অ্যাননটেক্স নিয়ে বেকায়দায় জনতা

December 5, 2018 at 2:02 pm

সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

অস্বাভাবিক ঋণসুবিধা নিয়ে আলোচিত অ্যাননটেক্স গ্রুপকে নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে জনতা ব্যাংক। নতুন করে কোনো ঋণসুবিধা না দিয়েও কোম্পানিটির পুরোনো দায় শোধে শত শত কোটি টাকা দিতে হচ্ছে জনতা ব্যাংককে। এ অর্থ দিতে হচ্ছে বিদেশি বিভিন্ন ব্যাংককে। কারণ, অ্যাননটেক্সের হয়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোকে অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা দিয়েছিল জনতা ব্যাংক। তাই এ দায় শোধ না করলে জনতা ব্যাংককে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে।

নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশি ব্যাংকের দায় শোধ করা জনতা ব্যাংককে সমপরিমাণ অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা গ্রাহকের তথা অ্যাননটেক্সের। কিন্তু অ্যাননটেক্স জনতা ব্যাংককে কোনো টাকা শোধ করছে না।

জানা গেছে, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য খোলা অ্যাননটেক্সের ঋণপত্রের দায় হিসাবে ৪০০ কোটি টাকা শোধ করতে হবে জনতা ব্যাংককে। ইতিমধ্যে কয়েক শ কোটি টাকা শোধ করা হয়েছে। এর ফলে অ্যাননটেক্সের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা আরও বেড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা ছুঁই–ছুঁই করছে। ইতিমধ্যে গ্রুপটি ৩ হাজার ৫৬ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অ্যাননটেক্সের দায় শোধে বিদেশি ব্যাংকগুলো জনতা ব্যাংককে দফায় দফায় চিঠি পাঠাচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকেও অভিযোগ জমা দিয়েছে কয়েকটি বিদেশি ব্যাংক। গ্রুপটির চার প্রতিষ্ঠানের কাছে বিদেশি ব্যাংকগুলোর পাওনা রয়েছে ৪০৮ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠান চারটি হলো গ্যালাক্সি সোয়েটার, সুপ্রভ কম্পোজিট, সিমরান কম্পোজিট ও জ্যাকার্ড নিট টেক্স। এর মধ্যে গত ২৫ নভেম্বর সুপ্রভ ও সিমরান কম্পোজিটের ৭৫ কোটি টাকা বিল পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেয় জনতা ব্যাংকের ঋণ কমিটি। এ ছাড়া নভেম্বরে শোধ করা হয় গ্যালাক্সি সোয়েটারের ৩০ কোটি টাকার বিদেশি বিলের দায়।

এদিকে অনুমোদন না নিয়ে অ্যাননটেক্স গ্রুপের ঋণপত্র খোলায় জনতা ব্যাংক ভবন করপোরেট শাখার তিন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন শাহিনুর রহমান, আশরাফুল ইসলাম ও রোকনুজ্জামান। তবে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত শীর্ষ কর্মকর্তারা রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এতে ক্ষুব্ধ ব্যাংকটির বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা।

যোগাযোগ করা হলে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুছ ছালাম আজাদ গত বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঋণপত্র যেহেতু খোলা হয়েছে, বিল আমাদেরই পরিশোধ করতে হবে। আমরা চেষ্টা করছি গ্রাহক থেকে টাকা আদায়ে। চলতি বছরে ভালো অঙ্কের টাকা আদায় হয়েছে। তবে গ্রাহককে নতুন করে কোনো সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না।’

অনুমোদন ছাড়া অ্যাননটেক্সকে ঋণপত্রসুবিধা দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তাদের শাস্তি প্রসঙ্গে এমডি বলেন, ‘ইতিমধ্যে কয়েকজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁরা অনুমোদন না নিয়েই ঋণপত্র খুলেছিলেন। তদন্ত চলছে, আরও অনেকের শাস্তি হবে।’

অ্যাননটেক্স গ্রুপের প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ঋণের সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ইউনুছ বাদল একাই। গত ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এক চিঠিতে এ তথ্য তুলে ধরেন জনতা ব্যাংকের এমডি নিজেই। এত দিন নামে-বেনামে ইউনুছ বাদলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২২ প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুবিধাভোগী নিয়ে একধরনের অস্পষ্টতা ছিল।

জানা গেছে, অ্যাননটেক্স গ্রুপের ২২ প্রতিষ্ঠানের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি ফোর্সড ঋণ। ব্যাংকটি ঋণপত্র খুললেও গ্রাহক অর্থ শোধ করেনি। ব্যাংক তা ফোর্সড ঋণ হিসেবে দেখিয়েছে। এসব ঋণই এখন একে একে খেলাপি হয়ে পড়ছে।

এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশ দিয়েছে, নতুন করে অ্যাননটেক্স গ্রুপকে কোনো আর্থিক সুবিধা দেওয়া যাবে না। এরপরও ব্যাংকটি একরকম বাধ্য হয়ে গ্রুপটির পক্ষে বিদেশি ব্যাংককে দায় শোধ করে দিচ্ছে।

জনতা ভবন করপোরেট শাখার একাধিক চিঠিতে প্রধান কার্যালয়কে লিখেছে, টাকা না নিয়েই ঋণপত্রের নথিপত্র ব্যাংক থেকে গ্রাহক নিয়ে গেছে। ঋণপত্রের মূল্য পরিশোধে গত ৫ ও ১৯ জুলাই, ৯ ও ২৩ আগস্ট, ১৩ ও ২৭ সেপ্টেম্বর, ১১ ও ২৫ অক্টোবর গ্রাহককে চিঠি দেওয়া হলেও কোনো টাকা শোধ করেননি। নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ব্যাংককে ঋণপত্রের মূল্য পরিশোধ না করলে জনতা ব্যাংককে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

জানা গেছে, জনতা ব্যাংক নতুন করে গ্রুপটির কোনো ঋণপত্র না খোলায় ইসলামী ব্যাংক ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যবসা করছে গ্রুপটি। এর মাধ্যমে চলতি বছরে জনতা ব্যাংককে প্রায় ৩৮৭ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। তবে দায় কমছে না। কারণ, প্রতিনিয়ত সুদ বাড়ছে।

ব্যাংকটির মতিঝিল প্রধান কার্যালয় জনতা ভবন শাখার এ ঋণ এখন দেশের সবচেয়ে আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারির একটি। কারণ, একটি শাখা থেকে এ বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণের ঘটনা আগে ঘটেনি। যেটিকে বলা হচ্ছে, একক ঋণের বৃহত্তম কেলেঙ্কারি।

Print