আবাসন-সংকটে নওগাঁর হরিজন কলোনীর বাসিন্দাদের মানবেতর জীবন-যাপন

August 10, 2018 at 12:29 pm

কাজী কামাল হোসেন, নওগাঁ:

আবাসন-সংকটে মানবেতর জীবন যাপন করছেন নওগাঁর হরিজন পল্লীর বাসিন্দারা। জনসংখ্যা বাড়লেও তাদের জন্য গত ৩০ বছরে নতুন করে একটি ঘর কিংবা এক ইঞ্চি জমিও বাড়েনি। বাধ্য হয়ে দীর্ঘদিন ধরে এক-একেকটি কক্ষে পরিবারের ছয়-সাতজন সদস্য নিয়ে গাদাগাদি করে বসবাস করছে তাঁরা।

নওগাঁ পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৩ সালে নওগাঁ পৌরসভার যাত্রা শুরু করে। প্রথম দিকে শহর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কাজে নিয়োজিত সুইপারদের জন্য স্থায়ী কোনো আবাসন ব্যবস্থা ছিল না। সুইপারদের অধিকাংশই হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ। সুইপারদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮৫ সালে নওগাঁ পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান আব্দুল জলিল শহরের হাট-নওগাঁ এলাকায় মাছ বাজারের কাছে দুই একর জায়গার ওপর সুইপারদের জন্য একটি কলোনী গড়ে তোলেন। সেখানে তিনি সুইপারদের বসবাসের জন্য ২৫টি আধাপাকা ঘর তৈরি করে দেন। এটি বর্তমানে হরিজন পল্লী হিসেবে পরিচিত। এরপর থেকে গত ৩৩ বছরে পৌরসভা থেকে জনসংখ্যা বাড়লেও সুইপারদের জন্য নতুন করে কোনো ঘর কিংবা আলাদা কোনো জমি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি।

হরিজন পল্লীতে বসবাসরত বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে নওগাঁ হরিজন পল্লীতে ৮০টি পরিবার রয়েছে। জনসংখ্যা পাঁচ শতাধিক। পৌরসভার নির্মিত ২৫টি ঘরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় বিভিন্ন সময় সেখানকার বাসিন্দারা কলোনীর ফাঁকা জায়গায় আরও ৩০টি আধাপাকা ঘর গড়ে তোলেন। এতেও আবাসন সংকট নিরসন দূর হচ্ছে না। আর জায়গা না থাকায় নতুর করে ঘর নির্মাণ করতে পারছেন না। ফলে কোনো কোনো পরিবারে ছয়-সাত জন সদস্য নিয়ে তাঁদের গাদাগাদি করে বসবাস করতে হচ্ছে।

হরিজন কলোনীর বাসিন্দা কার্তিক বাঁশফোড় বলেন, ‘আমার নানী পৌরসভা থেকে একটি থাকার (শয়নকক্ষ) ও একটি রান্নাঘর পেয়েছিল। নানী মারা যাওয়ার পর ওই ঘরে আমি স্ত্রী নিয়ে উঠি। বর্তমানে আমার তিনটি মেয়ে ও একটি ছেলে। ওই এক ঘর ও বারান্দায় গাদাগাদি করে আমাদের থাকতে হয়। বিবাহ উপযুক্ত মেয়েকে নিয়ে এক ঘরে থাকতে হয়। কতোটা অসহায় হলে এভাবে থাকতে হয় মানুষকে।’

আরেক বাসিন্দা বিমলা রাণী জানান, তাঁর পরিবারে পাঁচজন সদস্যের জন্য মাত্র একটি ঘর। একমাত্র ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ছেলে ওই ঘরটিতে থাকেন। থাকার জায়গা না থাকায় বিমলা ও তাঁর স্বামী রান্নাঘরে থাকেন।

নওগাঁ হরিজন কলোনীর বাসিন্দাদের প্রায় সবার কাহিনী কার্তিক ও বিমলার মতোই। আবাসন সংকটে তাঁরা মানবেতর জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

হরিজন সম্প্রদায়ের সিবিও সভাপতি (সম্প্রদায়ভিত্তিক সংগঠন) ভানু বাঁশফোড় বলেন, ‘আবাসন সংকট নিরসনের জন্য আমরা একাধিকার মানববন্ধন করেছি। পৌরসভার মেয়র ও সাংসদ বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও কোনো কাজ হয়নি। আমাদের দিকে কেউ তাকায় না। শুধু ভোটের সময় কদর বাড়ে। তখন নানান প্রতিশ্রুত দেন নেতারা। বর্তমান মেয়র গত নির্বাচনের আগে কলোনীর আবাসন সংকট নিরসনে পাঁচ তলা ভবন গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখনও সেই মুলা ঝুঁলছে।’
হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষদের জীবনমান উন্নয়ন ও মূলধারার মানুষদের সঙ্গে সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকরণের জন্য ২০০৯ সাল থেকে নওগাঁ হরিজন পল্লীতে কাজ করেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা পল্লী সহযোগী বিষয়ক সংস্থা (আরকো)। সংস্থাটি ২০১৬ সাল পর্যন্ত সেখানে কাজ করেন। আরকোর অর্থায়নে ২০১০ সালে হরিজন পল্লীতে দুটি টয়লেট ও দুটি গোসলখানা নির্মাণ করা হয়। এছাড়া কলোনীর শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে পাঠদানের জন্য একটি স্কুলও চালু হয় আরকোর উদ্যোগে। যদিও পরবর্তীতে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়।

আরকোর নির্বাহী পরিচালক সজল চৌধুরী বলেন, ‘নওগাঁর হরিজন পল্লীর বাসিন্দাদের নানা সমস্যা রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আবাসন সংকট। জরুরি ভিত্তিতে এই আবাসন সংকট নিরসনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।’

এ বিষয়ে নওগাঁ পৌরসভার মেয়র নজমুল হক বলেন, ‘হরিজনদের আবাসন সংকট নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁদের জন্য একটি আধুনিক আবাসন কলোনী গড়ে তোলার জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আশা করি, আমার এই মেয়াদের মধ্যেই হরিজনদের আবাসন সংকট দূর হয়ে যাবে।’

স/শা

Print