তালেবানের প্রত্যাশা ও প্রয়োজন বুঝতে হবে

February 11, 2019 at 5:02 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

কাতারের রাজধানী দোহায় পরপর ছয় দিনের আলোচনার পর গত ২৮ জানুয়ারি ওয়াশিংটনের প্রধান আলোচক জালমে খালিলজাদ ঘোষণা করেছেন যে অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবান আফগান সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনার পথ তৈরি করতে পারে, এমন একটি চুক্তির ‘খসড়া কাঠামো’ তারা তৈরি করেছে। খালিলজাদের মন্তব্য নিঃসন্দেহে আফগানিস্তানে ১৭ বছরের যুদ্ধ অবসানের আশা জাগিয়েছে, তবে মার্কিন কিংবা তালেবান কর্মকর্তার খসড়া কাঠামোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য সরবরাহ করেননি।

কয়েক বছর ধরে যুদ্ধরত পক্ষগুলো অগুনতি বৈঠক ও আলোচনা করেছে। সৃষ্টি করেছে অনেক আশার। কিন্তু নীতিনির্ধারকদের অদূরদর্শিতা, অতিমাত্রায় আস্থাশীলতা এবং অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে অস্বীকার করার কারণে শান্তি সব সময় অধরাই থেকেছে, যার পরিণতিতে লাখ লাখ মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।

আজ আমাদের মনে হচ্ছে সহিংসতার এই চক্র ভাঙার আরেকটি সুযোগ এসেছে এবং শান্তিপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা অবশেষে আফগানিস্তানের জনগণের দুর্ভোগের অবসান ঘটাবে এবং তাদের ঐক্যবদ্ধ ও সমৃদ্ধ করবে। যাহোক, অতীতে অনেকবার প্রমাণিত হয়েছে যে ততক্ষণ পর্যন্ত টেকসই শান্তি অর্জিত হবে না, যতক্ষণ যুদ্ধরত দলগুলো অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা না নেবে, শত্রুদের প্রয়োজন ও উদ্দেশ্য না বুঝবে এবং স্থানীয় জনগণের চাওয়া-পাওয়াগুলো পূর্ণ না হবে। আর এ কারণে ঐতিহাসিক এই সন্ধিক্ষণে ১৯৯০-এর দশকে কী কী কারণে তালেবানের উত্থান হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখাটা গুরুত্বপূর্ণ। এটা শান্তি আলোচনায় রত মার্কিন ও তালেবান কর্মকর্তাদের একটি পথনির্দেশনাও দিতে পারে।

তালেবান কী চায়?

১৯৯০–এর দশকের গোড়ার দিকে মুসলিম আফগান যোদ্ধাদের একটি অংশ নিয়ে তালেবান গঠিত হয়। এরা আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারির (১৯৭৯-৮৯) বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছিল। সোভিয়েত সেনারা সেখান থেকে চলে যাওয়ার পর আফগানিস্তানের নেতৃত্বে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, তার সুবিধা নেয় তালেবান। যুদ্ধবিগ্রহ আর অস্থিতিশীলতায় ক্লান্ত জনগণ তখন শান্তির আশায় তালেবানকে স্বাগত জানিয়েছিল। দক্ষিণ-পশ্চিম আফগানিস্তান থেকে তাদের প্রভাব ক্রমে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ১৯৯৬ সালে প্রেসিডেন্ট বোরহানউদ্দিন রব্বানির সরকারকে উৎখাত করে রাজধানী কাবুল দখল করে তালেবান। ‘টুইন টাওয়ার’ হামলার পর ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানে হামলা শুরু করার আগ পর্যন্ত গোষ্ঠীটি দেশের অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। ওই বছরের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই তালেবান ক্ষমতাচ্যুত হয়।

তালেবান শাসনের পতনের পর গোষ্ঠীটির সদস্যরা একটি শান্তি চুক্তি গ্রহণ করতে রাজি ছিল, যা তাদের দেশে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ দিত। কিন্তু আফগানিস্তানের ভেতরে ও বাইরের রাজনীতিবিদেরা এবং সিদ্ধান্তপ্রণেতারা তাঁদের সিদ্ধান্তমূলক এই বিজয়ে একেবারে জ্ঞানহারা হয়ে যান। তাঁরা কোনো ধরনের চুক্তি করতে অস্বীকার করেন এবং আলোচনার টেবিল থেকে তালেবানকে হটিয়ে দেন। জার্মানির বন শহরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে তাঁরা তালেবানের সবচেয়ে মৌলিক চাহিদাগুলো সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করেন এবং কঠোরভাবে তালেবানবিরোধী সরকার গঠনে সহায়তা করেন। এটা ছিল মৌলিক একটি ভুল, যা আফগানিস্তানকে যুদ্ধ ও রক্তপাতের দিকে ঠেলে দেয় এবং আমাদের আজকের এ অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

গত ১৭ বছরে অগণিত তালেবান নেতা মার্কিন বাহিনীর হাতে নিহত, অপমানিত ও বিদেশে নির্বাসিত হয়েছেন। অনেককে পাঠানো হয়েছে গুয়ানতানামো ও বাগরামে। সেখানে তাঁরা অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আর এসব কারণে তালেবান সদস্যরা মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করাকে পবিত্র দায়িত্ব বলে মনে করে।

এখন একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠন হিসেবে তালেবান দুটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জন করতে চায়। একটি হচ্ছে আফগানিস্তান থেকে সব বিদেশি সৈন্যের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং একটি সমন্বিত ইসলামিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা।

এ ছাড়া তালেবানের আরও কিছু ছোটখাটো দাবি রয়েছে। তারা চায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে তার নেতাদের নাম প্রত্যাহার করা হোক, তাদের বন্দীদের মুক্ত করা হোক এবং দোহায় তাদের রাজনৈতিক কার্যালয়কে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। ২০০১ সালে পরাজয়ের পরের সময়ের মতো, তালেবান এখন বিশ্বাস করে যে একটি চুক্তির পর আফগানিস্তানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে থাকার অধিকার তারা অর্জন করেছে।

দোহায় চলমান আলোচনা সফল হতে পারে, যদি জড়িত সব পক্ষ তালেবানের অবস্থানকে স্বীকৃতি দেয় এবং গোষ্ঠীটিকে ছোট জ্ঞান না করে।

টেকসই শান্তি অর্জনের জন্য আফগান সরকারকে যেমন তালেবানের প্রয়োজন ও প্রত্যাশাগুলো স্বীকার করতে হবে, তেমনি আফগান জনগণের যেসব অংশ তালেবানকে হুমকি বলে মনে করে, তাদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দিতে হবে।

Print