হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার চলছেই

November 8, 2018 at 11:02 am
সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক:

হাইকোর্টের নির্দেশনার এক বছর পার হলেও রাজধানীতে যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার বন্ধ হয়নি। এখনো উচ্চ শব্দের হর্ন বাজিয়ে ছুটছে যানবাহন। হর্ন বাজানোর ক্ষেত্রেও মানা হচ্ছে না এলাকাভিত্তিক নির্দেশিকা। এর বিরুদ্ধে শুধু মামলা দিয়েই দায় সারছে ট্রাফিক পুলিশ।

 হাইকোর্টের রায়ে হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি ও বিক্রি বন্ধের নির্দেশ থাকলেও তা বন্ধ হয়নি। বাংলামোটর, নবাবপুর, ধোলাইখাল এলাকায় গাড়ির যন্ত্রাংশ বিক্রির দোকানগুলোতে হরদম এ ধরনের নিষিদ্ধ হর্ন বিক্রি হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের অক্টোবর মাসে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে ২৬ দিন অভিযান চালায় পুলিশ। এই সময় শুধু হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার করায় মামলা হয়েছে ৩ হাজার ১২৫টি।

হাইড্রোলিক হর্ন হচ্ছে উচ্চ মাত্রার শব্দ সৃষ্টিকারী বিশেষ হর্ন। আমেরিকান স্পিচ অ্যান্ড হেয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন (আশা) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, মানুষের জন্য শ্রবণযোগ্য শব্দের সহনীয় মাত্রা সর্বোচ্চ ৪০ ডেসিবেল। কিন্তু হাইড্রোলিক হর্ন শব্দ ছড়ায় ১২০ ডেসিবেল পর্যন্ত। এর স্থিতি ৯ সেকেন্ডের বেশি হলে ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। দেশের শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা অনুসারে রাজধানীর মিশ্র (আবাসিক ও বাণিজ্যিক) এলাকায় দূষণের সর্বোচ্চ মাত্রা ৬০ ডেসিবেল। এর চেয়ে উচ্চ মাত্রার শব্দে শ্রবণশক্তি হ্রাস, বধিরতা, হৃদ্‌রোগ, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, বিরক্তি সৃষ্টি ও শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় বিঘ্ন ঘটতে পারে।

সরেজমিনে বাংলামোটরে সড়কের দুই পাশের ১০টি দোকানে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, প্রকাশ্যেই হাইড্রোলিক হর্ন বিক্রি করছেন দোকানিরা। তাঁরা জানান, এই হর্নগুলো তাঁরা কেনেন ধোলাইখাল ও নবাবপুর থেকে। শামীম মোটরসের এক বিক্রয়কর্মী বলেন, দুই ধরনের হাইড্রোলিক হর্ন আছে, এগুলো  পাঁচ শ ও বারো শ টাকায় বিক্রি হয়।

দেখা গেল ধোলাইখালের দোকানগুলোতে এসব হর্ন খুচরা বিক্রি হয় গোপনে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানি জানান, ক্রেতাকে বুঝে ওঠা না পর্যন্ত দোকানিরা হর্ন বিক্রি করেন না। সুবিধাজনক মনে হলেই বিক্রি করেন। পাইকারি ক্রেতারা বেশির ভাগই তাঁদের পরিচিত।

স্বাস্থ্য ও শ্রবণের জন্য ক্ষতিকর বলে উচ্চ আদালতে করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ২৩ আগস্ট রাজধানীতে হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেন আদালত। তখন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয় পুলিশকে। পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে গাড়ির মালিক ও চালকদের কাছের থানায় হর্ন জমা দিতে এবং এই হর্ন ব্যবহার করা গাড়ি জব্দ করতেও পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

উচ্চ মাত্রার হর্নে পথচারী ও শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় জানিয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলছেন, উন্নত
দেশগুলো থেকে আমদানি করা গাড়িতে এই হর্ন থাকে না। ভারত থেকে আসা গাড়িতে থাকে। বেশির ভাগ সময় দেশে আসার পর নতুন করে হর্ন লাগানো হয়। এটি বন্ধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বিআরটিএকে কঠোর হতে হবে। শাস্তির পরিমাণও বাড়াতে হবে।

হাইড্রোলিক হর্ন বন্ধে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে রিট করেছিলেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, হর্ন ব্যবহার করায় পুলিশ খুবই নমনীয় শাস্তি দিচ্ছে। এক শ থেকে দুই শ টাকা জরিমানা নিয়েই গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হয়। শাস্তির মাত্রা বাড়ানো হলে অবস্থার আরও উন্নতি হবে।

২০১৭ সালের রায়ে হাইকোর্ট হর্ন বন্ধের ব্যাপারে অগ্রগতির প্রতিবেদন দুই সপ্তাহের মধ্যে জমা দিতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিল। মনজিল মোরসেদ বলেছেন, প্রতিবেদন দিলেও সেটি কেবল হর্ন ব্যবহার করায় কতগুলো মামলা হয়েছে, সেটিকেই প্রাধান্য দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এ সমস্যার সমাধানে আইন আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।

 রায়ে পুলিশপ্রধান, পুলিশ কমিশনার, ডিআইজি (হাইওয়ে), যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক) এবং বিআরটিএর চেয়ারম্যানকে হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি বন্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত।

ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলছেন, হর্ন তৈরি ও কোন পথে আমদানি হয়, তা জানতে গোয়েন্দা সংস্থাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) যেহেতু পরিবহনকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেহেতু তারাও যদি পদক্ষেপ নেয়, তাহলে স্থায়ী সমাধান হতে পারে।

যানবাহনে উচ্চমাত্রার হর্ন ব্যবহার কেন বন্ধ হচ্ছে না, তা জানতে বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) নুরুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

গত সোমবার দুপুরে ফার্মগেট মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ির হর্নের শব্দ তো আছেই, মাঝে মাঝে হাইড্রোলিক হর্ন বাজিয়ে চলছে বিভিন্ন পরিবহনের বাস। এ ছাড়া হকারদের হাঁকডাক, বহু মানুষের কথাবার্তায় তুমুল শোরগোল। সেখানে কথা হচ্ছিল মুদিদোকানি সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। বলছিলেন, সারা দিনই এত শব্দ সহ্য করতে হয়। রাতে বাসায় গিয়েও শান্তি নেই। তখন সড়কে
চলাচল করা ট্রাকগুলোর হাইড্রোলিক হর্নের শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। এই কষ্ট প্রতিদিনই সহ্য করতে হচ্ছে।

Print