফেব্রুয়ারি এক রায়ে এমন মন্তব্য করলেও আদালত ভেজাল প্যারাসিটামল তৈরি করার দায়ে আব্দুর রবকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেন। রায়ে ওষুধ প্রস্তুতকারক পলিকেম ল্যাবরেটরিজের তৎকালীন ব্যবস্থাপক এ এস এম গোলাম কাদের এবং দুই ফার্মাসিস্ট মো. মাহবুবুল আলম ও মো. দেলোয়ার হোসেনকে বেকসুর খালাস দেন।

১৯৯২ সালে দেশে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি প্যারাসিটামলজাতীয় ওষুধ খেয়ে কয়েক শ শিশু মারা যায় গিয়েছিল। ওই সময় রাজধানীতে শিশু হাসপাতালেও জ্বর নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের প্যারাসিটামলজাতীয় ওষুধ খাওয়ানোর পর মারা গিয়েছিল বেশ কয়েকটি শিশু। ওই ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল মেসার্স পলিকেম ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডও। পরে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর পরীক্ষা করে পলিকেমের প্যারাসিটামলের মধ্যে ডাই-ইথিলিন গ্লাইকল পেয়েছিল, যার পরিমাণ ৮.৩৩ শতাংশ। ওই নমুনাটি ছিল মানবহির্ভূত। তখন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর জানিয়েছিল, ডাই-ইথিলিন গ্লাইকল প্যারাসিটামলে ব্যবহৃত হয় না। এটি একটি বিষাক্ত পদার্থ। এটি সেবনে মৃত্যু হতে পারে। প্যারাসিটামল তৈরিতে ওই রাসায়নিকটি ব্যবহারের অনুমতিও দেয়নি কর্তৃপক্ষ।

সেই ভেজাল, ক্ষতিকর ও মানবহির্ভূত প্যারাসিটামল তৈরির অভিযোগে ১৯৯২ সালের ১৯ ডিসেম্বর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর পলিকেম ল্যাবরেটরিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হারুন-অর-রশীদ, ব্যবস্থাপক এ এস এম গোলাম কাদের, পরিচালক আব্দুর রব, ফার্মাসিস্ট মাহবুবুল আলম ও দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল ড্রাগ আদালতে। পরে মামলা চলাকালে মারা যান পলিকেম ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। বাকি চারজনের বিরুদ্ধে মামলা চলতে থাকে। ১৯৯৪ সালে ওই মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়।

মামলার নথি থেকে দেখা যায়, অজানা কারণে দীর্ঘদিন মামলাটির বিচার স্থগিত ছিল। ওই ধরনের আরো কয়েকটি মামলার নথি গায়েব ছিল। আদালতের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের গাফিলতিতে থমকে ছিল বিচার। শেষ পর্যন্ত বিচার হলেও একজন ছাড়া অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করা যায়নি।

অননুমোদিত ফর্মুলায় বিষাক্ত দ্রব্য মিশিয়ে ‘মানবহির্ভূত, ভেজাল ও ক্ষতিকর’ প্যারাসিটামল সিরাপজাতীয় ওষুধ তৈরি ও বিক্রি করে ঔষধ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ ১৯৮২-এর ১৬ ধারা (সি) উপধারা ও ১৭ ধারা ভঙ্গ করার সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের কারাদণ্ড। ভেজাল ওষুধ খেয়ে মানুষ মারা যাওয়ার সর্বোচ্চ শাস্তি মাত্র ১০ বছরের কারাদণ্ড হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। তা সত্ত্বেও শাস্তির মাত্রা বাড়ানো হয়নি। আইন সংশোধনের দাবি থাকা সত্ত্বেও সেই দাবি অপূর্ণই থেকে যায়।

ওই আইনে ভেজাল ওষুধ তৈরির ঘটনায় মামলা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে একমাত্র ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে। তদন্তের এখতিয়ারও তাদের। ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক থাকায় ওই কর্তৃপক্ষ নিশ্চুপ থাকে।

ঢাকার আদালতে ফৌজদারি মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী ও ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি মো. বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘যে ক্ষতিকর দ্রব্য ঔষধে দেওয়া হলে মানুষের মৃত্যু হতে পারে এটা জেনেও সেই ঔষধ তৈরি করা ও বিক্রি করা মানুষ হত্যার শামিল। এটি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে বিচার হতে পারে।’

১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫ (গ) ধারায় ভেজাল ওষুধ বিক্রি বা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ওই ধারার ক, খ, গ, ঘ ও ঙ ধারায় ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারীদের বিচারের ব্যবস্থাও আছে। ওই আইনে ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। অথচ এই আইনে মামলা করা হয় না। এই মামলা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পুলিশ প্রশাসনকে।

১৯৯২ সালে ভেজাল প্যারাসিটামল ওষুধ খেয়ে কয়েক শ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ছিল ব্যাপক আলোচিত। ওই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর অ্যাডফ্লেম ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, বিসিআই লিমিটেড ও পলিকেমের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। কিন্তু মামলাগুলোর বিচার থেমে থাকে বিভিন্ন চক্রের জালিয়াতির কারণে। গত কয়েক বছরে মামলাগুলোর বিচার শুরু হয়, কিন্তু ঔষধ প্রশাসন অধিপ্তরের অবহেলায় ঢিমেতালে চলে বিচার। মামলা দায়েরকারী বাদীর সাক্ষ্য দিতে অনীহা থাকায় কারাগারে যেতে হয় তাকেও। ভেজাল প্যারাসিটামল তৈরি করা জঘন্যতম অপরাধ বলে গত ৭ ফেব্রুয়ারি আদালত উল্লেখ করেছেন রায়ে। কিন্তু ওষুধ তৈরির সঙ্গে জড়িত ফার্মাসিস্ট ও পলিকেম ল্যাবরেটরিজের ব্যবস্থাপককে আবার খালাসও দেওয়া হয়েছে। এতে ওই ভেজাল ওষুধ তৈরির জন্য দায়ী কে সেই প্রশ্ন দেখা দেয় আইনজীবীদের মধ্যে। একজনকে শুধু এক বছরের কারাদণ্ড দিয়ে তাঁকে আবার উচ্চ আদালতে আপিল করার শর্তে জামিনও দেওয়া হয়েছে।

২৬ বছর পরে ভেজাল প্যারাসিটামলসংক্রান্ত মামলার রায়ে একজনকে মাত্র এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার পর ঢাকার ড্রাগ আদালতের পিপি মো. নাদিম মিয়াও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘অভিযোগ প্রমাণ হয়েছে। অথচ মাত্র একজনকে এক বছরের শাস্তি দিয়ে অন্যদের খালাস দেওয়ার বিষয়টি আমার বোধগম্য নয়।’ ঢাকার আদালতের আরেক আইনজীবী সঞ্জীব চন্দ্র দাস  বলেন, ‘আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছর। অথচ প্রমাণ হওয়ার পরও একজনকে এক বছরের শাস্তি দিয়ে আবার আপিলের শর্তে জামিন দেওয়ার বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ। আবার সংশ্লিষ্ট আইনটিও ত্রুটিপূর্ণ। শত শত শিশু হত্যার শাস্তি এত কম হওয়ার বিষয়টি সরকারের ভেবে দেখা উচিত।’

রিড ফার্মার বিরুদ্ধে মামলার আসামিরাও খালাস : নিম্নমানের ও ভেজাল প্যারাসিটামল সেবনে শিশু মৃত্যুর অভিযোগে দায়ের করা মামলায় রিড ফার্মাসিউটিক্যালসের মালিকসহ পাঁচ আসামির সবাইকে খালাস দেওয়া হয় ২০১৬ সালের ২৯ নভেম্বর। ঢাকার ড্রাগ আদালতের রায়ে বলা হয়, মামলার বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তার ‘অযোগ্যতা ও অদক্ষতার কারণে’ অভিযোগ প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। নিয়মনীতি না মেনে আলামত জব্দ করায় আসামিদের সাজা দেওয়া যায়নি, তা ছাড়া তদন্তে গাফিলতি ছিল।

Print